শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

একত্রিশ.
জুলেখা পরিবহন এখন ঝড়োগতিতে ছুটছে বটে, কিন্তু মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ দেরি করেছে। শুধু মির্জাপুর কেন, যে স্টেশন পাচ্ছে সেখানেই থামাচ্ছে। যেন প্যাসেঞ্জার বাড়ি-বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসবে! যাত্রীদের মুখেও কুলুপ আঁটা। কেউ কিছুই বলছে না। যে-যার নিজের ঘুম, ভাবনাবিলাসে ডোবা। এই এক অদ্ভুত ব্যাপার। যা কিছুই ঘটুক, যত অন্যায় কিংবা অবিচার আর বেলেল্লাপনা সবাই চুপচাপ সবকিছু মেনে নেয়। দেখেও না-দেখার ভানে চোখ পিটপিটায়। সোচ্চার হয় না, প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কথাও বলতে চায় না এ-বিষয়ে! এটাই যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে! সমীচিন ভদ্রতা সহবত। ইচ্ছেমতো লুটেপুটে খাও। একে মারো ওকে তক্তা বানাও। আমার কি! আমি কে বলার কে দেখার? বাসটা মির্জাপুর ছাড়াতেই হঠাৎ ড্রাইভার ক্যাসেটে গান ছেড়ে দিল! আরে লা জবাব! একেবারে এরশাদ শিকদার!
আমি তো মরে যাবো
আমি তো মরেই যাবো
চলে যাবো
রেখে যাবো সবই
আছোস নি কেউ সঙ্গের সাথী
সঙ্গে নি কেউ যাবি
আমি মরে যাবো!!
ব্যাটা, তুই তো মরেই গেছিস। মরে একবারে ভূত হয়ে গেছিস। একজনও কেউ সঙ্গীসাথী পাসনি মরণকালে, হ্যাঁ, এই তো গত বছর ১০ মে খুলনার কারাগারে মধ্যরাতে ফাঁসিতে ঝোলার আগে সবচেয়ে ছোট স্ত্রী শোভাকে আক্ষেপ করে বলেছিলি, ‘শত শত কোটি টাকার সম্পদ রেখে গেলাম। আমার নামে একটা গরু কোরবানি দিতে পারলা না? তাইলে তো আমি বাঁইচা যাইতাম। আমার এই দুঃসময়ে তোমরা কেউ পাশে রইলা না।’
আর দেখো দেখো, কী পাগলামি কা-! গানটা হচ্ছে আর ড্রাইভার ব্যাটা কেমন মাথা দোলাচ্ছে। যেন গানটার আত্মার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। মাঝে মধ্যে পেটটাকে সামনের দিকে ধাক্কা মেরে শরীরটাকেও চাইছে উঁচিয়ে ধরতে। সে যদি এভাবে বাস চালাতে চালাতে নাচার চেষ্টা করে যায় অব্যাহত, বাসটাও তো এক সময় এরকমই বেঢপ-ভঙ্গিতে নাচতে চাইবে, তখন? তখন কী হবে?
মরার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যাবে কান্নাকাটির ভিড়
সবাই মোরে মাটি দিতে হইবে অস্থির।
আমায় দেবে মাটি
আহা! কী যে প্রিয় ছিল এরশাদ সিকদারের কাছে এই গান। বড় বেশি প্রিয়। এতোই প্রিয় যে তিনি প্রতিটি খুনের পর খাঁটি দুধ দিয়ে গোসল করতেন। গোসল করে অতি পবিত্র হয়ে ওঠতেন। খুনের সব দাগ মুছে আয়োজন করতেন জলসার। সেই জলসার অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই গান। এই গান তিনি নিজে গাইতেন নিজের মুখে-
আমায় দেবে মাটি ভুল ক্রটি চেয়ে নেবে ক্ষমা
কেউবা এসে হিসাব করবে কোন ব্যাংকে কি জমা?
আমি মরে যাবো
বলা হয় যে এরশাদ শিকদার কমপক্ষে ষাটটি খুন করেছেন। এই ষাটটি খুনের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার খাঁটি দুধ-গোসল আর জড়িয়ে আছে এই গান। গানের কথন সত্য। সত্য এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। অথচ এই চিরসত্য গানটিকেই না কীভাবে জড়িয়ে ফেলা হলো ভয়াল ভয়াবহ বীভৎসতার সঙ্গে। একমাত্র ফিল্মেই যা সম্ভব- তাও আবার দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বা ছটকু আহমেদ মার্কা চিত্রনাট্যকারের ফিল্মে! ক্ল্যাসিক ঘরানার কোনো চিত্রনাট্যকারের পক্ষে বোধহয় এরকম দৃশ্যপট রচনা করা সম্ভব হবে না, এ ধরনের নারকীয়তার সঙ্গে এমন ধারার সঙ্গীতের সম্মিলন ঘটানোর! কিন্তু এরশাদ সিকদার কী অনায়াসেই না এই গানকে পরিণত করেছিলেন তার খুনোখুনির জাতীয় সঙ্গীতে! তাকে শক্তি যুগিয়েছিল এ দেশের রাজনীতি, প্রেরণা যুগিয়েছিল এ দেশের সমাজ। হ্যাঁ, রাষ্ট্রের ক্ষমতা যখন দৃর্বৃত্তের হাতে চলে যায়, রাষ্টের অধিকার যখন কেড়ে নেয় ডাকাত- সেও তার ক্ষমতাকে সুসংহত করতে রাষ্ট্রের সব ডাকাতকেই আশ্রয়প্রশ্রয় দেয়, তুলে দেয় অঢেল ক্ষমতা আর মারণাস্ত্র! এরশাদ সিকদারের হাতের মুঠোয় ছিল জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ভাবতেও অবাক লাগে ঝালকাঠিতে জন্ম নেওয়া একজন হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ কীভাবে কীভাবে হয়ে ওঠেছিলেন খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ড জগতের ত্রাস! ১৯৬৬ সালে খুলনা এসে রেলস্টেশনের কুলির সহযোগী হিসেবে শুরু হয় দুর্জনযাত্রা! অচিরেই জড়িয়ে পড়েন রেললাইনের পাত-চুরি কুকর্ম সঙ্গে। এই চোরদের নিয়েই ক-দিনের মধ্যে গড়ে ফেললেন একটি দল। এলাকায় পরিচিত হয়ে ওঠলেন রাঙ্গাচোরা নামে। রাঙ্গাচোরা ১৯৭৬-৭৭ সালে গঠন করলেন রামদাবাহিনী। এবার আর রেলস্টেশন আর ঘাট এলাকার চুরিডাকাতি কে ঠেকায়? বেড়ে গেল সন্ত্রাসী ঘটনাও। নিজের শক্তিকে সুসংহত করতে ১৯৮২ সালে রাঙ্গাচোরা রামদাবাহিনী নিয়ে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে! ৪ এবং ৫ নম্বর ঘাট দখল করে হয়ে ওঠেন ঘাট এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক! আর তাকাতে হয়নি পেছন ফিরে। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন তৎকালীন ৮ নম্বর যা আজকের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর এরশাদ শিকদার যোগ দেন বিএনপিতে। ১৯৯৭ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে ঘাটি গাড়েন আওয়ামী লীগে। অবশ্য আওয়ামী লীগে থিতু হতে পারেননি কিছুতেই। প্রবল সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত হন এবং ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে তাকে গ্রেফতার করা হয়, তখনো তিনি ছিলেন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার।
এরশাদ শিকদারের ছিল দোর্দ- ক্ষমতা। ছিল স্তাবকের দল। তাদের বংশধারা যে এখনো আছে- তার প্রমাণ যেন এ-বাস ড্রাইভার। গানের আত্মার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম হয়ে আছে, কীভাবে একদম বিলীন গানের সুরের সঙ্গে। মাথা দুলিয়ে পেট হেলিয়ে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতেই যেন কন্ঠও মিলিয়ে চলেছেন-
আমি তো মরে যাবো
চলে যাবো
রেখে যাবো সবই
আছস নি কেউ সঙ্গের সাথী
সঙ্গে নি কেউ যাবি
আমি মরে যাবো।
হঠাৎ এই গান ছাপিছের, বাইরের দিক থেকে যেন ক্যাক ক্যাক একটা শব্দ এসে আছড়ে পড়লো বাসের ভেতর। ড্রাইভার গানের সাউন্ড বেশ খানিকটা কমিয়ে হেলপারের উদ্দেশে জানতে চাইলো, কি হইলো রে গ্যাদা?
গ্যাদা অর্থাৎ সে বিশ বাইশের কালো কুৎসিত চেহারার হেলপার দরোজাটা একটু খুলে, মাথাটা বেশ অনেকটাই বের করে দিয়ে, পেছনমুখী তাকিয়ে ভালোমতো দেখেনিয়ে উত্তর দিল, চাক্কার নিচে কুত্তা পড়ছিল ওস্তাদ!
অ্যাঁ, কুত্তা? ক্যাঁতকেতানো হাসি ফুটে ওঠে ড্রাইভারের মুখজুড়ে। তারপর আবারো জানতে চায়, কী অবস্থা!
রাস্তার লগে মিশ্যা গেছে গা! নাড়িভুড়ি বাইর অইয়া গেছে।
হা হা হা। প্রবল উল্লাসে হেসে উঠলো ড্রাইভার। এতো প্রমত্তকার যে-উল্লাস, হাসির উল্লম্ফনে তার দুচোখ ওপর এবং নিচের মাংসপেশীতে ঢাকা পড়ে গেল। সে হাসতে হাসতে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়েই সিট থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর আবারো বসে জোড় হাতে ধরের ফেললো স্টিয়ারিং! আর তখন দেখো হাসির তোড়ও শুরু করেছে কমতে, পরিণত হয়েছে তা আবারো ক্যাতকেতানো রূপে, সে-স্টিয়ারিংটাকে সম্পূর্ণ নিজের অধিকারে এনে আবারো জিজ্ঞেস করলো,
কী অবস্থা হইছে, কইলি?
ওস্তাদ নাড়িভুড়ি এক্কেবারে বাইর অইয়া গেছে গা!
আবারো ড্রাইভারের উন্মত্ত হাসির উচ্ছসিত প্রস্রবণ! হাসতে হাসতে তার চোখ মাংসপেশীতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সে সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রবল উত্তেজনায়, স্টিয়ারিং হাত থেকে সরে গেছে তার। দেখে বুক কেঁপে ওঠলো শুদ্ধর। ও কার গাড়িতে চড়েছে। জুলেখা পরিবহনটা আসলে কার? ড্রাইভিং সিটে বসে আছে এ কোন উন্মাদ! এখনি বুঝি বাসটা বিপুল গতির বাসটা ছিটকে পড়বে রাস্তার বাইরে! প্রচ- গতিতে বিদ্যুতের খাম্বাটাকে দুমড়ে দিয়ে জ্বলে উঠবে অগ্নিলাভা ছড়িয়ে! ড্রাইভারের হাসির তোড় ধীরে ধীরে আবার কমতে শুরু করেছে। তা আস্তে আস্তে পরিণত হচ্ছে ক্যাঁতকেতানো রূপে। সে সিটে থিতু হচ্ছে। স্টিয়ারিংটা আবারো শক্ত হাতে নিজের অধিকারে নিয়ে নিয়েছে। তারপর ক্যাঁতকেতানো হাসি সহযোগেই হেলপারের দিকে তাকিয়ে গানের সাউন্ড বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মরে যাবো রেখো যাবো দুনিয়ার সম্পদ
সেই সম্পত্তি ডেকে আনবে আপদ আর বিপদ
সম্পদ ভাগের জন্য মনমালিন্যর হবে সূত্রপাত
একজন করবে আরেকজনকে আঘাত অপবাদ
আমি তো মরে যাবো।
এরশাদ সিকদারের খুনের নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল। ছিল স্ব-উদ্ভাবিত প্রক্রিয়া। যাকেই তিনি টার্গেট করতেন, সে হোক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কী স্ত্রীর প্রেমিক- ডেকে নিয়ে আসতেন ঘাট এলাকার নিজস্ব বরফকলে! আর যে একবার ঢুকতো সেই স্বল্প আলোছায়ার ভূতুড়ে পরিবেশে, সে আর কখনো প্রাণ নিয়ে বের হয়ে আসতে পারতো না সেখান থেকে। তার হাত-পা বেঁধে ফেলা হতো। পা চেপে ধরে রাখতেন স্বয়ং এরশাদ সিকদার। আরেকজন বড় হাতুড়ি দিয়ে পায়ের ওপর পিটিয়ে যেত সমানে। এভাবে পেটাতে পেটাতে থেতলে দেওয়া হতো পা, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত পায়ের হাড়- মানুষরূপ থেকে ধীরে ধীরে দানবে পরিণত হতেন এরশাদ সিকদার, মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর মানুষটার গলায় পেঁচিয়ে ধরতেন রশি, তারপর ধীরে সুস্থে টেনে ধরতেন সে লতানো-সাপ! ভিকটিমের নড়াচড়া অবশেষে বন্ধ হয়ে আসতো, নাক-মুখ-চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তো রক্ত, জিভও আসতো বেরিয়ে- দানবটা তখন বুকের ওপর হাঁটতো, লাফাতো, পাঁজর ভাঙার শব্দ শুনতো! তারপর?
তারপর বড় এক বালতি খাঁটি দুধ দিয়ে গোসল, গোসলের পর জলসা। সেই জলসায় বেজে ওঠতো তার স্বকন্ঠে গান-
আমি তো মরে যাবো
আমি তো মরেই যাবো
চলে যাবো
রেখে যাবো সবই
আছোস নি কেউ সঙ্গের সাথী
সঙ্গে নি কেউ যাবি
আমি মরে যাবো!!

ছবিঃ আনসার উদ্দিন খান পাঠান