শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

চৌদ্দ

নাকি এ-পরিণতি শুধু ওর একারই? ও শিকার হয়েছে মৃত্যুর? শুদ্ধ শুনেছে মৃত্যু নাকি নানান রূপ ধরে আসে, নানান চেহারা তার! কখনো ভয়ংকর, কখনো কুৎসিত, কখনো বা বীভৎস! আবার কখনো মৃত্যু এসে হাজির হয় মোহনীয় সাজে, গোলাপবাগানের সৌরভে মোহিত করে রাখে কিংবা কোনো সুন্দরী নারীর রূপ ধরে ডেকে নেয়! তবে কি সেই ছলনাময়ী মৃত্যুই ওকে বেবিস্কুটার দিয়ে অতি সন্তর্পণে নিয়ে এলো এখানে, এই নিস্তব্ধ যমালয়ে?
যমালয়? হ্যাঁ, যমালয়ই তো! যমালয় ছাড়া আর কী বলতে পারে ও এ-জায়গাটিকে? এমন হিমশীতল নিস্তব্ধতা, রুদ্ধবাক ’শ’শ জীবন! যমালয় ছাড়া আর কি?
না না। এ যমালয় হবে কেন? এ তো চন্দ্রা, স্পষ্ট চন্দ্রা! এই যে সেই মোড়! যেখানে ঝুলছে চন্দ্রার নামাংকিত সাইনবোর্ড! হ্যাঁ, এটা তো সেই চন্দ্রাই! আঞ্চলিকভাবে যার আরেক নাম চান্দরা। এই যে সেই তিনদিকে চলে যাওয়া তিনটি পথ। একটি এসেছে গাজীপুরের দিক থেকে যেটা দিয়ে ও এলো। আরেকটি সাভার এবং আর একটি টাঙ্গাইলের দিকে। এবং এই তিনটি পথই এখন গাড়িতে গাড়িতে ঠাসা- বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, স্কুটারসহ নানান পদের থেমে থাকা পাথুরে যানে।
হ্যাঁ, পাথুরে যানই তো! যা স্থির, অনড়, অচল এবং প্রাণহীন- তাই তো পাথুরে! কবে কখন চন্দ্রা ধারণ করলো এই পাথুরে স্তব্ধতা? কবে? সতেরোই আগস্টের সেই বোমাসিরিজ বিস্ফোরণের পর, না আজই? এখন? শুদ্ধ অনুভব করে সতেরোই আগস্টের বোমা বিস্ফোরণ সিরিজের পর ও আর ঢাকার বাইরে অন্য কোথাও যায়নি। শুধু গাজীপুর এসেছিল, বনসুন্দরীতে। বেশ কয়েকবারই এসেছে। এবং গাজীপুরকে এখন ওর কোনোভাবেই ঢাকার বাইরের অঞ্চল বলে মনে হয় না। তবে চন্দ্রা, চন্দ্রা হলো ঢাকার বাইরে যাওয়ার উৎসমুখ, একটি দরোজা! সেই দরোজা এখন পাথুরে স্তব্ধতায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে ওর যাত্রা।
এবং আমি এখন সবকিছু মনে করতে পারছি। যেমন জীবিত অবস্থায় পারতাম, আমার অতীতের কথা ভাবতে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন মনে আঁকতে, যদিও এখন তা আমি পারছি না, পারা সম্ভবও নয়, কেননা আমি শংকিত আমার অস্তিত্ব নিয়েই; তবে আমি এখন বেশ স্পষ্টভাবেই মনে করতে পারছি- আমি এখন কী করছি, কী ভাবছি, কেমন আছি, আমার সব অনুভূতি সেই আগের মতোই সচল আছে সক্রিয় আছে, তাহলে আমি কেন মৃত হতে যাবো? না না, আমি মৃত নই। আমি মৃত নই। নিশ্চিত হয় শুদ্ধ। নিশ্চিত হয় যে ও বাস্তবের ভিটেজমিতেই দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলছে নিজের সঙ্গে, অনুভব করছে চেতনা, ওর নিঃশ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে সতেজ। তবে এই বাস্তবতাও ওকে দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে দিচ্ছে যে- ও অবরুদ্ধ এখন, ও অবরুদ্ধ হয়ে আছে কোনো এক অদৃশ্য ভোজবাজির খেয়ালে। ওর সত্তা এখন স্থবির। এবং ওকে কতোদিন কাটাতে হবে এরকম জড়বৎ অবস্থায় এই অচেতন ব্রম্মান্ডে সেটাও ওর অজানা! হয়তো সারাজীবন হয়তো যাবজ্জীবন!
যাবজ্জীবন? সারাজীবন? উন্মাদের মতো হেসে উঠে শুদ্ধ। ফাসিকষ্ঠের দিকে যাওয়া আসামীর মতো মৃতপ্রায় হাসি অসহায় নিরুপায় হাসি! আগে তো দুদিন বাঁচো! তারপর না হয় সারাজীবনের কথা ভাবা যাবে চিন্তা করা যাবে! কি, বাঁচতে পারবে তো দুদিন? যদি এভাবে চলতে থাকে? নিজের প্রতিই নিজের ভ্রুকুটি শুদ্ধর! এই যে এই পানিহীন খাদ্যহীন বোবাকাতরতায় আর একাকীত্বের সুশীতল হিমবাহ বুকের গহীনে বয়ে নিয়ে? এভাবেই যদি দিন যায় জীবন কি এক-দুদিনের বেশি তুমি টেনে নিতে পারবে সাধু! পারবে? আছে অতো প্রাণের জোর? অতো শক্তি আর ক্ষমতা? আছে কি?
না না না, আমি পারব না, আমি পারব না। বিশেষ করে এই একাকীত্ব! এই একাকীত্বের বোধ যে কী বিষাক্ত কী নীল কী তিতা! সে আমি জানি। সে আমি বরাবরই জানি বারবারই জানি অনেক মূল্য দিয়েই জেনেছি। এখনো জানছি তার গহন থাবা। অসহ্য সত্যি অসহ্য! নিঃসঙ্গতার ক্ষরণ আগুনের দাবদাহের মতো পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় মনের সব শান্তি সব স্বস্তি সব ভালোলাগা। বাবার মৃত্যুর পর চাচারা যখন জমি গ্রাসের পায়তারায় মাতলো, তখনকার একেকটি দিন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো হলকা ছড়িয়ে নিমিষের মধ্যেই জেগে উঠে আবার মিলিয়ে যায়। গ্রামের একটা মানুষ পায়নি তখন, যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, সাহস যুগিয়েছিল ওদের। একজন মানুষও মেলেনি। মা তখন প্রায় একা একাই লড়াই করেছে দূর্গার মতো দশভুজা হাত নিয়ে। তারপরও তো নারী, পুরুষশাসিত এই সমাজের সঙ্গে পেরে উঠবে কীভাবে? মাঝে মধ্যেই অবসাদে কান্নায় হতাশায় ভেঙে পড়েছে। লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলেছে। সব কান্না কি আর লুকানো যায়? মায়ের অসহায়ত্ব, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, তার সঙ্গে মানুষের নির্দয় নিষ্ঠুর আচরণ সবকিছু মিলেমিশে ওর জীবন ঠিক এমনই এক নিঃসঙ্গতার জ্বালামুখে দাঁড়িয়েছিল। সেই দাহ তাপে ও জ্বলে পুড়ে খাক হয়েছে, বুকের ভেতরটা দলে গেছে মুচড়ে গেছে পিষে গেছে! ছাইভস্ম হয়েছে অস্তিত্ব!
তারচেয়ে আরো বেশি যন্ত্রণাকর ছিল আরো বেশি ক্লেদাক্তকর ছিল রেবার ঘটনা। অনেকদিন থেকেই মেয়েটা দূর থেকে নিক্ষেপ করে যাচ্ছিল তীব্র বিষের এক একটা শর। অনেকদিন থেকেই অপমানের উপেক্ষার অহবেলার বিষের হলাহলে ও ক্রমশই নীল হচ্ছিল। কিন্তু যেদিন নিজের চোখে আবিষ্কার করলো রেবাকে মহসিন হলে ক্যাডার স্বপনের রুমে, সেদিন যেন কেউ আগুন থেকে সদ্য ওঠানো গরম শিক চেপে ধরে রেখেছিল ওর বুকের ঠিক মাঝখানে! ও পুড়ে ভস্ম হয়ে গিয়েছিল নাড়িসুদ্ধু। কী যে সেই যন্ত্রণা, কী যে সেই হুতাশন, খাক হয়ে যাওয়ার জ্বালা! তাই স্বপনের রুমের সামনে থেকে সহসা সরে আসতে পারেনি। সব শক্তি যেন নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল, বিবশ হয়ে পড়েছিল চেতনা, হাতপা নাড়ানোর ক্ষমতাই ছিল না। আর ওর সেই মৃত সত্তাকেই আরেকবার এসে চড় মেরেছিল স্বপনের ক্যাডার! সবার চোখের সামনে! হ্যাঁ, সবার চোখের সামনেই তো! অতো বড়ো খোলা লনটায় কি কেউ একজনও দেখেনি ওর এই চড় খাওয়ার দৃশ্য! কেউ একজনও দেখেনি?
ইচ্ছে করছিল তখন দুনিয়া থেকেই মুখ লুকিয়ে ফেলে। চকিতে একবার তাকিয়েও ছিল চারতলার সেই লন থেকে নিচের দিকে! রেবাকে একটা শিক্ষা দেওয়া যাবে! উচিত শিক্ষা! মন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেললে কী হয়, দ্যাখ! সারাজীবন অনুশোচনা করেও কুল পাবি না! কাঁদতে হবে তোকে আমার জন্য! সারাজীবন কাঁদতে হবে! (চলবে)

ছবি: প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]