শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

আটাশ
আজিম সাহেবই তো? নাকি? ও ভালো করে তাকায়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আজিম সাহেব! নিশ্চিতভাবেই আজিম সাহেব! ঠিক ওর আড়াআড়ি পেছনের সিটেই বসে আছেন। চশমা-পরা হাসি ছড়ানো সেই গোল মুখ। অফিসের দুই বস কাম মালিকের সেক্রেটারি। বেশ ক্ষমতা রাখেন বলা যায়। উত্তরবঙ্গ সমিতির অলিখিত প্রেসিডেন্ট। হা হা, শুদ্ধ আপন মনেই হেসে ওঠলো। ছোট্ট একটা জায়গা! সেই অফিসের ভেতরেও গড়ে ওঠেছে অদৃশ্য কত রকমের বলয়। কুমিল্লা গ্রুপ, উত্তরবঙ্গ গ্রুপ, এই গ্রুপ সেই গ্রুপ। একেকজন গোপনে গোপনে অঞ্চলভিত্তিক জোট বেঁধে বসে থাকে। শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য। শুদ্ধ মনে মনে কামনা করে এই বিভাজন যেন শুধু ওপরের দিকে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে। মালিক পক্ষের একজন যে কুমিল্লার, আর একজনের বাড়ি উত্তরবঙ্গের রংপুর। নানাজনের রেফারেন্সে দুজন নিজেদের এলাকার লোকজন দিয়েই পুরো অফিস ভরিয়ে রেখেছে। প্রায় একশোজন এমপ্লয়ীর মধ্যে ফিফটি ফিফটি কুমিল্লা-উত্তরবঙ্গ ভার্সেস বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল।
ঠোঁট থেকে ধীরে ধীরে হাসি ছড়িয়ে পড়ছে আজিম সাহেবের সারা মুখে, তিনি জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠলেন, ‘আমিও দেখতেছি অনেকক্ষণ থেকে। একবার মনে হয় আমাদের শুদ্ধভাইই তো! আবার ভাবি- ধুর! কে না কে? তাই আর ডাকি নাই।’
মজা করার সুযোগটা শুদ্ধ ছাড়লো না, ‘নাকি নিজের বাড়িতে নিতে হবে বলে ইচ্ছে করেই ডাকেননি?
আরে চলেন না, কোনো অসুবিধা নাই। দুজন মিলে রান্না করে খাবো।
কেন, ভাবীকে নিচ্ছেন না সাথে?
ধুর! দেখেন না রাস্তাঘাটের অবস্থা! আপনার ভাবী বাচ্চাকাচ্চা সবাই ঢাকাতে।
শুদ্ধ আবার মেঝেতে বসা মানুষগুলোর দিকে তাকায়। শুকনো ঘর্মাক্ত মুখ। ঝিমানো স্তব্ধ মুখ। সবকিছু মেনে নেওয়া নতজানু মুখ। ও ভেতরে ভেতরে হঠাৎ খুব অবসাদ বোধ করে, কেন, নিজেও জানে না।
আজিম সাহেব সম্ভবত ভাবতেও পারেননি, শুদ্ধকে এভাবে ঈদের পরদিন পেয়ে যাবে উত্তরবঙ্গমুখী কোনো বাসে। বেশ অবাক গলা, আপনি যাচ্ছেন কোথায়?
বললাম না আপনার বাড়ি। তা না হলে এই বাসে উঠবো কেন? আপনার জন্যই তো উঠেছি।
তাও তো কথা!
দিনাজপুর, তাই না?
হ্যাঁ, দিনাজপুর। যাবেন অসুবিধা কী… আমি অবশ্য থাকবো না, পরশুই চলে আসবো… ঘরবাড়ি খালি পড়ে থাকে, তাই দেখতে যাচ্ছি।
ভালো। মাঝে মাঝে যাওয়া দরকার।
হ্যাঁ। ঘরবাড়িগুলো ঠিক করবো ভাবতেছি। রিটায়ার্টমেন্টেরও তো সময় এসে গেল। ঢাকা শহরেও ফ্ল্যাট,যাট কিছু কিনলাম না।
ঢাকা শহরে থাকবেন কেন? কি মধু আছে ঢাকাতে বলেন তো?
কিচ্ছু নাই ভাই, ঠিকই বলছেন। সব নকল ভেজাল। মানুষের নোংরামি। কিচ্ছু নাই।
বয়সের আসমান জমিন তফাৎ। আজিমউদ্দিনের প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই। মাথার চুল কাচাপাকা। ভারি লেন্সের চশমা পরতে হয়। শুদ্ধ কেবল বত্রিশ পেরিয়েছে। অফিসে নিজেকে গুটিয়ে রাখে বলে তেমন পাত্তা পায় না কারো কাছে, উলটো বেশ পলিটিক্সের শিকার। বিশেষ করে পাকিস্তানিটার যন্ত্রণায় কাজ করার পরিবেশটাই যেন দিন দিন ডিফিকাল্ট হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করে ওকে কিনা জব করতে হচ্ছে একজন পাকিস্তানির আন্ডারে! ব্যাপারটা যে কী যন্ত্রণার লজ্জার গ্লানিকর! সেটা শুদ্ধ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে! অ্যাড ফার্মের মতো এমন একটা মডার্ন ডিসেন্ট জায়গায় কীভাবে যে এ ভাইরাসটা ঢুকে পড়লো তার হিসাব ও কিছুতেই মেলাতে পারে না। আজিম সাহেবের সঙ্গেও এ-ব্যাপারটা তোলা যাবে না। তিনিও নাকি দক্ষিণপন্থী। কঠিন রকম। শুদ্ধ মনে মনে সতর্ক হয়। অফিসের লোকজন এসব নিয়ে ফিসফাস করে, বেশ জামাতপ্রীতি আছে মানুষটার। শুদ্ধ অবশ্য নিজেও টের পেয়েছে! কেননা আজিমউদ্দিন সাহেব মাঝে মধ্যে নিজেও লুকিয়ে রাখতে পারেন না তার সে-চরিত্র, নিজের অজান্তেই ভেতরের চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার সময়। যেদিন পাকিস্তানের খেলা থাকে, তিনি অফিসের কাজে মনই বসাতে পারেন না। সবার আগে বোর্ডরুমে ঢুকে টিভি অন করে বসে থাকেন।
শুদ্ধ অফিসে তাই অনেকটা এড়িয়েও চলেন এ-ভদ্রলোককে। এড়িয়ে চলার অবশ্য সুযোগও আছে। দুজন বসে অফিসের দু’প্রান্তে। আলাদা দুজায়গায়, যেখানে চোখাচোখি হওয়া দূরে থাক, দেখাদেখি পর্যন্ত হয় না। ক্যান্টিনেও দুজন আসে দু-মুহূর্তে। আজিম সাহেব যাকে বলে একেবারে ফার্স্ট সেশন। একটা বাজতে না বাজতেই হাজির হবেন ক্যান্টিনে। খেয়েদেয়ে জোহরের নামাজ আদায় করে তারপর আবার নিয়মমতো কাজে বসেন। শুদ্ধ ঠিক তার উল্টো। ওর লাঞ্চ করার কোনো সময়-অসময় নেই। ক্যান্টিনে যায় প্রায় শেষদিকে। আড়াইটা থেকে তিনটা। কখনো সখনো আরো পরে। তার আগে অবশ্য প্রায়ই কিছু না কিছু জম্পেশ নাস্তা খেয়ে নেয়। অফিসে তেমন দেখা হয় না, কথা হয় না। তবু দেখো অফিসের বাইরে আচমকা এভাবে ভিন্ন পরিবেশে মুখোমুখি হওয়ায় দুজনই যেন ছেলেমানুষের মতো আনন্দিত হয়ে উঠলো।
শুদ্ধ অবশ্য ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বোধ করছিল। ও যে তেঁতুলিয়া যাচ্ছে, এটা অফিসকে ঠিক জানাতে চাইছিল না। অফিসের কোনো কোনো লোকের কাছে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই ঠেকবে। নিশ্চিতভাবেই ঠেকবে অদ্ভুত। বিশেষ করে কিছু মেয়ে আছে, এক একটা আলগা ফুটানির বহর! সবাই প্রায় এলিট ফ্যামিলির, বিশেষ করে কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এমন গোত্রের। এরা গ্রাম বা মফস্বল থেকে ওঠে আসা কাউকে তেমন পাত্তা দিতে চায় না। দেখে চরম অবজ্ঞার ভঙ্গিতে। বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়েই বিচার করতে চায় সব। আর মেপে চলে ক্লাস। কার সঙ্গে মিশবে কার সঙ্গে মিশবে না- রীতিমতো ছক কষে নেয়। যদি দেখে কারোর চেহারায় তেল নেই, তেলের জৌলুস নেই, তাদের সঙ্গে কথা বলতেও একেকজনের ভারি নিতম্ব দোল খেয়ে ওঠে। সে তেল লেটেস্ট ব্র্যান্ডের গাড়িরই হোক আর ঝলমলে টাকারই হোক আর টলটলে চেহারারই হোক- তেল না থাকলে ও মেয়েদের কাছে আর কারোর পাত্তা নেই। যেন কোনো মানুষের পেছনে ছুটে না, ছুটে গাড়ির পেছনে টাকার পেছনে পুরুষালি দম্ভের পেছনে! অবশ্য উপরে উপরে ভালোমানুষি দেখানোর সব কায়দাই ওরা রপ্ত করে রেখেছে। এক একজন ভালো অভিনেত্রীও বটে!
থু! ঘৃণা লাগে শুদ্ধর! এক একটা রান্ডির কথা মনে পড়লেই বমি উগরে আসে। মনে হয় যেন নর্দমা থেকে ওঠে আসা এক একটা কীট, থিকথিক করছে সারা অফিসের পাগাড়ে! কিছু ছেলেও আছে অবশ্য এ-দলে। নিজেদের আলগা ফুটানিঅলা শ্রেণির বাইরের আর সবাইকে যারা তুচ্ছ করে দেখে। শুধু ওদের এই মানসিকতার জন্যই কেবল ওদেরকে সহ্য হয় না শুদ্ধর। সারাক্ষণই দেখো এর সমালোচনা, ওকে নিয়ে ব্যঙ্গ, তাকে নিয়ে টিটকারি! বিকৃত এক আনন্দে মজে থাকে ওরা। কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে একসঙ্গে দাঁত কেলিয়ে হাসে!

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]