শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

বাইশ
প্রকাশ্যে দিনদুপুরে সবার সামনে মেয়েমানুষের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি অন্তত এদেশের কেউ বরদাস্ত করতে পারে না। শুধু এদেশের কেন, সম্ভবত কোনো দেশের মানুষের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব না। ওর নাকেমুখে একের পর এক ঘুষি কোথ থেকে যে আছড়ে পড়ে শুদ্ধ দিশ খুঁজে পায় না। কীভাবে পাবে দিশ। একজন দুজন কি জুটেছে! পুরো ভিড় যেন আজ ওকে ছিঁড়ে খাবে! নাকেমুখে তো ঘুষি পড়ছেই। গায়ে-গতরেও এসে লাগছে মুষ্ঠাঘাত, চড়চাপড়! পেটের ডান সাইটটা ব্যথায় মুচড়ে যাচ্ছে। কারো এক প্রচণ্ড ঘুষি ও আর সামলাতে পারলো না, ছিটকে পড়লো মাটিতে। নাক দিয়ে ছুটে এলো রক্তের ধারা। হাতে ছুঁয়ে সে রক্ত দেখে ওর হুঁশ হারানোর জো হয়। তবু যেন রেহাই নেই। এবার বাগে পেয়ে শুরু হয় লাথির ঝড়। তবু ভালো দয়াপরবশ হয়েই যেন একজন ওর চুলের ঝুটি ধরে মাটি থেকে টেনে দাঁড় করালো। যেন ওর চেহারাটা সবাইকে দেখানোটা অতি জরুরি, দ্যাখ দ্যাখ লম্পট কাকে বলে, ভালো করে তাাকিয়ে দ্যাখ। আবার ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে গালেমুখে থাপড়ের পর থাপড়ের ঝাপটা চলতেই থাকে। আর মেয়েটিকে ঘিরে সহানুভূতি বৃষ্টির অযুত বর্ষণের ধারা নিক্ষেপিত হয়।
একে তো হঠাৎ মানুষগুলোর স্বরূপে আবির্ভূত হওয়া! কীভাবেই বা ওরা জড়বৎ পদার্থে পরিণত হয়েছিল আর কীভাবেই বা ফিরে পেল প্রাণের সত্তা; তা ভেবে ভেবে ওর অবস্থা দিশেহারা! তার ওপর আবার আচমকা মারের এই বেশুমার ঝড়- ঘটনার আকস্মিকতায় শুদ্ধ হতবিহ্বল! ও কী করবে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না! একরকম মৃত্যুর কাছেই যেন নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে। গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার ঘটনা ও শুনেছে। নিজেই যে কখনো তার শিকার হবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। হতাশায় নিজেকে যখন ছেড়ে দিয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তার কোলে যে, মার! আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দে! মেরে শুইয়ে দে মাটির কবরে; যখন ও নিজেকে এক রকম শপেই দিয়েছে মৃত্যুর কাছে; ঠিক তখনই কোথা থেকে ছুটে আসে এক দশাসই বলীয়ান মানুষ; লোকটি যেমন লম্বা তেমনই স্বাস্থ্যবান ক্লিন শেভড, কাঁচাপাকা চুল, চেহারায় বেশ ঋজুতা, বয়স ষাটোর্ধ্ব হবে, তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে ভারী তরতাজা এবং বলিষ্ঠ, সে আচমকাই শুদ্ধর কাছে এসে বেশ একটা ঘোরপাক খেয়ে সবাইকে ঝামটায় ঝামটায় সরিয়ে বজ্রমেঘ গর্জনে হুংকার দিয়ে উঠলো, অ্যাই অ্যাই! কী করছো তোমরা? কাকে মারছো? কেন মারছো?
দশাসই ভদ্রলোকের উচ্চনাদে যেন ভিড়ের কন্ঠ চাপা পড়ে গেল। ভদ্রলোক সুরক্ষার ঢাল হয়ে শুদ্ধকে এমনভাবে আগলে দাঁড়াল যে, ওকে ভেদ করে কেউ আর স্বচ্ছন্দে চালাতে পারলো না কিলঘুষি। তবুও কারোর লাফালাফির শেষ নেই। শুদ্ধকে মারার নেশায় বুঁদ লোকজন দশাসই ভদ্রলোককে ঠেলেঠুলেই চড়াও হতে চাইলো ওর ওপর। ও একটা লম্পট। দিনদুপুরে মেয়েমানুষের শরীরে হাত দিয়েছে! ওরা মরীয়া হয়ে দশাসই লোকটিকে বোঝাতে চায়।
কোন মেয়েমানুষের শরীরে হাত দিয়েছে? কার ওপর? দেখান দেখি! দশাসই ভদ্রলোক আগ্রাসী চোখেমুখে জনবিস্ফোরণের দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে জানতে চায়। মা-বোনতো ওরও আছে নাকি? দেখান তো দেখি কোন মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে! মেয়েটা যদি বলে আমি নিজে এর বিচার করবো!
অতি উৎসাহীরা তখন তখনই নিজেরা দায়িত্ব নিয়েই মেয়েটিকে খুঁজতে শুরু করের এবং ব্যর্থ হয়, আরে! মেয়েটা তো এখানেই ছিল! এখানেই তো ছিল মেয়েটা! গেল কোথায়? উনিই তো বললেন আমাদের।
কোথায়? খুঁজে বের করেন? আমি ভিকটিমের মুখ থেকে শুনতে চাই!
আরে কি মুশকিল এখানেই তো ছিল মেয়েটা!
আপনারা কিন্তু ফেঁসে যাবেন। প্রমাণ ছাড়া একটা ভদ্রছেলের গায়ে হাত তুলেছেন। ওর কিছু হলে কিন্তু কেউই রেহাই পাবেন না। কেউ পাবেন না রেহাই। আবারো যেন বজ্রগর্জন হলো। নিস্তব্ধ হয়ে গেল ভিড়। ভদ্রলোকের চ্যালেঞ্জের মুখে কেমন নেতিয়ে পড়লো। আপনারা জানেন না কার ওপর হাত তুলেছেন আপনারা, কার ওপর!
কার ওপর হাত তুলেছে সে-কৌতূহলও দেখাতে চাইলো না কেউ। আস্তে আস্তে লোকজন মানে মানে কেটে পড়লো। কেউ কেউ হাল না ছেড়ে আবার মেয়েটিকে খুঁজতে লাগলো। কোথায় গেল মেয়েটা? লোকজনকে জড়ো করে কখন কীভাবে সটকে পড়লোা! ভিকটিমই যদি না থাকে অভিযোগ তুলবে কীভাবে! চকিতেই কারো কারো মধ্যে সন্দেহ হয় কেউ কি মেয়েটাকে সরিয়ে ফেলেছে? না, তা সরাবে কেন বা কখন সরাবে। সম্ভবত মেয়েটিই নিজের ইজ্জতের কথা চিন্তা করে নিজে নিজেই চলে গেছে। তাহলে আমাদেরর কি আর কাজ নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর। ভিড় দেখতে দেখতে পাতলা হয়ে যায়।
দশাসই লোকটির হুংকার তবু কমে না। কামানের গোলার মতো বোম্বিং শেল ছুঁড়েন, কাক নিয়েছে চিলে আর অমনি ছুটলাম সেই কাকের পিছনে। যত্তসব ভোগাস। ভাগুন আপনারা। যার যার নিজের কাজ করুন। একটা ভালো ছেলেকে এসে কথা নেই বার্তা নেই ধরে ধরে পিটাচ্ছেন। খেয়েদেয়ে কাজ নেই কারো। যান যান যার যার রাস্তা দেখেন।
যারাও বা দু’চারজন ছিল, তারাও আর দাঁড়ায় না। সুড়–ৎ সুড়–ৎ সটকে পড়ে। দশাসই ভদ্রলোক শুদ্ধর আরো ঘনিষ্ঠ হয়। ওর স্কাই ব্লু শার্ট ঝেড়েঝুড়ে ধুলি সরায়। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করের ওর নাক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে দেয়। রক্ত সহজে মুছতে চায় না। এর মধ্যেই জমাট বেঁধে গেছে। শুদ্ধ ভদ্রলোকের দিকে অভিভূত চোখে তাকিয়ে থাকে। ওর মুখের ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে কৃতজ্ঞতার আবেশ। লোকটিও যেন বুঝে সে-ভাষা। শুদ্ধর কাঁধে হাত রেখে জানতে চায়, বাবা! তুমি এখানে কেন এসেছো? কোথায় যাবে তুমি?
ও মৃদুস্বরে জানায়, তেঁতুলিয়া। আমি তেঁতুলিয়া যাবো আংকেল!
ওহ! কেন? প্রশ্ন করতে গিয়েও যেন নিজের কৌতূহল নিবারণ করতে চান দশাসই ভদ্রলোক। স্নেহসুধারস ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, যাবে কীভাবে? বাসে?
জি। বাসে।
তা টিকেট কেটেছো তো? নাকি?
না না! কখন কাটবো? এসেই তো দেখছি এখানকার লোকজন সবাই পাথর হয়ে গেছে।
ভদ্রলোকের কন্ঠে সহানুভূতি ঝরে, হা বাবা। কিছু মনে করো না। মানুষ আর মানুষ নাই। পাথর হয়ে গেছে। তা নইলে এভাবে তোমাকে মারতে পারে? মানুষ থাকলে পারতো না।
আপনি না এলে যে কী হতো? আমি ভাবতেই পারছি না।
সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা। চলো বাবা। তোমাকে বাসের টিকেট কেটে দেই।
শুদ্ধ আবারো ভদ্রলোকের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়। কোথায় দেখেছে মানুষটাকে? কোথায়? এতো চেনা চেনা লাগছে কেন?
এসো বাবা এসো। ভদ্রলোক শুদ্ধকে ওর সঙ্গে যেতে ইঙ্গিত দেয়। শুদ্ধ দশাসই ভদ্রলোককে অনুসরণ করে। (চলবে)

ছবি: প্রাণের বাংলা