শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

ছাব্বিশ

তখন কটা বাজে। সকাল সাতটা কী সাড়ে সাতটা! কেবল রোদ কোমলতা হারাতে শুরু করেছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে প্রকৃতি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের বিপরীত দিকের গেট দিয়ে ঢুকে ও রমনা পার্কের ভেতরের রাস্তায় লোকজন ঠেলেঠুলে মূলমঞ্চের দিকে এগোচ্ছিল। মঞ্চ বরাবর এসে এবার ওকে ডানদিকে টার্ন নিতে হবে, সরু একটা পথে। তাহলেই ও যেতে পারবে মূলমঞ্চের সামনে। যেখানে বসে শিল্পীদের মুখ ভালোভাবে দেখা যাবে। গান শুনতে পারবে হৃদয়প্রাণ উজাড় করে। কিন্তু সেই ডানদিকেই টার্ন নেওয়া হয় না। এতো মানুষ ভেতরের দিকে যাচ্ছে আর উঠেও আসছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওঠেও আসছিল, বোধ হয় ভোররাত থেকে বসে থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠছিল এক একজন, দম ফেলার জন্য বেরিয়ে আসতে হচ্ছিল। সেখানে আবার মুহূর্তেই ভরে যাচ্ছিল নতুন মানুষে। তাই সেই সরু পথ দিয়ে ঢোকাটা শুধু মুশকিলই মনে হচ্ছিল না, দুঃসহও লাগছিল। ছায়ানটের এ অনুষ্ঠানে এমন অভিজ্ঞতা ওর আগে কখনো হয়নি। ও কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। লোকজনকে দলামুচড়া করে মঞ্চের দিকে যাবে, নাকি পেছনের দিকে কোথাও শান্তিমতো দাঁড়াবে!
ঠিক তখনি সেই দশাসই মানুষটি বুঝি ওর মতোই দাঁড়িয়েছিল ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় পাশাপাশি, শুদ্ধর চোখের দিকে চোখ রেখে যেন নিজেরই সরে যাওয়ার সমর্থনে বলে উঠলো, চলো বাবা! ওই গাছটার ছায়ায় দাঁড়াই, ভেতরে আজ যাওয়া যাবে না মনে হচ্ছে। ভদ্রলোকের চেহারা আর আহ্বানে কী ছিল, তাছাড়া ও নিজেও যখন সরে যাওয়ার কথাই ভাবছিল, ভদ্রলোকের কথায় সায় দিয়ে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলো। তখন ছায়ানটের শিল্পীদের কন্ঠে বেজে চলেছে, একি অপরূপ রূপে মা তোমায়/ হেরিনু পল্লী জননী।
গানের আবেশে হেঁটে হেঁটে ওরা দুজন বেশ কয়েক গজ দূরে রাস্তার পাশ ঘেঁষা একটা গাছের ছায়ার নিচে কেবল দাঁড়িয়েছে কী দাঁড়ায়নি, অমনি দেখো বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ। এতো জোরে শব্দ যে শুদ্ধর কান ফেটে যাওয়ার জোগাড় হলো। ও দু’কানে হাত দিয়ে বসে পড়েছিল। কিছু একটা যে ঘটে যাচ্ছে ভয়ানক বুঝতে পেরে বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। মুহূর্তেই উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মঞ্চমুখী তাকিয়ে শুধু দেখলো, ও যেখানে দাঁড়িয়ে মঞ্চে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল, ঠিক সে-জায়গাকে ঘিরেই ধোঁয়া উড়ছে। বিপুল ধোয়া। সেই সঙ্গে মানুষের আর্ত চিৎকার। যে যেভাবে পারছে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছে উর্ধ্বশ্বাসে। কার ওপর যে কে এসে পড়ছে ঠিক নেই। একজন আরেকজনকে দলেমলেই যাচ্ছিল। কান্নার ধ্বনি কাতরানি থেকে থেকে বাজছিল। শুদ্ধ তখন কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না, কোথায় কী হচ্ছে না জেনে আন্দাজে দৌড়ানোটাও কী ঠিক হবে? তাহলে হয়তো মানুষের পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা যেতে হবে। ও গাছটার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মুহূর্তেই মঞ্চের সামনের জায়গাটা প্রায় ফাঁকা হয়ে উঠলো আর ধোঁয়াও গেল মিলিয়ে।
ততক্ষণে শুদ্ধর কাছে অনেককিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ও নিজে নিজেই পায়ে পায়ে এগিয়েছিল সামনের দিকে। তারপর যে বীভৎস দৃশ্য দেখলো, কোনোদিন এমন পরিস্থিতির কথা কখনো কল্পনাও করেনি। টুকরো টুকরো ছড়িয়ে আছে মানুষের দেহ। ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে ঘাসে মাটিতে জায়গায় জায়গায়। ক্ষত-বিক্ষত আহত মানুষগুলো কাতরাচ্ছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। বারুদ বারুদ কেমন একটা পোড়া মিশ্রিত ঝাঁঝালো গন্ধ। শুদ্ধর মাথাটা কেমন চক্কর মেরে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল ও নিজেও বুঝি ক্ষতাক্ত হয়ে আছে। কোনোমতো বয়ে বেড়াচ্ছে নিজের লাশ। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। না। মরেনি, এখনো মরে যায়নি ও। এখনো অক্ষত আছে। নিচ্ছে শ্বাস। শরীরের কোথাও লেগে নেই একবিন্দু রক্ত। তবু টের পাচ্ছিল বুকের ভেতর অজস্র রক্তপাত হচ্ছে। রক্তের স্রোত বয়ে চলেছে অবিরাম ধারায়! কী হলো এটা? কেন হলো? এসব ভাবার অবকাশ তখন ওর ছিল না। তখনো একটা দমবন্ধ অস্থিরতা একটা তীব্র ভয় ওকে জড় বানিয়েছিল, ওকে মূঢ় করে রেখেছিল অনেক অনেকক্ষণ। তারপর একটু থিতু হতেই চেতনা একটু জাগ্রত হতেই ওর মনে পড়েছিল সেই মানুষটার কথা। যে কিনা ওকে ওখান থেকে ওই বোমা বিস্ফোরণের জায়গা থেকে চকিত দেখার উদ্ভাসেই সরিয়ে নিয়েছিল সম্মোহিত মায়াজালে। কোথা থেকে এলো মানুষটা! কেন এলো, কেনইবা অপরিচিত হয়েও ওকে কথার ধাক্কায় কথার সম্মোহনে এখান থেকে সরিয়ে নিল! যদি না ও সরতো তখন মৃত্যুই ছিল অনিবার্য। ওর শরীরটাও এমন টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থাকতো রমনার ঘাসে ঘাসে।
কোথায় সেই ভদ্রলোক? ও আবার সেই ছায়াঢাকা গাছটার দিকে এগোয়। নেই, আশপাশে কোথাও নেই! ভীড়ের ভেতর কোথায় হারিয়ে গেছেন কে জানে। নাকি আতংকে চলে গেছেন রমনা পার্ক ছেড়ে! মানুষটাকে অন্তত একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেও যেন শান্তি পেত। ও এক অবশ চৈতন্য নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল পার্ক থেকে মানুষটাকে খুঁজতে খুঁজতেই, নাকি পালিয়ে বাঁচতে? তখনো একটা বারুদ পোড়া গন্ধ তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। তবুও শাহবাগের দিকে যেতে যেতে ওর চোখ সেই মানুষটাকেই খুঁজছিল। চকিতে যেটুকু দেখেছে তাতেই মনের আয়নায় দাগ কেটে গেছে সে-মুখ!
না, পায়নি আর। কোথাও দেখা পায়নি সেই মানুষটার। তবু ও খুঁজে, খুঁজে বেড়ায় প্রতিটি বৈশাখী মিছিলে, একুশের প্রভাত ফেরিতে, রমনা পার্কের এই বটমূলের বৈশাখী আবাহনে। কোনোদিন মেলেনি দেখা। আর আজ, আচমকাই যাওবা মানুষটা চোখের সামনে এসে মিললো দেখা দিল, বাহ! কী সুন্দর অন্ধ! ও চিনতে পারলো না। হায় রে কপাল! প্রাণের মানুষটাকে আঁকড়ে নিতে পারলো না বুকের মাঝখানে!
বাসটার খবর কি? চলে আসলো নাকি? আচ্ছা কী নাম বাসটার? আশ্চর্য! টিকেট কেনার সময় এসব কথা একবারো কেন মনে এলো না? শুদ্ধ চকিতে পকেট থেকে বের করে টিকেটটা দেখে নিল একবার। কোনো কোম্পানির নাম নেই। সাদামাটা একটা রিসিভের মতো কাগজ। জায়গার নাম আর টিকেট মূল্য লিখে রেখেছে সিল মেরে। সিট নাম্বারও নেই। কী সর্বনাশ! ও ঠগের পাল্লায় পড়লো নাতো? (চলবে) 

ছবিঃ লেখক