শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

আঠারো

ও তখনো রেবার দেওয়া দগদগে ক্ষতের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। জ্বলছে পুড়ছে অঙ্গার হচ্ছে। কিন্তু ভুলতে চাইছে শোক। চাইছে নিভৃতির কোনো গোপন কোন থেকে কেউ আসুক ভালোবাসার অর্ঘ্য ঢালি নিয়ে। আর সেই গোপন কোনটি যে আবরিত হচ্ছিল সেই রহস্যময়ী তরুণীকে ঘিরে: তা ও ছাড়া আর কে টের পাচ্ছিল! সেদিনের সেই ঘোর লাগা মূহূর্তের ভেতরে যে কী ছিল, এরপর আর কোনো শহরের তরুণী বা মেয়ের মধ্যে ও নিজের মানস-সুন্দরীকে খুঁজে পাচ্ছিল না। তাছাড়া অ্যাড ফার্মে চাকরির অভিজ্ঞতায় শহরের এবং সুন্দরী মেয়েদের ঘিরে ওর মনে এক ধরনের ঘৃণাও তৈরি হচ্ছিল। স্মার্ট এবং সুন্দরী মেয়ে মানেই যেন দাম্ভিক, স্বার্থের জন্য যে কোনো পুরুষের সঙ্গেই শুয়ে বেড়ায়! যেন সবাই রেবা, রেবার ছায়া। আর যারা এখনো গ্রামে থাকে, শ্যামল সবুজের আশ্রয়ে থাকে তারা যেন এখনো বিশুদ্ধ প্রেম বাঁচিয়ে রাখে নিজের মধ্যে।
সেদিন পেছন থেকে মেয়েটিকে অনুসরণ করতে করতে ওর মনে হচ্ছিল এ-বুঝি সেই দেবী চৌধুরানী। শুনেছে অপরূপা সুন্দরী সেই দস্যুরানী এ-অঞ্চলেরই কোথায় কোন বৈকুন্ঠপুরে রাতবিরেতে ঘুরে বেড়াত। একদিকে যেমন সাহসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে, অন্যদিকে ভালোবাসার কঠিন পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছে বারবার। সে-রকমেরই কোনো ঐশ্বর্যবতীর ভালোবাসার জন্য যেন শুদ্ধর মনে তখন ঘোর কাঙালিপনা! যেন মেয়েটির ভালোবাসার চেয়ে শক্তির আশ্রয়টিই জরুরি। নিবিড় ঘন সন্ধ্যায় সেই যুবতীকে দেখে হঠাৎই তা আরো বেশি উস্কে উঠেছিল।
মেয়েটিকে ছাড়িয়ে যেতে যেতে এক নজর পেছন ফিরে তাকাতেই ওর সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। এতো দেখছি সত্যিই দেবী চৌধুরানী! কনে দেখা আলোর সবটুকু ঐশ্বরিক বিভাই যেন ওর মুখে লেগে রয়েছে। সন্ধ্যার ফিকে আলোয় শুধু মনে হলো ও কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। সৌন্দর্যের কী তীক্ষ্ণতা অথচ সারল্যের অপূর্ব প্রতিমূর্তি, যেন কত যুগ যুগ ধরে চেনা! কত আপন! খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে করছিল তাল মিলিয়ে হাঁটার। সাহস হয় নি। অচেনা জায়গা বলে কথা। কেউ যদি মেয়েপটানো কোনো লম্পট ভেবে ধেড়ে পিটানো শুরু করে দেয়! কাছে ঘেষবে কী, উলটো মনের অজান্তেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে দ্বন্ধ হচ্ছিল নিজের সঙ্গে- কথা বলবে কী বলবে না অথবা বললেও কীভাবে শুরু করা যায়- অদ্ভুত এক গোলক ধাঁধাঁ আর মনোবিকারে প্রায় দিশে হারিয়ে ফেলেছিল তখন। নিজের ভীরুতার কাছে হার মানাটাই যেন ওর নিয়তি। কোন্ উটকো বিপদ এসে হাজির হয়!
কিছুক্ষণ হাঁটার পর ও থমকে দাঁড়িয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুর বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। বিশাল একটা মাঠ সাইজের খলা। তার ওপাশে টিনের চালওয়ালা পাকা ঘর। ঘরটার সামনে নারিকেল গাছের ঘন সারি। ঘরটির পাশ ঘেঁষে টিনের গেট। সবই ঠিক আছে কিন্তু এটাই যে কবিরদের বাড়ি নিশ্চিত হয় কীভাবে? মানুষজনের অস্তিত্ব চোখে পড়ল না। ও থমকে দাঁড়িয়ে যখন ভাবছে কী করবে, তখনই সেই পূর্ণ যুবতী, আশ্চর্য যে, পাকা রাস্তা ছেড়ে সেই খলার দিকেই নেমে এলো। সে-বাড়ির দিকে যেতে যেতে মেয়েটি শুদ্ধকে হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের হাঁটা গতি কমালো। ধীর পায়ে এগোতে এগোতে অসংকোচেই জানতে চাইল, ‘আপনি?’
চাঁদ উঠে নি। সন্ধ্যাতারার কোন্ আলো এসে পড়েছিল মেয়েটির মুখে। সেই জুইফুলে তাকিয়ে শুদ্ধর মুখে কোনো কথা ফোটে না। থৈ থৈ জোছনা যেন চুঁইয়ে পড়ছে কলাপাতায়। ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘এটা কি কবিরদের বাড়ি?’
‘হ্যা। আমার ভাই। আপনি?’
আমি? তাই তো, আমি কে? এক মুহূর্তর জন্য শুদ্ধ নিজের মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়েছিল! কী পরিচয় দেবে, কী পরিচয় আছে ওর দেবার মতো, সহসা ভেবে পায়নি। বোধ হয় নিজের নাম দিয়েই শুরু করেছিল, ‘আমার নাম শুদ্ধ। আমাকে চিনবেন না। ঢাকা থেকে এসেছি। কবিরের এক বন্ধু ওর কথা বলেছিল, তাই দেখা করতে এলাম।’
মেয়েটা আর কিছু বলল না। তবে ওর চোখে নীরব একটা সমর্থন ছিল। চোখের ইশারাতেই যেন ওকে ফলো করতে বলেছিল। এবং ওরা নিজেদের অজান্তেই হাঁটতে শুরু করেছিল বাড়ির পথে। টিনের বেড়ার গেটটার মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল শুদ্ধ। বাড়িতে আর ঢুকেনি। কিসের সংকোচ ওকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। মেয়েটাই বা বলবে কেন ভেতরে যেতে! একেবারেই অচেনা মানুষ। বেড়ার সরু গেট পেরিয়ে চঞ্চল পায়ে ঢুকে পড়েছিল ভেতরে। একটু পরই ফিরে এসে জানিয়েছিল, ‘ভাইয়া তো নাই। আপনি কি বসবেন?’
আজো শুদ্ধ নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। ও বসেনি। কী যে আবালের মতো বলে ফেলেছিল, ‘না। আজ আর বসবো না। আমি না হয় সময় পেলে কাল একবার আসবো!’ আরে বাবা! সেদিন যদি তুমি ওই বাড়িটায় আধাঘণ্টা কী একঘণ্টাও বসতে! কবিরের জন্য অপেক্ষার অজুহাতে কাটাতে সময়, মেয়েটির সঙ্গে তো তোমার আলাপের একটা ভালোই বৈতরণী তৈরি হতে পারতো! সে সূত্র ধরে তো অন্তত সম্পর্কটা আজ গাঢ় হতে পারতো! নিবিড়তায় পৌঁছানোর একটা ভালোই সম্ভাবনা ছিল! তা না, তুমি সুড় সুড় করে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে চাইলে! মেয়েটিই বরং উলটো বিহ্বল শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘ভাইয়াকে কি বলবো?’
‘আমি আসলে উনার এক বন্ধুর রেফারেন্সে এসেছি। কবির সাহেব আমাকে ঠিক চিনবেন না। কাল এসে উনাকে সব বুঝিয়ে বললেই বুঝবেন!’ ও ভালোমানুষের মতো নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে চেয়েছিল সেদিন। আমি যে সুযোগ পেলেই একটা মেয়েকে ভজিয়ে ফেলব এমন চরিত্রের ছেলে নই আমি। যেন ভেতর থেকে এমন একটা কিছু বুঝিয়ে দেবার প্রাণপণ চেষ্টা সব সময়ই ওর মধ্যে জারিত থাকে। এই যে নিজের চরিত্রের ভালোমানুষি বোধটাকে বজায় রাখা, একটুও অভিনয় বা ভান না করতে পারার প্রবণতা, এটাই যে ওর চরিত্রের প্রধানতম দুর্বলতা, এটা ও সেদিন উপলব্ধি করতে পারেনি। এইটুকু অভিনয় বা রংঢং করতে না পারার ক্ষমতাই যে রেবাকে ওর থেকে দূরে ছিটকে দিয়েছে, তাতে আর সন্দেহ কী!
কণে দেখা আলোয় পাওয়া মেয়েটা আর কথা বাড়ায়নি। ‘ঠিক আছে আসবেন’ বলে শুদ্ধকে বিদায় জানিয়েছিল গেট থেকেই। (চলবে)

ছবিঃ প্রাণের বাংলা