শেষ কদম ফুল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

নিঘাত কারিম

কর্কট কথা

আজ  কর্কট মানুষের মুঠোয় ধরা দিয়েছে বশ্যতায় । মৃত্যুর কোলে থেকে ফিরে আসছে জীবন জীবনের মুখরতায় । নিঝুম ও অপারেশন শেষে ফিরে এলো নিজের জগতে নিজস্ব ভূবনে। ভালোবাসার মানুষদের কাছে। ভাবী মা, মুনির, শারার এর যত্নে সুস্থ্য হতে লাগলো। অপারেশনের দু‘দিন আগেই ভাবী চলে এসেছিলো। মায়ের আদরের কোনকিছুতেই সে কমতি রাখেনি। কারণ সে তার ননদকে ভালো করে জানে ননদটা একটু বেশি নরম স্বভাবের।

আর শারার মাকে কোলে নিয়ে উঠানো, কোলে নিয়ে শুয়ে দেয়া এমনভাবে করছিল যেনো নিঝুমের বাবা।

যে মুনির জীবনে কোন কাজ করেনি সে রান্না ঘর সামলাচ্ছে। অবশ্য রান্না তার করতে হচ্ছে না । আশে পাশের প্রিয়জনরা সব খাবারের ব্যবস্থা করছে। সবার শুধু একটাই কথা নিঝুম সুস্থ হয়ে যাক। আবার আগের মতো সবার মাঝে আনন্দে থাকুক আনন্দ ছড়িয়ে দিক। নিঝুমকে  ছাড়া ওদের জীবন ভাবতেই পারছে না ।

        আব্বা, আম্মি কে জানানো হলো একটা অপারেশন হয়েছে। দুজনই ভীষণ উদ্বিগ্ন কি হয়েছে? কিন্তু তাদের ক্যান্সার বলা হলো না । শশুর বাড়িতে মা জানেন তিনি ফোনে কান্নাকাটি করছিলেন অনেক এখন কিছুটা শান্ত

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। প্রতিদিন ফোন করে দোয়া পড়ছেন। দেবর আর জা সারাক্ষণ ফোন করছে । মুক্তি – নিঝুমের জা কথাই বলতে পারে না শুধু ই কাঁদে । ওর একটাই কথা , “তোমার কিছু হবে না । তুমি আমাদের রেখে যেতে পারবে না ।”

এভাবে সেবায় যত্নে নিঝুম বেশ সুস্থ । নিঝুম খুব খুশি। সে এখন সুস্থ  ক্যান্সার কে সে জয় করতে পেরেছে। মৃত্যুকে সে তাড়িয়ে দিয়েছে দোড়গোরা থেকে। জীবনকে তার কাছে নতুন লাগছে। সবার প্রতি মায়াও অনেক বেড়ে গিয়েছে।

    ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার সময় চলে এলো । ডাঃ এর জন্য সে আড়ং এর একটা পার্ল সেট উপহার হিসেবে নিলো । ডাঃ টেরী রুমে ঢুকে ভীষণ অপরাধী ও লজ্জিত  ভঙ্গিতে জানালো নিঝুম এখনো ক্যান্সার মুক্ত নয় । তার ভিতরে আরো ক্যান্সার জার্ম  রয়ে গিয়েছে এজন্য আবার তাকে অপারেশন করতে হবে। আর এই জার্ম রয়ে যাওয়া যেনো তারই দোষ এমনভাবে সে বার বার সরি বলতে লাগলো। কিন্তু তার কোন দোষ ছিলো না । অপারেশনটা হবে ৭ই নভেম্বর। আরো পনের দিন পর। নিঝুম যেনো হঠাৎ করে সামনে অথৈ সাগর দেখছে। কেউ যেনো ধাক্কা দিয়ে ওকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। ছেলেবেলায় একবার পুকুরে পড়ে গিয়েছিলো , সাঁতার জানে না তাই ডুবে যাচ্ছিলো অতলে । বাঁচার জন্য একটু নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য সেকি প্রাণপন চেষ্টা । এই মুহূর্তে ওর সেকথা মনে হলো। চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মনটা কাঁচের মতো চৌচির হয়ে গেলো। ভাবলো আমার আর বাঁচা হলো না । মৃত্যুকেই বরণ করে নিতে হবে এখন। মুনির তো ভীষণ নরম মনের। চোখে ওর অশ্রুর ধারা। হয়তো মনে মনে ভাবছে নিঝুমকে আর বাঁচানো গেলো না।

        গাড়িতে উঠে নিঝুম বললো , “সবাই জানে আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি। তাই কাউকে আর বলা যাবে না সব কথা । তুমি কাউকে কিছুই বলবে না । জানাবো অপারেশনের আগের দিন । এই কয়টা দিন অন্তত সবাই একটু স্বস্তিতে থাক । কাউকে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে না।” বাহ্যিক দিক থেকে নিঝুম শক্ত থাকলেও মানসিক ভাবে সে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়লো। নামাজে বসলে শুধু চোখের পানি পড়তেই থাকে। মুনীর আড়ালে চোখ মোছে কিন্তু নিঝুমকে সাহস দিয়েই চলেছে। এক সপ্তাহ ওরা চুপ চাপ কাটিয়ে দিলো । নিঝুম ঘরের টুকটাক কাজ ও করে। ছেলেরা খুব খুশি মা সুস্থ হয়ে গিয়েছে। একদিন মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় মুনীর আর কান্না ধরে রাখতে পারলো না। মাকে সব জানানো হলো। একে একে সবাই জানালো। আবার সবাই উদ্বিগ্ন। আবার সবাই সাহস দিচ্ছে একে একে সবাই আবার দেখতে আসছে। ভাইয়া ও আবার চলে এলো। নিঝুমের শুধু মনে হচ্ছে এটাই আমার সবার সঙ্গে শেষ দেখা। ননদ শানু সাহস দিয়ে বলছে , “ভাবী ভয় পেয়ো না । তোমার কিছুই হবে না । তুমি ভুষণ্ডির কাক হয়ে বেঁচে থাকবা। মুক্তি পান বানাবে আর আমরা বসে বসে পান চিবাবো। জীবনের সব স্মৃতি গুলো একসঙ্গে জড়ো করে জাবর কাটবো । আমাদের অনেক হাসি এখনও বাকী আছে। সবাই তোমার ভালোবাসা পেয়েছে তোমার ছেলের বৌ কেন বাদ পড়বে । “

 নিঝুম জানে জীবনমুখিতাই জীবনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তারপরও নত হতে হয় অনেক সময়।

              মৃত্যু ! কি যে এক ভয়ঙ্কর অনুভূতি! যার কাছে এসেছে যাকে ছুঁয়ে দিয়ে গিয়েছে সেই শুধু এর ব্যাখ্যা দিতে পারবে। না, এ অনুভূতির কোন ব্যাখ্যা নেই। একজন সুস্থ মানুষের ধারণার বাইরে এই অনুভূতি। ইকো-ইসিজির কাগজে আঁকা দাগগুলোর মতোন উত্থান পতন মানেই জীবন।  যখন তাতে কোনো প্রাণ থাকে না, তখন সে কেবলি এক সরল রেখা। মৃত্যু সে সরলরেখা আর আজ নিঝুম হেঁটে যাচ্ছে সেই সরল রেখার দিকে।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]