শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

বত্রিশ

কুকুরটা বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে মরার পর থেকেই ড্রাইভারকে খুব শান্ত লাগছে। স্টিয়ারিং ছেড়েছুড়ে সেই বিপজ্জনক ভঙ্গির নাচও গিয়েছে থেমে। আর এরশাদ সিকদারের সেই গানের বদলে কখন থেকে বেজে চলেছে সুয়াচান পাখি!
আমার সুয়াচান পাখি
আমি ডাকতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি।।
তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি (রে বন্ধু)
ভেতরে ভেতরে স্বস্তি বোধ করলো শুদ্ধ। আর এই স্বস্তিই ওর চোখে এনে দিল ক্লান্তি আর অবসাদের ঘুম। বাসে উঠলে এই এক দুর্মতি! বিশেষ করে দূর-জার্নিতে, একবার ঘুমের আলতো ঢেউয়ের ফেনায় ডুবে যাবে চেতনার বেলাভূমি তো আরেকবার উঠবে জেগে! ঘুম আর জাগরণের অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকবে। অবশেষে আজো ঘুম প্রবেশ করলো সেই কাল-সমুদ্রে। দশ মিনিট যদি জেগে থাকে শুদ্ধ, বিশ মিনিট হয়তো নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে যায়। আবার হয়তো আধাঘণ্টা জেগে থাকলো তো, আবার কতক্ষণ ঘুমালো তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তবে যখন জাগে, জেগে ওঠার সাথে সাথেই চোখ চলে যায় বাইরে- নিসর্গের দিকে। বর্ষা বিদায় নিয়েছে কবেই, শীত আসি আসি করছে। আসি আসি করছে কি, শীত তো এসেই গেল! তবে মাঠে আর ক্ষেতে এখনো তার সদম্ভ প্রকাশ ঘটেনি। সর্ষে ফুলের বাগান ওঠেনি ফুটে। গাছগুলো মোটামুটি ঝাকড়া দিয়ে ওঠেছে। সবে ড্রপসিন তুলতে শুরু করেছে শীতকালীন শাকসব্জি; মটরশুঁটি, পেঁয়াজ, রসুন এসব! গাছগুলো মেরুডন্ড সোজা করে যেন চাইছে দাঁড়াতে। এসব ভরা মাঠ, সবুজের অপার দিগন্ত দেখতে দেখতে আবার কখন ঘুমিয়ে যায় শুদ্ধ। ঘুম যখন ভাঙে, ঘুমের ঘোর থেকেই শুনে আজিমউদ্দিন আহমেদের ডাক। যমুনা ব্রিজ! যমুনা ব্রিজ!
শুদ্ধ সোজা হয়ে বসে, তাকায় বয়োজ্যোষ্ঠ মানুষটির দিকে, ও! যমুনা!
আপনে তো নদীর পাগল! তাই ডাকলাম!
বাহ বা! ও যে নদীপাগল! আজিম সাহেবেরও দেখছি জানার বাকি নেই। ঝটিতিই ও জানালা দিয়ে যমুনার দিকে তাকায়। তাকাতে তাকাতে অনুভব করে, এমন দিনের স্বচ্ছ আলোয় ও আগে কখনো যমুনাকে দেখেনি। যতোবার গেছে এই যমুনার ওপর দিয়ে হয় রাত পড়েছে, নতুবা নেমে এসেছে শেষ বিকেলের ছায়া। আর প্রতিবারই যমুনাকে মনে হয়েছে জন্ডিস রোগীর মতো বিষন্ন পান্ডুর! আজ যেহেতু দিনের আলো গরবিনীর প্রতিটি কণায় কণায় স্পর্শ রেখেছে, তখন দেখে নেয়া যাক না ওকে ইন্দ্রিয়ের সব কটা জানালা খুলে!
ব্রিজটা হওয়ায় যে কি সুবিধা হইছে ভাই। মন চাইলেই যখন তখন বাড়ি আসতে পারি। আগে তো এভাবে চিন্তা করারই সাহস পেতাম না। বললেন আজিমউদ্দিন আহমেদ।
কেনো! অনেক দেরি হয়ে যেত?
দেরি মানে! ফেরি পার হইতেই তো রাত কাবার হয়ে যেতো! কতোবার যে রাস্তায় রাস্তায় রাত কাটাইছি। এখন তো দিনে গিয়ে দিনেই ফেরত আসা যায়।
আজিমউদ্দিন আহমেদ যখন ব্রিজ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন, শুদ্ধ তখন নেমে পড়েছে যমুনা বিহারে। কী বিশাল আর দিগন্তব্যাপী যমুনা! বুকে বুকে চর জেগে ওঠেছে ঠিকই, ধু ধু বালুকণা রোদের আলোয় চিক চিক করে যমুনার সর্বস্বান্ত হওয়ার খবরটা জানান দিলেও, ওর কৌলিণ্যে ঘাটতি পড়েনি সামান্যও। তাই ব্রিজ নয়, ব্রিজের কাছে এসে যমুনাই প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠল! সত্যিই, কী যেন এক বিমুগ্ধ বিস্ময় বহন করে বেড়ায় নদী, রহস্য ঘেরা সম্মোহনে। তা যেন আবিষ্কারের বাইরে! এই যে যমুনা, কত তার বাঁক, কত মাটির স্পর্শ, কত নাম- তিন দেশে তিন; তিব্বতে জ্যাংবো, ভারতে ব্রম্মপুত্র, বাংলাদেশে যমুনা। ইস্ যদি পারতাম জ্যাংবোর সেই উৎস পশ্চিম তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহে যেতে! যেখানে জ্যাংবোর উৎপত্তি হিমালয়েরও আগে। শুদ্ধ যমুনার পানির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায় সেই অজানায়।
তিব্বতের হিমবাহ থেকে পায়ে পায়ে ও হাঁটছে জ্যাংবোর তীর ঘেঁষে। উৎস থেকে কিছু দূর পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠ থেকে জ্যাংবোর উচ্চতা প্রায় দু-মাইল। অধিকাংশ তিব্বতী বাস করে ইয়াররুং জ্যাংবো অঞ্চলে, জায়গাটা লাসার পশ্চিমে। এখানে জিগাজে আর জেতাং অঞ্চল থেকে এসে জ্যাংবোতে মিশেছে অনেক উপনদী।
শুদ্ধকে সম্মোহিত হয়ে সেই নদীর ধারায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক প্রবীণ বৌদ্ধ জানাল, এই জিগাজে অঞ্চলেই অষ্টম শতকে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তন হয়েছিল।
চারপাশ তাকাল শুদ্ধ। হিমালয়ে বাধা পেয়ে বৃষ্টির মেঘ এই অঞ্চলে না আসতে পারলেও জ্যাংবোর পানিতে উর্বর হয়েছে দু-পাশের উপত্যাকা। সবুজের প্রাচুর্য ছড়িয়ে পড়েছে। সেই মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে জ্যাংবোর সঙ্গে আবারো ও প্রবাহিত হতে লাগলো। লাসার পূর্বে পেই অঞ্চলে এসে জ্যাংবোকে হঠাৎ কেমন সংকীর্ণ মনে হয়। এখানে জ্যাংবো পরিণত হয়েছে প্রায় ১০,০০০ ফুট এক খাদে। নেমে গেছে ১৫০ মাইল গতিপথে ৭০০০ ফুট নিচে। জ্যাংবোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে এবার সত্যিই কষ্ট হচ্ছে ওর। তবু অজানা রহস্যের টানে ও হাঁটে, হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে লাসার কাছে এসে দেখে লাসা উপনদী এসে মিশেছে জ্যাংবোর সাথে। লাসা ছাড়াতেই শুদ্ধকে এবার হাঁটতে হয় দক্ষিণের দিকে। কারণ, পেই থেকে জ্যাংবো দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে সিয়াং-এর কাছে ৩২৮১ ফুট থেকে ৬৫৬ ফুট নেমে আবারও নিচের দিকে নেমে এসেছে। তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে শুদ্ধ এবার প্রবেশ করলো ভারতের অরুণাচল প্রদেশে।
ভারতে এসেই জ্যাংবোর নাম গেল বদলে। হিন্দুশাস্ত্র বললো, বৃক্ষের পুত্র এই নদী, তাই নাম হলো ব্রম্মপুত্র। অরুণাচল প্রদেশের পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে ব্রম্মপুত্র প্রবেশ করেছে আসামের সদিয়া হয়ে ডিব্রগড়। অচিনের হাঁটার কষ্ট এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তিব্বতের মতো অতো পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল নয় এ-জায়গাটা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও চোখ জুড়িয়ে যায়। নিজের দেশের ছায়াও যেন খুঁজে পেল। ডিব্রগড় থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের দিকে ও ছুটে চললো ব্রম্মপুত্রের সঙ্গে সঙ্গে, তেজপুর শহর অতিক্রম করে নদীটা গৌহাটি হয়ে গারো পাহাড়ের কাছে এসে হঠাৎ দক্ষিণে বাঁক নিয়ে রংপুর জেলার কুড়িগ্রামের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতেই নামটাও বদলে হয়ে গেল যমুনা।
হঠাৎ করেই নিজের দেশের মাটিতে পা রাখতে পেরে সে-যে কি আনন্দ হলো শুদ্ধর। চির সবুজ চির সুন্দর বাংলাদেশে পা ফেলেই ও গান গেয়ে উঠলো,
কী শোভা, কী ছায়া গো।
কী  স্নেহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে,
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।।
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি-ই-ই
তারপর যমুনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গাইবান্ধা-জামালপুর-সিরাজগঞ্জ ছাড়িয়ে ওকে গোয়ালন্দে পদ্মার কাছে পৌঁছে দিয়ে, পদ্মার তীর ঘেষে ছুটতে ছুটতে চাদপুর, তারপর যমুনা পুরোপুরি হারিয়ে গেল মেঘনায়- মিশে গেল বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমে।
সত্যি কি কখনো সুযোগ আসবে জ্যাংবোর উৎস থেকে যমুনার গন্তব্য পর্যন্ত তীর ধরে ধরে হাঁটার? তিব্বত তো দুর্গম আর অরুণাচল প্রদেশও কম দূরে নয়, চাকরি করে সেখানে যাওয়ার চিন্তা করাটা অবশ্যই বাতুলতা। বিশেষ করে শুদ্ধর যে-চাকরি! ঠিকমতো একটু শ্বাসই ফেলতে পারে না! আসামে হয়তো সুযোগ বুঝে কখনো যাওয়া যাবে। শুনেছে, গৌহাটিতে ব্রম্মপুত্রের বাঁকটা নাকি খুবই সুন্দর!

ছবিঃ আনসার উদ্দিন খান পাঠান