শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

সাতাশ
দ্রুত রাস্তা পার হয়ে ও সেই টিকেট বিক্রেতার সামনে দাঁড়ায়। টিকেট দেখাতে দেখাতে জানতে চায়, আমার সিট নাম্বার কতো?
সিট নাম্বার দিয়া কি করবেন? টিকেট বিক্রেতা শান্ত ভঙ্গিতে উলটো প্রশ্ন করলো।
কী করবো মানে! আমার সিট লাগবে না?
চিন্তা করবেন না। আপনাকে বসাইয়া দেব।
চিন্তা করবো না মানে! কী বলছেন? আপনে বসাবেন কেন? আমার সিট নাম্বারই তো আমাকে বসাবে সিটে।
আরে ভাই! এতো কথা বলতেছেন কেন? আপনারে তো বললামই সিটে বসাইয়া দেব।
আবারো বলেন বসাইয়া দেবো। এটা কি বাস? বাসের নাম কি?
বাসের নামের দরকার আছে আপনার? আপনে তেঁতুলিয়ায় যাইবেন। তেঁতুলিয়ায় পৌঁছাইতে পারলেই হইলো। জানেন না তো কী অবস্থা। তাই এমন তাফালিং করতেছেন।
তাফালিং শব্দটা গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল শুদ্ধর। অই মিয়া তাফালিং কই করলাম। সিট নাম্বার বাসের নাম এইসব জানতে চাওয়াটা তাফালিং? আপনার বলতে অসুবিধা কি?
শোনেন! ঈদের পরদিন যে টিকেট পাইছেন, এইটাই তো অনেক বেশি, বুঝতেছেন ব্যাপারটা! তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কি আপনে খাড়াইয়া যাইবেন নাকি? এইটা কি সম্ভব? আপনার বসার ব্যবস্থা আমি করবো। চিন্তা করার দরকার নাই।
টিকেট বিক্রেতার উলটো ঝাঁড়িতে শুদ্ধ ট্যাপসা হয়ে যায়। ওর আর কথা বলার রুচি হয় না। কপালে যে আজ কী আছে কে জানে! সিট নাম্বার নাই, কোন বাসে যাবে তাও নেই জানা। ও মনে মনে আতংকিত বোধ করে।
ওর চোখমুখের ভাষা দেখেই কিনা টিকেট বিক্রেতার বুঝি দয়া হয়। সে শান্তনা যোগায়। ভালো বাস। ফার্স্ট কেলাস বাস। বললাম তো, চিন্তা করার দরকার নাই। বসার ব্যবস্থা আমি করবো।
মানে? বসার ব্যবস্থা করতে হবে? আমার তো টিকেটই আছে।
হ হ। সেই জন্যই তো বসবেন। ওকে আশ্বস্ত করতে করতে টিকেট বিক্রেতা পথের পাশে দাঁড়ানো একজনের ইশারায় হন্তদন্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। আসেন আসেন। বাস মনে হয় চইলা আইছে।
টিকেট বিক্রেতাকে অনুসরণ করে হাঁটতে হাঁটতে শুদ্ধ জনতার বিপুল ভিড়ের দিকে তাকায়। যেতে যেতেই আবিষ্কার করে ও ছাড়া আর কেউ একা নয়। হয়তো একা কেউ থাকতেও পারে, আপাতত চোখে পড়ছে না। আত্মীয় হোক অনাত্মীয় হোক কেউ না কেউ কারো সঙ্গে আছেই। বিশাল দলের পরিবারও রয়েছে- নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু নানান-বয়সী। হঠাৎ নিজেকে ওর কেমন একা লাগে। একজন সঙ্গী যোগাড় করে নিলেই হতো যে কাউকে। নিজের নৈসঙ্গ্য বোধ ঝেড়ে ফেলতেই বুঝি ও আবার মানুষের দিকে মনোযোগী হয়। ওরা শেষ পর্যন্ত কীভাবে যাবে? আদৌ যেতে পারবে তো? বাস যেভাবে অনিয়মিত আসছে, ভরে ভরে আসছে-ওদের ঠাঁই কোথায়? কী কষ্ট যে এদেশের মানুষের। পিলপিল করে বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে না যাতায়াতের সুবিধা। ট্রেন ক্ষেত্রে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার। শুদ্ধ অনুভব করে। তখনই টিকেট বিক্রেতা তাড়া দিয়ে ওঠে, আসেন! আসেন ভাই! তাড়াতাড়ি!
মেইন সড়কে একটা বাস তখন অলরেডি থেমে গেছে। বাস থেকে নেমে হেলপার সেই টিকেট বিক্রেতার উদ্দেশে হাত নেড়ে নেড়ে অস্থির ভঙ্গিতে ডাকছে। কাছে এগোতে এগোতে বাসের নাম দেখে আবারো মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে শুদ্ধর। জুলেখা পরিবহন। এ নামের বাসে চড়া তো দূরের কথা, জীবনে কখনো নামও শুনেনি। টিকেট বিক্রেতা শুদ্ধকে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয় না। দ্রুত বেগে ও শুদ্ধকে টানতে টানতে বাসের ভেতরে উঠে যায়। গেটের মুখেই একেবারে সামনে ডান পাশে বসা দাঁড়িঅলা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা কন্ডাক্টর না সুপারভাইজার গোছের মাঝ বয়সী লোকটার উদ্দেশে বলে ওঠে, কই, আমার সিট কই?
লোকটা ত্বরিৎ বেগে নিজের সিটটা শুদ্ধকে ছেড়ে দিতে দিতে সরে দাঁড়ায়। শুদ্ধকে সেই সিটে বসিয়ে দিয়ে ওর ব্যাগটাকে ঠেলেঠুলে কোনোমতো সিটের সামনে দলামোচড়া করে রেখে দিয়ে শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে দু-হাতের পাঁচ আঙুল একসাথে উঁচু করে তার সমন্বয়ে মাথাটাকেও ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে যেন জানতে চায়, ঠিক আছে তো?
শুদ্ধর মুখে বোকা বোকা হাসি ফুটে ওঠে। এমন অদ্ভুত কিসিমের সিট ও যেমন জীবনেও দেখেনি, বাসের ভেতরে এমন অদ্ভুত অবস্থাও ওর চোখে আগে কখনো দৃশ্যমান হয়নি। দুইদিকের সিটের সারির মাঝখানে যেখানে চলাচলের পথ, যেখানে এতোদিন দেখেছে মানুষকে শুধু হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে, সেখানে আজ দেখলো একবারে সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত পুরো বাসটাতেই বসে আছে ‘শ‘‘শ মানুষ। একতিলও জায়গা খালি নেই কোথাও। টিকেট বিক্রেতা শুদ্ধকে বসেন বলে আশ্বস্ত করে দাঁড়িওয়ালা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা লোকটির সঙ্গে বেশ সঘন একটা হ্যান্ডশেক করে বাস থেকে নামতেই, বাসটা ছেড়ে দিল ড্রাইভার।
যাক! লোকটা তাহলে কথা রেখেছে। ঠিকই ওকে বসিয়ে দিয়েছে সিটে। যদিও সিটটা স্পেশাল নাকি অদ্ভুত ও ঠিক বুঝতে পারে না। শুধু একজন বসা যায়, তাও ঠেসেঠুসে। হেলদি কেউ হলে বসতে পারতো না। শুদ্ধ স্বস্তি বোধ করে। তবু তো বসা যাচ্ছে। অন্যরা তো গায়ের ওপর গা উঠিয়ে চিড়ে চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে বাসের মেঝেতে। ভাগ্যিস শীতের আঁচ পড়তে শুরু করেছে প্রকৃতিতে। গরমের সিজন হলে যে কী হতো! একটু দূরে দূরে অবশ্য ফ্যান চলছে। সেগুলো ছাদের সঙ্গে এমন লাগোয়া যে, হাওয়া বাসের মেঝ পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা সন্দেহ। সিটে থাকলে হয়তো একটু আধটু ভাগ পেলেও পাওয়া যেত! কারা ওরা মেঝেতে বসা? সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। চেহারায় দারিদ্রের ছাপ যতোটা না সারল্যের ছাপ ততো বেশি। ঘর্মাক্ত কালোমুখগুলো ভাঙা এবড়োথেবড়ো। ওদের বুঝি সিটের দরকার হয় না। সিটগুলোও যাকে বলে একেবারে ঠাসা। একটার গায়ে আরেকটা যেন ঠেলেঠুলে আছে। বাস চলার সঙ্গে সঙ্গে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। এ অবস্থায়ও যে ও, এদের পরে বাসে ওঠেও একটা সিট পেয়েছে বসার। সেটাই তো অনেক সৌভাগের ব্যাপার, মিরাকেলও।
শুদ্ধ নিজের ভেতর ডুবে যেতে চায়। তার আগে যেন সময়টাও জেনে নেওয়া জরিরি। নিজের অলক্ষ্যেই ও ঘড়ির দিকে তাকায়। রীতিমতো আঁতকে ওঠে। এগারোটা বেজে বারো মিনিট। সময় কীভাবে হারালো! টের পেল না কেন। বাড়ি থেকে তো বেরিয়েছে সেই কোন সাতসকালে। তখন কুয়াশায় ছেয়েছিল চারপাশ। এখন বেশ ঝকঝকে রোদ উঠেছে। ঠান্ডা কোমল হাওয়া আসছে। বাস বেশ গতি পেয়েছে। তুখোড় তালে ছুটছে উত্তরমুখো। বাইরের হাওয়া এসে চোখেমুখে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। যাক! বাসে যখন উঠে বসেছে, এ যাত্রায় তাহলে সত্যি সত্যি যাওয়া হচ্ছে তেঁতুলিয়া! কম দিন তো আর হলো না ও যেতে চাইছে সেই মহানন্দা পারে? কিছুতেই দুইয়ে দুইয়ে আর চার হচ্ছিল না। একটার পর একটা বাধা লেগেই ছিল। একটু জুত করে বসা যায় না? সিটটায় কি হেলানোর ব্যবস্থা আছে? নাকি এমনিই খাড়া বসে যেতে হবে পুরো পথ? ও সিটটা দেখতে গিয়ে যেমন আড়াআড়ি তাকাল পেছনের দিকে, অমনি দেখো চোখাচোখি হয়ে গেল অফিসের আজিম আহমেদের সঙ্গে।  (চলবে) 

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]