শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

চব্বিশ.

না না, আংকেল। আমার কিচ্ছু হয়নি। শুদ্ধ তৎপর হয়ে ওঠে এবং আশ্চর্য যে ঝটিতিই এক মোচড়ে ক্যানের মুখটা চটপট ভঙ্গিতে খুলে ফেলে। তারপর কোমর ভেঙে মাথা নিচু করে পানি ছিটিয়ে ভালোমতো হাতমুখ ধুয়ে নেয়। বিশেষ করে নাকের নিচের জায়গাটা, যেখানে রক্ত জমাট বেঁধেছিল, ঘষে ঘষে তুলতে হয় ওকে। একটু কষ্টই লাগে। পানির ছোঁয়া পেয়ে জায়গাটা জ্বলছে। ওপরের ঠোঁটের একপাশ সামান্য চিরেও গেছে টের পায়। রক্ত কি সেখান থেকেই ঝরছিল নাকি নাক থেকে? সম্ভবত নাক থেকে। নাকটা যেন একটু ফুলেও রয়েছে।
মুখহাত ধুয়ে ব্যাগ থেকে গামছা বের করে মুখ ভালোমতো মুছে নিল শুদ্ধ। বেশ ফ্রেশই লাগছে এখন ও অনুভব করে। দশাসই ভদ্রলোক কাছে এসে জানতে চায়, কিছু খাবে তুমি? ক্ষুধা লেগেছে? ক্ষুধার কথা শুনেই পেটটা যেন চোঁ চোঁ করে উঠলো। কিন্তু যদি বলে ক্ষুধা লেগেছে আংকেল আর দেরি করবে না, অযাচিতভাবেই আবারো খরচ করা শুরু করবে। ওকে পকেটে হাত ঢোকাতেই দেবে না। নিজের টাকায় মাম কিনেছে। শুদ্ধ কথা না বলে ক্ষিপ্র বেগে দোকানের দিকে এগোয়। আংকেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝটপট দুটো কেক, দুটো কলা, একটা বিস্কুটের ছোট প্যাক, আর একটা ছোট সাইজের মামের ক্যান কিনে নেয়। তারপর আংকেলের সামনে খাবারগুলো তুলে ধরে, জি ক্ষিধা তো লেগেছিলই। এতো মার খেলে কি পেটে কিছু থাকে?
শুদ্ধর কথা শুনে দশাসই ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলো। মিয়া, খুব তো হাসতেছো। আমি না আসলে অবস্থাটা কি হতো, চিন্তা করে দেখো।
না না। আংকেল। ও ব্যাপারটা একদমই মাথায় আনতে চাই না।
আংকেলও খুশি হয়ে উঠলো, ইয়েস! স্মৃতি থেকে একদম সিজার করে ফেলো। তারপর একটা কেক ডান হাতে নিতে নিতে বললো, এত কিছু কিনেছো কেন?
কই আর কিনলাম। এখানে তো কিছুই পেলাম না আপনাকে খাওয়ানোর মতো।
আর এখন কী খাব বাবা? খাওয়ার বয়স কি আর আছে? খুব হিসেব করে খেতে হয়।
দুজন মিলে কেক, বিস্কুট আর কলা কোনোমতো গলাধ:করণ করলো। তারপর পানি পান করে পাশের দোকানে গিয়ে চায়েরও অর্ডার দিল।
চায়ে চুমুক দিতে দিতেই ভদ্রলোক হঠাৎ যেন মনে পড়লো এমন ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন, অ্যাই দেখো তোমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছি অথচ তোমার নামই জানা হলো না।
শুদ্ধ। আমি একটা বিজ্ঞাপনী ফার্মে জব করি। ক্রিয়েটিভ সেকশনে। এই অনুবাদ করতে হয়, জিঙ্গেল লিখতে হয়, কপি টিভিসি এইসব হাবিজাবি। কাজের কোনো শেষ নেই। রাতদিন খাঁটতে হয় আংকেল। যেন একটা নালিশ করার সুর ঝরে পড়ে ওর কন্ঠ থেকে।
মনে হচ্ছে, তুমি তোমার জবটাকে এনজয় করো না।
একদমই না আংকেল। একদমই না।
তাহলে জবটা চেঞ্জ করলেই পারো।
তেমন কোনো বিকল্প পাচ্ছি না। তারপর একটু থেমে ও যেন সত্যি কথাটা না বলার দায় এড়াতে চায়, আসলে আমার তেমন উদ্যোগ নেই। এই যা করছি, করে খাচ্ছি, এভাবে চলে গেলেই হলো। এরকম একটা অবস্থা আর কি!
ঠিক না, ঠিক না বাবা। ভিশন থাকতে হবে। ভিশন থাকাটা খুব জরুরি। তা না হলে সামনের দিকে এগোবে কীভাবে।
সেই স্পৃহাটাই তো নাই। হারিয়ে ফেলেছি। তারপর যেন শুদ্ধ নিজের প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলো। কথার স্রোত বদলাতেই যেন জিজ্ঞেস করে উঠলো, আংকেল! আপনার পরিচয়টাও কিন্তু জানা হলো না। তবে আপনাকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি। কোথায় যে দেখেছি কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কোথায় দেখেছি বলেন তো?
কোথায়? ভদ্রলোকও গভীর চোখে তাকান শুদ্ধর দিকে। তারপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলেন, আমার তো মনে পড়ছে না।
শুদ্ধ যেন সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। জানতে চায়, আচ্ছা আংকেল আপনি কোথায় থাকেন?
তখনই ভদ্রলোক চায়ের বিল মেটাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে। আরেকদিন নিশশ্চয়ই কোথাও দেখা হয়ে যাবে, তখন বলবো। চলো বাবা। তোমার টিকেটটা কেটে দেই। কত দূরে যাবে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে তো অনেক রাত হয়ে যাবে। চলো চলো। আর দেরি করো না।
দশাসই ভদ্রলোক শুদ্ধকে প্রায় প্রায় ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে যায়।

শুদ্ধ আর কোনোকিছুতেই অবাক হচ্ছে না। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাটুকুও যেন ওর লোপ পেয়েছে। এই যে এখন আবার সবকিছুই চলছে স্বাভাবিকভাবে স্বতস্ফূর্ত! কীভাবে সম্ভব হলো? গাড়ি চলছে মানুষ চলছে জীবনচক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তাহলে স্থবিরতা কেমন করে নেমে এসেছিল- সে এক ভীষণ গোলকধাঁধাই বটে। যার চক্করে পড়লে যেন ঘূর্ণনের শেষ নেই। রহস্যের জটাজট কখনোই খুলবে না। সেই জটিল আবর্তে আর খেই হারানোর কোনো ইচ্ছে নেই, স্থৈর্যও। কোনোকিছু নিয়েই ওর মধ্যে আর সামান্য কৌতূহলও এখন কাজ করছে না। যেন জীবনপাত্রের কোনো এক অপূর্ব মঞ্চনাট্য নির্দেশিত হচ্ছে ওকে ঘিরে, অলৌকিক সব সম্ভার নিয়ে। সেইসব দৃশ্যপটে শুধু ভেসে যাওয়াটাই মুখ্য!
দশাসই ভদ্রলোককে অনুসরণ করে যেতে যেতে ও দেখে সেই খুনখুনে বুড়োকে, যে মানুষটি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়েছিল এবং যার ব্যাগটা নিজে বইবার জন্য শুদ্ধ অনেক টানাটানি করেছে, কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে পারেনি, এখন দেখো সেই খুনখুনে বুড়ো মানুষটি সেই ভারী ব্যাগটি হাতে নিয়েই কেমন কুঁজো হয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে। কোন দিকে যেতে চাইছে ও? কোনো বাসে ওঠবে নাকি বাসের টিকেট কাটবে? বুড়োর জন্য শুদ্ধর মনে খুব মায়া হয়। এমন খুনখুনে মৃতপ্রায় একজন মানুষকে বাড়ি থেকে কেউ একা ছাড়ে? ছাড়তে পারে? স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে তো কোথাও হারিয়েও যেতে পারে যে কোনোখানে। এমন বয়সী মানুষই তো হারিয়ে যায় অথবা পথ পারাপার করতে গিয়ে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়। বুড়োর প্রতি অপার মায়ায় শুদ্ধ যেই না সেদিকে রওনা দেবে, অমনি ওর হাতটা খপ করে ধরে ফেললো দশাসই ভদ্রলোক। কী হয়েছে বাবা?
বুড়ো মানুষটা ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে পারছে না। শুদ্ধ হাতের ইশারায় দেখালো খুনখুনে মানুষটাকে।
কী করতে চাও তুমি?
একটু এগিয়ে দিয়ে আসতাম।
কতদূর এগিয়ে দেবে?
বাস পর্যন্ত!
ও কি বাসের জন্যই হাঁটছে?
তাতো জানি না।
শোনো এই বুড়ো মানুষটা স্টেশন পর্যন্ত একা একাই পৌঁছাতে পেরেছে, বাস পর্যন্ত একাই যেতে পারবে। ওকে ওর মতো বাঁচতে দাও। করুণা দেখানোর দরকার কি? যদি পুরো পথটা পৌঁছে দিতে পারতে, বলতাম দিয়ে এসো ওকে ওর গন্তব্য পর্যন্ত। এটুকু মায়া দেখিয়ে লাভ কি? তোমার গন্তব্যে তুমি ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারো কিনা, এখন সে কথাটাই ভাবো। এসো আমার সঙ্গে এসো। (চলবে)