শেষ শীতের গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

টেড হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথ

ব্রিটিশ কবি টেড হিউজ। কবিতায় তার শব্দ সংকেতময়, অস্বচ্ছ আবার কখনো মণিমুক্তার মতো ঝলমলে, পরিচ্ছন্ন, তার ব্যক্তিত্বের মতোই আকর্ষণীয়। মেয়েরা প্রেমে পড়ে যেতেন তাকে দেখেই। এক ধরণের নিষ্ঠুর পৌরুষের অধিকারী টেড হিউজের প্রেমে পড়েছিলেন মৃত্যুর ঘরে পৃথক পালঙ্ক পেতে রাখা আরেক কবি সিলভিয়া প্লাথ। বিয়ে করেছিলেন তারা। কিন্তু সিলভিয়া প্লাথের ভয়ংকর আত্মহনন এই দুই কবির মাঝখানে আজও শুয়ে আছে তৃতীয় এক চরিত্র হয়ে।সিলভিয়া প্লাথ ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী ৩০ বছর বয়সে গ্যাস স্টোভের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানান।তার স্বামী টেড হিউজ বেঁচে ছিলেন ১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত। প্লাথের আত্মহনন এই অনন্য কবিকে বিতর্কের খাদের কিনারো থেকে কখনোই ফিরে যেতে দেয়নি। বিশেষ করে সিলভিয়া প্লাথের লেখা যে সুইসাইড নোটের কথা আজও শোনা যায়, যেখানে তিনি নাকি নিজের মৃত্যুর পথ বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। কে সেই মানুষ যার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় বুকের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখে নিজেও ঘুমাতে গেলেন সিলভিয়া প্লাথ? এসব প্রশ্নের উত্তর আর জানা যায়নি কখনো। সিলভিয়া প্লাথের শেষ চিঠিটি যিনি সযত্নে নিজের সংগ্রহে রেখে দিয়েছেন তিনিও মুখ খোলেননি আর।  

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে টেড হিউজ আর সিলভিয়া প্লাথের প্রেম, জীবন আর অন্ধকার নিয়ে রইলো ‘শেষ শীতের গল্প…’

আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই ইংরেজ কবি টেড হিউজের সঙ্গে দেখা এবং প্রেম। হিউজ-ই যেন ছিলেন তাঁর নিয়তি। ১৯৫৬ সালে বিয়ে করলেন দু’জন। কিন্তু সেই বিয়েটাই আবার মানসিক ভাবে চুরমার করে দিয়েছিলো প্লাথকে। আত্মহত্যা করে হয়তো বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি।

বাঁচতে পেরেছেন কি সিলভিয়া প্লাথ? হ্যাঁ, কবিতা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে আজও। কবিতায় বেঁচে আছেন টেড হিউজও। সিলভিয়া প্লাথের সেই অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। সমালোচনার নল অনেকেই তাক করেছেন টেড হিউজের দিকে।দোষারোপ করেছেন তাঁর সঙ্গে অন্য নারীদের সম্পর্ককে। সাড়ে ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে এই দুই কবি ভাগ করে নিয়েছেন বহু রূদ্ধশ্বাস কবিতার অভিজ্ঞতা, বহু লেখার চিন্তা, দুই সন্তানের অভিবাবকত্বও। কিন্তু সবকিছু ভেঙে পড়েছে সিলভিয়া প্লাথের করুণ মৃত্যুতে এসে। টেড সিলভিয়াকে পরিত্যাগ করেছিলেন আরেক কবি অ্যাসিয়া উইভিলের জন্য। তারপর সিলভিয়া প্লাথ ১৯৬২ সালের করুণ শীত অতিক্রম করেছেন দুই সন্তানকে নিয়ে একা একা। অভিযোগ জানাননি কারো কাছে। শুধু জীবনের কাছে ছুটি চেয়ে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের স্বল্পায়ু এক বিকেলে।

সিলভিয়া প্লাথের জীবন এবং শেষ সময়টাকে যে গবেষকরা অণুবীক্ষন যন্ত্রের তলায় ফেলে দেখেছেন তাদের দেয়া তথ্য বলছে, শেষ সময়ে সিলভিয়া আর টেড আবার যৌথ জীবনে ফিরতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে দু’জন আলোচনাও করেছিলেন কয়েক দফা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরা হয়নি দু’জনের। সিলভিয়া প্লাথের জীবনকে ঘেরাও করে ফেলেছিলো গভীর বিষাদ। সেখান থেকে কবি আর বের হতে পারেননি। যেদিন মারা যান সিলভিয়া সেদিন টেড লন্ডনের হলবর্নের রাগবি স্ট্রিটে এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন আরেক বান্ধবী সুজান অ্যালিস্টনকে নিয়ে। এই ফ্ল্যাটেই তিনি প্রথমবার সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে শারীরিক ভাবে মিলিত হয়েছিলেন এবং কাটিয়েছিলেন নিজেদের বিবাহের প্রথম রজনী।

সিলভিয়া প্লাথের জীবনের শেষ সময়টা নিয়ে বহু কথা, বহু গল্প বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত প্রকাশক হার্পার অ্যান্ড রো-এর একজন সম্পাদক ফ্রান্সিস লিন্ডলে বেশ অনেক বছর আগে নিউ ইয়র্কে একটা বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে লিন্ডেল বলেছিলেন সিলভিয়া মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে একজন ব্যক্তিকে ফোন করেছিলেন দেখা করার জন্য। কিন্তু সেই ব্যক্তি তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি অন্য এক নারীকে সময় দিচ্ছেন। লিন্ডলে মনে করেন, প্রত্যাখ্যান কবি নিতে পারেননি। হয়তো স্পর্শকাতর তাঁর মন ভাঙার গল্প লিখতে শুরু করেছিলো।

সিলভিয়া প্লাথকে শেষ জীবন্ত দেখেছিলেন ফিটজিরয় রোডের প্রিমরোজ হিলের বাড়িটার এক প্রতিবেশী। সিলভিয়া তার কাছে আত্মহত্যা করার কয়েক ঘন্টা আগে চিঠির ডাকটিকেট চাইতে গিয়েছিলেন সিলভিয়া প্লাথ। তাহলে কি সেটাই ছিলো তাঁর রহস্যময় শেষ চিঠি?

কোথায় সেই শেষ চিঠি? শোনা যায় মাকে লিখেছিলেন সিলভিয়া। জানিয়েছিলেন সব অভিযোগ। বলেছিলেন সেই মানুষটির নাম যার জন্য পৃথিবী থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন তিনি নিজেকে। হাত ঘুরে সেই চিঠি চলে যায় এক সংগ্রহকের কাছে।তিনি কিন্তু রহস্যের কাছেই জমা রেখেছেন সেই চিঠি। সাংবাদিকদের শত প্রশেনর উত্তরে জানাননি সেই মানুষটির নাম, যার জন্য সিলভিয়া প্লাথ আ্ত্মহত্যা করেছিলেন।

সিলভিয়া প্লাথকে নিয়ে গল্প কি শেষ হলো? কবি অ্যাসিয়া উইভিলও তো টেড হিউজের সঙ্গে ভালোবাসায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু টেড হিউজ বা জীবন তাকেও আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৬৯ সালে বিছানার মাথার কাছে ছোট্ট একটি চিরকুট লিখে এই কবিও জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছিলেন। চিরকুটে লেখা ছিলো, ‘আমরা এক হতে পারলাম না। সিলভিয়ার স্মৃতি আমাদের এক হতে দিলো না’। অ্যাসিয়া প্রচুর ঘুমের ওষুধ খেয়ে মুক্তি খুঁজেছিলেন জীবনের কাছ থেকে। টেড হিউজকে নিয়ে ইংল্যান্ডের গবেষক স্যার জোনাথন বেট-এর লেখা আত্মজীবনীতে এরকম তথ্যের উল্লেখও আছে।

১৯৬২ সালের নভেম্বর মাস। শীত ছেয়ে আছে লন্ডন শহরে।মা-কে চিঠি লিখছেন সিলভিয়া প্লাথ। হয়তো সেটাই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ শীত। আর তিন মাস পরেই মৃত্যু যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। ‘আমি থাকার জন্য একটা ভালো বাড়ি খুঁজে পেয়েছি এবং আন্দাজ করো মা ওই বাড়িতে কে থাকতেন? ডব্লিউ বি. ইয়েটস। বাড়িটার দরজায় নীল রঙের বোর্ডে নামটা লেখা আছে!’। কিন্তু সেই বাড়িটাতে সিলভিয়া প্লাথের আর থাকা হয়নি। ১৯৬৩ সালের ১১ ফ্রেব্রুয়ারী তার আগেই চলে এসেছিলো। শেষ শীতের অন্তরালেই তিনি হয়তো প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন নিজেকে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান, দ্য আটলান্টিক
ছবিঃ নিউ স্টেটসম্যান, গুগল    

আলংকরণের ছবিগুলো সিলভিয়া প্লাথের আঁকা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box