শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার

পাঁচ

যতীন স্যারের কাছেই তোমার কথা শুনেছি। তুমি নাকি খুব সুন্দর কবিতা লেখো? স্যার খুব প্রশংসা করতেন তোমার।
তাই নাকি? রেবার কথা শুনে ভারি অবাক হয়েছিল শুদ্ধ। যতীন স্যার তো উলটো কবিতা লিখতো বলে ওকে খুব ধমকাতো। বলতো আগে এসএসসি পাশ করে নাও। তারপর লিখো যত ইচ্ছে ওসব ছাইপাশ। হ্যাঁ, মনে আছে কবিতাকে তিনি ছাইপাশই বলেছিলেন। কীভাবে কীভাবে যেন ওর অংকখাতায় আলগা কাগজে আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন কয়েকটি কবিতা। ওগুলো সরিয়ে রাখতে খেয়াল ছিল না। শুদ্ধর তখন আলাদা একটা বাইন্ডিং খাতাই ছিল কবিতা লেখার। সেখানেই সব কবিতা উঠিয়ে রাখতো। তবে কবিতা নিয়ে ধমকানির আরেকটা কারণও ছিল। স্যার মার কাছ থেকে আগেই নোটিশ পেয়েছিলেন যে, ছেলেটার মাথায় কবিতা লেখার ভূত চেপেছে আর পড়ালেখায় খুব অমনোযোগী, আপনি যদি ওকে অংকটা না দেখান ও মেট্রিক পাশ করতে পারবে না। কথাটা মা মিথ্যে বলেনি। নাইনের প্রথম সাময়িক, দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় ও জিরো পেয়েছে, টেইনে ওঠার সময় অল্পের জন্য পাশ করতে পারেনি। অংকের ভয়ে সায়েন্স নেয়নি। কিন্তু হিউম্যানিটিজের এইসব অংক অ্যালজেব্রা আর ত্রিকোণিমিতিকে উৎরাবে কেমন করে! তখন অংকের মাস্টার হিসেবে যতীন স্যারের খুব নামডাক! মা একদিন ওকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন কাশিমপুর স্কুলে! স্যার আমার ছেলেটাকে একটু দেখেন! তা, স্যারের হৃদয় ঠিকই গলেছিল। স্কুলেরই গা-লাগোয়া পুকুরপারের একটা রুমে কোনোমতো মাথা গুঁজে থাকতেন স্যার।
আমিও স্যারের কাছে পড়তাম। আমাদের বাসায় যেতেন পড়াতে। স্যারের কাছে তোমার কথা শুনে খুব অবাক হয়েছি, তোমাদের এখানে তো কেউ আউট বই পড়ে না। সেখানে তুমি কবিতা লেখো। শরৎচন্দ্র পড়ো। এটা তো বিশাল ব্যাপার! স্যার তো তোমার সব কথাই জানতেন! এনিওয়ে অসীমও বলতো তোমার কথা! তোমাকে তো ওর সঙ্গে স্কুলেও দেখেছি, কী ঠিক না? স্পোর্টস ডেতে! তুমি হয়তো আমাকে খেয়াল করোনি-
এটুকু বলেই যদি ক্ষান্ত দিত রেবা, তা না, ওর শেষটুকু শুনে শুদ্ধর লজ্জা-সংকোচে একেবারে মরে যাওয়ার অবস্থা, আর রাস্তায় তো তোমাকে প্রায়ই দেখি!
সব্বোনাশ! ও যে ক্যাবলার মতো জামতলায় দাঁড়িয়ে রেবার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, ও সবকিছু বুঝে ফেলেনি তো? তখন কে জানতো যে কখনো এভাবে ওর মুখোমুখি হতে হবে! ভাগ্যিস রেবা আর ওদিকে এগোয়নি, কথা টার্ন করেছিল, কোথায় অ্যাডমিশন নিয়েছো বললে না তো!
অ্যাডমিশন নেইনি তো। এই যে এখন নিতে যাচ্ছি ভাওয়াল কলেজে!
ওর কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল রেবা, আমিও তো যাচ্ছি। ভাওয়াল কলেজেই অ্যাডমিশন নিব। তারপর ওর ছোটো ভাইয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, বাপি! তুই চলে যা! তোকে আর লাগবে না।
ছুটি পাওয়ামাত্রই লাফাতে লাফাতে চলে গিয়েছিল বাপি। ওর যাওয়ার ভঙ্গি দেখে রেবা আর শুদ্ধ দুজনেই হেসে উঠেছিল। যেন উনিশশ একাত্তরের আরেকটা ষোলোই ডিসেম্বর। রেবাও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, আর বলো না! কী যে ক্যারাম খেলার নেশা। এখনই গিয়ে শুরু করবে। বেচারা তো আসতেই চাচ্ছিল না, আব্বা-মা জোর করে পাঠিয়েছেন। জানো, এখনো ওরা আমাকে একা ছাড়তে চান না। বলো তো এর কোনো মানে আছে? যাক বাবা! তোমাকে তো পেয়েছি!
একসঙ্গে এতো প্রাপ্তি! দেখার তো দেখা হওয়া, আরো- যাকে বলে সঙ্গে জুটে যাওয়া! ভেতরে ভেতরে শুদ্ধ বিহ্বল চিত্তচঞ্চল। এই সেই বিছানায় মাঝরাতে আসা জোছনার অপার্থিব মাধুর্য, তুরাগ নদের সূর্যের আলোর ঝিলিমিলি বিকিরণ! কী সুন্দর সেই হিরন্ময়তা দেখো মূর্তিমান রেবা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখের সামনে। হাত নাড়াচ্ছে, পা দোলাচ্ছে, কথা বলছে, একসঙ্গে যেতে চাইছে কলেজে! অনাস্বাদনীয় পুলকে ভাসতে ভাসতে ওর সঙ্গে সেদিন বাসে ওঠে কলেজে গিয়েছিল, ভর্তি হয়ে এসেছিল। তারপর ফেরার সময় আরো একধাপ চমকিত হওয়ার পালা। কোনাবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে নেমেই রেবার গার্জেনগিরি, এখনো তো পড়ালেখা শুরু হয়নি। তুমি বাসায় গিয়ে কী করবে? চলো আমার সঙ্গে, আব্বা মার সঙ্গে পরিচয় হবে।
বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব পেয়ে মন খুশিতে যেমন নেচে উঠেছিল, জড়তাও তাড়াতে পারছিল না। অজানা অচেনা একটা বাসা! রেবার মা-বাবা কী না কী ভাববে!
ওর মনের ভাষা বুঝি পড়তে পেরেছিল রেবা! ধমকে উঠেছিল, ধুর! চলো তো! কিচ্ছু হবে না। আমাদের বাসার সবাই ব্রড মাইন্ডেড!
স্বয়ং রাজকন্যাই যেহেতু নিয়ে যেতে চাইছে, রাজবাড়ির দ্বার তো তখন অবারিত হওয়ারই কথা! তাছাড়া যৌবনের লালঘোড়াটার অশ্বক্ষুর তো ছুটে যাওয়ার জন্য মুখিয়েই ছিলো!
রেবার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল ওদের সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে। মেইন রোডের পাশেই ছিল ভবঘুরে কেন্দ্রটা। যেখানে আশ্রিত ছিল যত অনাথ দুস্থ অসহায় মানুষ। যাদের ঘরবাড়ি নেই, স্বজন-পরিবার নেই। পথেঘাটে ঘুমাতো। ভিক্ষে করে চালাতো জীবন। তাদেরকে রাস্তাঘাট বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে ধরে এনে সেঁধিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। এরমধ্যে যেমন পঙ্গু অথর্ব মানুষ রয়েছে, রয়েছে ভাসমান পতিতাও। যারা বিভিন্ন পতিতালয় উচ্ছেদের পর কোথাও একটু সামান্য ঠাঁইও পাচ্ছিল না। কাশিমপুর জমিদার বাড়িতে পুনর্বাসন কেন্দ্র করে যেমন তাদের আশ্রয় দেওয়া হলো, নতুন আরেকটি কেন্দ্র খোলা হলো এই কোনাবাড়িতে।
গেট দিয়ে ঢুকলেই হাতের বামদিকে চারতলা ভবনের বিশাল আশ্রয় কেন্দ্রটা রেখে সোজা ইটের সলিংঅলা পথে হেঁটে যেতে হতো সামনের দিক। তারপর আবার ডান দিকে টার্ন নিয়ে কিছুদূর হাঁটলেই সামনে পড়তো ওদের নির্জন স্টাফ কোয়ার্টার। পরপর চারটে একই ছাঁচের একতলা বাড়ি। যার প্রথমটাতেই থাকতো রেবারা। চারপাশটা ঘন গাছপালা। নিরিবিলি ছিমছাম পরিবেশ। রেবার স্বভাবের ঠিক বিপরীত। রেবা তো সারাক্ষণ কথা বলতেই থাকলো। কথা বলতে বুঝি খুব ভালো লাগে ওর। অনর্গল কথা। রেবার মাও প্রাণচঞ্চল সরবা মানুষ। মেতে ওঠেছিল আপ্যায়নে। তুমি কি খেতে ভালোবাসো বাবা? ফ্রিজ খুলে এটা দেয় ওটা সাধে। মনেই হয়নি যে, ও কোনো নতুন বাড়িতে গিয়েছে, নতুন জায়গায়। যেন কতদিনের চেনা, কত আপন।
শুদ্ধ বসেছিল রেবাদের ড্রয়িংরুমে। টেলিভিশন সেটের পাশেই একটি বইয়ের র‌্যাক দেখে ও কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল ওটার সামনে। ফাল্গুনী, নীহাররঞ্জন, শংকর, শরৎচন্দ্র, সুকান্তর সঙ্গে রবীন্দ্র-নজরুল, সঞ্চিতা-সঞ্চয়িতা! দেখে রেবার প্রতি ওর ভালো লাগা আরো বেড়ে গিয়েছিল। ও কিছুতেই রেবার দিক থেকে মুখ ফেরাতে পারছিল না। (চলবে)

ছবিঃ প্রাণের বাংলা