শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

উনত্রিশ

আলগা ফুটানিওয়ালারা মনে করে, দামি কোনো রেস্তোরাঁয় দল বেঁধে খেলেই ট্রেন্ডি হওয়া যায়। আর বাংলাদেশে বেড়ানোর জায়গা শুধু কক্সবাজার। কক্সবাজার ছাড়া অন্য কোনো জায়গা নেই। কক্সবাজারকে ঘিরে ওদের মধ্যে রয়েছে পাতায়া-সিনড্রম, দীঘা-হাওয়া। কক্সবাজারকে পাতায়া বানাও আর ছুটে যাও ব্যাংকক, মুম্বাই বা গোয়া! বন্য উন্মাদনায় মাতো! আর কলকাতার প্রতিও কারো কারো আলাদা ফেসিনেশন রয়েছে। সে নাকি অন্য কোলকাতা। গাল ফুলিয়ে বলে ফুটানিওয়ালারা। সেই কোলকাতা নাকি সাধারণ মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। কী কোলকাতা রে শুনি? যেখানে ক্যাবারে ড্যান্স হয়, গার্লফ্রেন্ড বা বউ পাল্টিয়ে বুকের সাথে বুক মিশিয়ে নাচানাচি করা যায়? হুইস্কিতে বুদ হয়ে ভাবা যায়, দুনিয়াটা শুধু তোদেরই আর কারো নয়! তোরাই দুনিয়ার এ-ক্লাস মানুষ! আর সব ফইন্নির পুত! দামি স্কচ হুইস্কিতে মাতোয়াল আর মিনি স্কার্টে লাস্যময় কালকাতা নিয়েই তোদের যত্তোসব বড়াই আর তাফালিং! থুঃ!
এই যে তাফালিং এই শব্দটা কোথা থেকে ঢুকলো? চন্দ্রা? হ্যাঁ হ্যাঁ চন্দ্রা, চন্দ্রা থেকেই ঢুকেছে! টিকেট-বিক্রেতা লোকটি বকছিল।
যা হোক, মাঝে মধ্যে ওদের মুখ থেকেই এসব কথা ভেসে আসে। ওর সঙ্গে যে বলে, তা না। দূর থেকেই শোনে। ওরাই সুযোগ পেলে এর ওর ক্রিটিসাইজ করতে করতে মেতে ওঠে পৈচাশিক হাসিঠাট্টায়। কাউকেই প্রায় ছাড়ে না। চোখের আড়াল হলেই হলো রীতিমতো ধুয়ে দেয়। এতেই বোঝা যায় ওদের কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড কতোটা অন্তসারশূন্য, মেকি, পরস্পর-বিদ্বেষী। এক্যটা হলো শুধু লুটপাটের জায়গায়, ভোগবাদিতায়। এসো একসঙ্গে চান্স পেলেই টাকা মেরে দেই, মেয়েমানুষ নিয়ে ফূর্তি করি, কিংবা ক্লাবে গিয়ে বা কারো বাসায় বসে সিভাস রিগ্যাল বা ব্ল্যাক লেবেল বা কুইনস অফ কুইনস পেগ পেটে দিয়ে মধ্যবিত্তের পিণ্ডি চটকাই!
মাঝে মধ্যে খুব অদ্ভুত লাগে এসব ফুটানিওয়ালা কর্পোরেটদের আচার-আচরণ! ভেতরে এক আর বাইরে আরেক। বোঝা যাবে না কিছুতেই ওদের চরিত্র। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক মহিলা এক্সিকিউটিভ আসেন অফিসে। কী পর্দা! বোরকা ছাড়া চলেনই না। মুখ অবশ্য খোলাই থাকে। আর যেদিন বোরকা না পরেন, সেদিন পরেন সেমি-বোরকা আর মাথায় রাখেন স্কার্ফ। সেই তিনিই যখন মুম্বাই বা ব্যাংকক যান টাইট জিনস প্যান্ট আর শর্ট শার্ট পরে নাকি রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। বেশ কয়েকজনই নাাকি এটা দেখেছে। ওরাই বলে এদেশের মেয়েরা ব্যাংকক গেলে পাশ্চাত্য নারীদের সুরে তাল মেলাতে গিয়ে মিনি স্কার্ট পরেও পাতায়ার সমুদ্রের নীল পানি গরম করে ফেলে!
পাবলিক-ঠকানো পয়সায় একেকজনের সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা ব্যাংকক পাতায়া বেড়িয়ে এসে কী যে ঠাঁটবাট আদিখ্যাতা আর গর্ব! গর্ব তো নয়, মিথ্যে অহংকার আর দম্ভের ডেপোমিপনা। এই আলগা ফুটানিওয়ালারা যখন শুনবে, শুদ্ধ গিয়েছিল তেঁতুলিয়া, তখন শুরু করে দেবে গবেষণাÑতেঁতুলিয়ায় কী আছে দেখার, কী পাওয়া যায় এনজয়ের! ওদের কাছে মনে হবে নিছকই খাপছাড়া গোছের একটা কিছু। শুদ্ধ কী করে বোঝাবে যে, ও আসলে বেড়াতে যাচ্ছে না। ও যাচ্ছে… ও কেন যাচ্ছে? কী কারণে? নিজের কাছেই নিজে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠলো।
সত্যিই তো! কেন এই বেরিয়ে পড়া? শুধুই কি নদীর ডাকে… নাকি নিসর্গের? মানুষ দেখার ইচ্ছেও তো আছে মনের মাঝে সুপ্ত! হ্যাঁ, মানুষকে ভালো লাগে ওর…যদি মেলে মনের মতো সেই মানুষ… যে এক মুক্ত আকাশকে মনের ভেতর লালন করে বেড়ায় আর নদীর সুরে সুরে বয়ে চলে! সে মানুষের দেখা তো মিলেই আছে! কি মিলেনি? কিন্তু আফরিনের যদি বিয়ে হয়ে যায়? বিয়ে তো হবেই গাধা, তোমার জন্য কি সারা জনম কেউ বসে থাকবে? কতোবার গেলে, প্রপোজই তো করতে পারলা না! আমার যে কী হয়, আমি পারি না, সাহস নেই, মেয়েদের সামনে গেলে যে কেন সব সাহস হারিয়ে ফেলি!
আজিমউদ্দিন আহমেদের ডাকে ধ্যান ভাঙে শুদ্ধর। থাকেন। খাওয়ার যখন ব্রেক দেবে, তখন কথা বলবো নে। হ্যাঁ, শুদ্ধও অনুভব করছিল, মানুষকে ডিঙিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে ওরও ভারী অস্বস্তি হচ্ছিল। শোভনীয় লাগছিল না ব্যাপারটিকে। তবু ও বলেছে কথা। না বললে আজিম আহমেদ কী মনে করে সেটা ভেবে! এখন আজিম ভাইয়ের দিক থেকেই কথা বিরতিদানের ইঙ্গিতটা ওঠে আসায় ভেতরে ভেতরে স্বস্তিই বোধ করলো শুদ্ধ। দুজনই নিজেদের জগতে যেন মগ্ন হতে চাইলো। শুদ্ধর অবশ্য কথা বলতেই ইচ্ছে করছিল। গলা রীতিমতো চুলকাচ্ছিলই বলা যায়। ওই যে চন্দ্রায় সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল, থেমে গেল, পাথরমূর্তির মতো নিথর হয়ে গেল, আসলে ঘটনাটা কি? কী হয়েছিল তখন? আজিমউদ্দিন সাহেব কি সে বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন? তিনি তখন কোথায় ছিলেন? কী অবস্থায় ছিলেন? নাকি পুরো ঘটনাটাই ওর মনের একটা ধাঁধা! না না, ধাঁধা হবে কেন? যা ঘটেছে তা তো দিবালোকের মতোই সত্যি! এই আলোর মতোই স্পষ্ট!
ধুর! সত্যি হবে কেন? সত্যি যদি হয়েও থাকে তার তো একটা ব্যাখ্যা থাকা দরকার। এসব ঘটনার ব্যাখ্যা কি? আজিমউদ্দিন আহমেদ কি কিছু বলতে পারবেন? আসলে চেনাজানা কাউকে না পেয়ে ও এ-বিষয়ে মন খুলে কিছু বলতেও পারছিল না।
বাস ছুটছিল শোঁ শোঁ শব্দ করে খুব দ্রুত। কালিয়াকৈর স্টেশন ছাড়ানোর পথে হঠাৎ ড্রাইভারের একটা তীর্যক মন্তব্য শুদ্ধর গায়ে তীব্রভাবে লাগে। একটু শ্লেষের সুরেই যেন ড্রাইভার শুদ্ধকে লক্ষ্য করে বাসের দরোজার সামনে দাঁড়ানো হেলপারের উদ্দেশে ক্যাঁতক্যাতানো হাসি ছড়িয়ে বললো, দালাল গো কাছে যে আজ কত মাইনষে ধরা খাইবো! এই যে একজন খাইছে! সাড়ে তিনশো… হে হে হে হে!
ড্রাইভার শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে অন্যদেরকে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাইছে, এই মানুষটি দালালকে শুধু শুধু সাড়ে তিনশো টাকা দিয়ে চরমভাবে ঠকেছে। ওকে দেখে নিন, এ মানুষটা বোকা, ভীষণ বোকা।
শুদ্ধ ঠিক কী বলবে বুঝতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে ও সংকোচিত হয়, বিশেষ করে অফিসের আজিম ভাই সঙ্গে থাকায়। কি ভাববেন উনি! শুদ্ধ একটা ভ্যালমা! বোকা! ভীষণ ঠকা ঠকেছে। মজার ব্যাপার হলো, শুদ্ধ নিজেই জানে না ও কত টাকা ঠকেছে। ভাড়ার পরিমাণটা ওর সঠিক খেয়াল নেই। এই এক সমস্যা ওর। মনে থাকে না, কিছুই মনে থাকে না। সম্ভবত দুশো কি আড়াইশ টাকা। ও ড্রাইভারের শ্লেষটুকু নিতে পারলো না। আপন মনে বিড় বিড় করতে লাগলো, ড্রাইভার শুনছে কি শুনছে না তোয়াক্কা না করেই, আমি কি করবো? তোমরাই তো সিন্ডিকেট বানিয়ে বসে আছো, দালালে দালালে সয়লাব করে দিয়েছো স্টেশনের পর স্টেশন! মানুষকে জিম্মি বানিয়ে রেখেছো।
আজিম ভাই বোধ হয় শুনেনি। কারোর মন্তব্যই। না ড্রাইভারের না শুদ্ধর। শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে শুধু অর্বাচিন হাসে। যেন তারও কত কথা বলবার আছে। বলতে পারছে না বলে অবরুদ্ধ মানচিত্রের মতো মুখটাকে ভুগোল বানিয়ে রেখেছে। শুদ্ধর অবশ্য ভিন্ন ধাত।

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]