শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

ত্রিশ

আজিমউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা না হওয়াটাই যেন ভালো ছিলো। বাসে বা ট্রেনে উঠলে ওর যেমন জানালার কাছে বসতেই হবে, বসে তেমনি চুপচাপ নিরিবিলি চোখও রাখতে হবে বাইরে। হারাতে হবে নিসর্গে। খোলা মাঠ প্রান্তর যেন ওকে ছুমন্তর দৌড়াতে দৌড়াতে নিয়ে যায় কোন্ অচেনা জগতে! মাঠের পর মাঠ ছাড়িয়ে অনেক দূরের ধুসর দিগন্তের গ্রামগুলোর দিকে তাকিয়ে ওর মনে পড়ে অব্যাখ্যাত ব্যবিলন, প্রাচীন এশীরীয়, জীবনানন্দীয় চিত্রপট। এবং নদীও… নদীও ভীষণ ভালো লাগে। অনেকদূর অবধি ছুটে যাওয়া নদী… দূর, রহস্যময়ী নদী দূর থেকে শুধু ওকে ডাকে। ডাকতেই থাকে। ফুট! মিস্টার আজিমউদ্দিন ফুট! তফাৎ যাও। তোমাকে আমি মগজের কোষে এখন কিছুতেই রাখতে চাচ্ছি না। তুমি মানে কর্পোরেটের তল্পিবাহক! টিভি মনিটরিং! পাসপোর্ট! পাকিস্তানিটার গো ধরা! অসভ্য মেয়েগুলোর ভারী নিতম্বের খাঁজ! যাও ভাগো। যাও! আমাকে বিশুদ্ধ হাওয়ায় শ্বাস ফেলতে দাও! মেজাজ এতো খিঁচিয়ে উঠছে কেন? বোধহয় ওই ড্রাইভার ব্যাটারই কাণ্ড! ওর কথাগুলো সূচালো হয়ে ভেতরে ঢুকেছে। মস্তিষ্কে খোচাচ্ছে। আসলে বোকা বললে কেউ নিতে পারে না। বিশেষ করে যারা সরল হয়, তারা সরলতার অর্থের বিকৃতিকে একদমই সহ্য করতে পারে না। ব্যাটা ড্রাইভারকে ধরে ইচ্ছেমতো যদি প্যাদানো যেত!
হঠাৎ কেমন একটা অস্থিরতায় পেয়ে বসলো শুদ্ধকে। তোমরাই তো সিন্ডিকেট বানিয়ে বসে আছো। লুটেপুটে খেতে। আর কারটা খাও? যারা নিরীহ, সাধারণ, মধ্যবিত্ত! কামাতে জানে না। তোমরা তো তাদের টাকাই লুন্ঠন করছো রোজ রোজ। ঈদ আসলেই বকশিসের নামে শুরু করো চাঁদাবাজি! এখন যে বড় বড় কথা? সাড়ে তিনশো টাকা থেকে বুঝি ভাগ পাওনি? ভাগ পাওয়ার জন্যই ব্যঙ্গ করেছো? আমার কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করে আবার আমারই কাটা গায়ে নুনের ছিটা! আচ্ছামতো শালাকে যদি দু’কথা শুনিয়ে দেওয়া যেতো!
শুদ্ধ নিজেকে সামলায়। সামলানোর চেষ্টা করে। প্রচণ্ড স্প্রিডে হাইওয়েতে গাড়ি চালাচ্ছে লোকটা, উত্তেজিত করে লাভ কি? তাতে বরং ক্ষতির আশংকাই বেশি। ওর সঙ্গে দেখা গেল তর্ক করতে করতে বাস ফেলে দিয়েছে রাস্তার পাশের কোনো খাদে বা রেলিং ভেঙে কোনো নদীতে। ওদেরকে কোনো বিশ্বাস নেই। মানুষের জীবনকে ওরা কিছুই মনে করে না। ড্রাইভার বলতে লোকটাকে ট্রিপিক্যাল ড্রাইভারের মতোই লাগছে। সে-রকমই বেশবাস। একটা সর্দারি লুঙি পরে রয়েছে। গায়ের শার্টটা অবশ্য দামি। লিডার গোছের একটা ভাব আছে। ভারি গোঁফ, বেশ ভারি সঘন মোটা গোঁফ কালো কুচকুচে, চোখেমুখে ছড়িয়ে আছে একটা বদমায়েশিপনা। মাথার কালো একদম প্লেন, যেন চিরুণির আদরের যত্নে থাকা। মাঝে মধ্যেই কেমন ক্যাঁতক্যাতানো হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে কথায় কথায়। হাসির সময় চোখ দুটো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে চোখের ওপরনিচের মাংশপেশীতে।
হ্যাঁ, লোকটার হাসি দেখে ঠিক এই শব্দটাই মনে এলো শুদ্ধর। ক্যাঁতক্যাঁতানো। যা দেখলে যে কোনো মানুষের গায়েই জ্বালা ধরে যাবে। যে কোনো মানুষই এই হাসির বিরুদ্ধে মিছিল পর্যন্ত করতে চাইবে! শিশুরা পর্যন্ত সবাই দলবেঁধে নেমে আসবে এই হাসিকে অগ্রাহ্য করতে! তাহলে হাসির মতো জিনিসকেও কোনো কোনো লোক মুরগির বিষ্ঠা বানিয়ে ফেলতে পারে! এ এক নতুন অভিজ্ঞতা বটে।
আর ও লক্ষ্য করছিল, ওপরের কাঁচ দিয়ে মাঝে মধ্যেই আজিম ভাইয়ের সামনের সিটে বসা, ডানসারির একেবারে সামনের সিট যেটা, যেখানে দু-দুটো জোয়ান মেয়ে বসে রয়েছে, ড্রাইভার ওদেরকে আড়চোখে দেখে নিচ্ছে। হ্যাঁ, ভালো করে নজরদারি করতে করতেই ধরা পড়ে শুদ্ধর চোখে। ড্রাইভ করতে করতেই যেন রুটিন ওয়ার্কের মতো আড়চোখে মেয়েদুটোর শরীর লেহন করছে ড্রাইভার। হ্যাঁ, লেহনই তো! সাপের মতো জিভ বের করে ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নেওয়াটাকে কী বলবে!
সে কি মেয়েদুটোর কোনো একজনের সাথে আই কন্ট্যাক্ট-এর চেষ্টা করছে? নাকি দুজনের সঙ্গেই! ট্রিপিক্যাল ড্রাইভারের মতো মনে হলেও লোকটির চেহারায় আভিজাত্যের সুক্ষ্ণ একটা ছাপও রয়েছে। বিশেষ করে চুলের জন্য বোধহয় এটা মনে হচ্ছে। চুল আর গোঁপের জন্য। বেশ ঘন চুল। চওড়া কপালের মাঝখানটাকে ঢেকে রেখেছে। এ বয়সে সাধারণত কপালেব্যাপী এতো চুল থাকে না। এ লোকটির রয়েছে! কত বয়স হবে জুলেখার বাপের? পাঁচপঞ্চাশ ষাট? জুলেখার বাপ? হ্যাঁ, জুলেখা পরিবহন যেহেতু চালাচ্ছে- জুলেখার বাপই তো হবে! ওর হাব ভাব আচার-আচরণ দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। ফাঁকতালে আজ ঈদের ভিড়ের সুযোগে দু’পয়সা কামিয়ে নেওয়ার জন্য নিজেই হয়তো নেমে এসেছে পথে? কে জানে?
কিছুতেই গাত্রদাহ কমে না শুদ্ধর। ঈদের আগে বাসের টিকেট কাটতে গিয়ে কি কম হেনস্থার শিকার হয়েছিল? অফিস থেকে এক দুপুরবেলা লাঞ্চ আওয়ারে ছুটে গিয়েছিল শ্যামলী। গিয়ে দেখে কত ল্যাঠা! একে তো সব বাস তেঁতুলিয়া যায় না; যারা পঞ্চগড় যায়, শ্যামলী থেকে কল্যাণপুর খুঁড়ে খুঁড়ে ওদের সব কাউন্টারে খুঁজেছে টিকেট; এসএ পরিবহন থেকে কেয়া, শ্যামলী, হানিফ এন্টারপ্রাইজ! কেউই ঈদের পরদিনের টিকেট দিতে রাজি হলো না। রাজি তো হলোই না, উলটো ঈদের আগে কিছুতেই ঈদের পরের সার্ভিস নিয়ে কথা বলতেও একেকজনের কী অরুচি। শুদ্ধ হাত জোড় করলো, মাথা কুটে মরলো- কারো হৃদয়ে সামান্য করুণার সঞ্চার পর্যন্ত হলো না। ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফিরতে উদগ্রীব মানুষকে নিয়ে এক একজন যেন জোতদার, ব্যবসার ফাঁদ খুলে বসেছে। দুশো টাকার টিকেট বিক্রি হচ্ছে তিনশো সাড়ে তিনশো টাকায়, তিনশো টাকার টিকেট চারশো পাঁচশো টাকায়। যার কাছ থেকে যেমন পারা যায়, ডাকাতের মত কেঁচে নিচ্ছে। দেখার কেউ নেই। প্রতিকার করবে কে? যোগাযোগ মন্ত্রী একজন আছেন গর্দান মোটা ব্যারিস্টার হুদা, টিভি পর্দায় জানেন শুধু বাগাড়ম্বর করতে। বেশি দামে যাতে কেউ টিকেট বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য উনি সরকার বাহাদুর স্টেশনে স্টেশনে কাউন্টারে কাউন্টারে পুলিশ মোতায়েন করিয়েছেন। তাতে, ফল হয়েছে কি? উলটো। টিকেটের মূল্য বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। পুলিশের বখরার টাকাটা তো উশুল করতে হবে জনগণের পকেট থেকেই, নাকি? এখন যেন জনগণকে অপমান করার একটা শক্ত ভিত পেয়েছে বাসওয়ালারা। পুলিশের সামনেই হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারের লোকটা শুদ্ধকে অপমান করে বসল, ধুত মিয়া! সরেন তো! প্যাঁচাল পাইরেন না। ঈদের পরের টিকিট লইয়া অহনই মাতছে।
শুদ্ধর মেজাজ এমন খারাপ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল কাউন্টার থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে লোকটার মুখে ঘুষি বাগায়। পারেনি, পুলিশের দিকে তাকিয়ে পারেনি। আচ্ছা পুলিশ না থাকলে কি পারতো? শুদ্ধ এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না, ওর পৌরুষে লাগে। ও নিসর্গের দিকে তাকায়। বরঞ্চ তুমি নিসর্গের মাঝ থেকেই শুষে নাও তোমার জীবনীশক্তি! হারিয়ে যাও সবুজে! অব্যাহত সবুজে সাঁতার কাটো, নিঃশ্বাস নাও! দেখো, ধীরে ধীরে মন তোমার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

ছবিঃ লেখক