শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

ছয়.

এই র‌্যাকের বই দেখতে দেখতেই সেদিন রেবার সঙ্গে আড্ডা এমন জমে গেল যে, ওদের কথা আর শেষই হতে চায় না। যেন সারাজীবন কে কত বই পড়েছে কে কোন সিনেমা দেখেছে একজনের কাছে আরেকজনের না বলা পর্যন্ত শান্তি নেই! কথার পিঠে যে এত কথা থাকতে পারে কারোরই জানা ছিল না। আড্ডা দিতে দিতে কখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়ালো, কেউ ঠাহর করতে পারেনি। দুপুরে তো পেটপুরে ভাত খেয়েইছিল, রাতেও আরেক দফা খেতে হলো রেবার বাবার জোরাজুরিতে। ভদ্রলোক রেবার মায়ের চেয়েও মিশুক, অমায়িক, সবচেয়ে বড় কথা সজ্জন।
ডিনার শেষে শুদ্ধ যখন বাইরে বেরিয়ে এলো, আকাশে ঢাউস চাঁদ উঠেছে। সে-চাঁদের দিকে তাকিয়ে ও বিমুগ্ধ হয়েছিল। এতবড় চাঁদ জীবনে আর কখনো দেখেনি। কী উজ্জ্বল জোছনা-ছড়ানো। সে-জোছনার শরীরে ভাসছিল মায়াবী শীতলতা। যেন হাস্নুহেনা ফুটেছিল রাত্রির শরীরে। ওরা ইটের সলিং করা রাস্তা ধরে হাঁটছিল বাইরের গেটের দিকে। মাঝেমধ্যেই একজনের শরীরের ওপর আরেকজনের শরীর এসে যাচ্ছিল। যেতে যেতেই হঠাৎ রেবা বলে উঠছিল, তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছে করে না কেন, বলো তো?
শুদ্ধও মুখ ফসকে বলে ফেলেছে, আমারো ইচ্ছে করছে না যেতে!
রেবা হেসে উঠেছিল, তাহলে থেকে গেলেই পারো!
শুদ্ধ বোকার মতো শুধু হেসেছে। কী বলবে ভেবে পায়নি। তারপর বেফাঁসের মতোই বেরিয়ে এসেছিল ওর গোপন সূত্র, তোমাদের বাড়িতে আসার জন্য আমার কবে থেকে অপেক্ষা? জানো তুমি?
কীভাবে জানবো না বললে?
যেদিন তোমাকে প্রথম দেখলাম! আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলে রিকশায়।
ওমা! তাই বুঝি? আমাকে তখন ডাকলে না কেনো?
কীভাবে ডাকবো? তুমি কি একবারো আমার দিকে তাকিয়েছো?
সেদিন হয়তো তাকাইনি, পরে কিন্তু অনেকদিনই তোমাকে দেখেছি।
আমার চোখে পড়লো না কেন?
হয়তো সময়ের চোখই আমাদের দিকে পড়েনি, বলেই রেবার সে কি প্রাণখোলা হাসি। সে হাসিতে যোগ দিয়ে শুদ্ধও সায় মিলিয়েছিল, হ্যা, সময়ই সবকিছু ঠিকঠাক করে রাখে, যেমন এখন আমাকে যেতে হবে, উপায় নেই। মা অপেক্ষা করছে।
হ্যাঁ, তুমি যাও। তোমার অনেক দেরি করিয়ে দিলাম। তারপর আবার পিছু ডেকেছিল, শোনো, কাল আসবে তো!
থমকে দাঁড়িয়েছিল শুদ্ধ, খালাখালু কী ভাববেন বলো তো?
ধ্যাত! তোমার যে কথা! কিচ্ছু হবে না। নিজের বাড়ি মনে করে চলে আসবে, তারপর ওর গলায় ঝরেছিল গভীর আর্তি, তোমার কবিতার খাতাটা নিয়ে এসো!
না না! আনতে হবে না।
অবশ্যই আনবে। তোমার কবিতা পড়তে হবে না?
না। পড়তে হবে না!
যেন একটা ধাক্কা খেয়েছিল রেবা ওর কথা শুনে। থাক! কৃত্রিম রাগের ঝাঁজ দেখিয়েছিল ও, আনতে হবে না। ওসব অন্য কাউকে পড়িয়ো।
কথাটা বড় দুর্বোধ্য লেগেছিল শুদ্ধর কাছে! অন্য কাউকে পড়ানোর কথা বললো কেনো রেবা, এর কী হয় মানে ও বুঝতে পারেনি। আসলে ওর খুব সংকোচ হচ্ছিল, কীইবা এমন লেখে, তাছাড়া ওসব তো… ও রেবাকে বোঝাতে মরীয়া হয়েছিল, ধুর! কী না কী লিখি। ছাইপাশ! ছাইপাশ শব্দটা উচ্চারণ করেছিল যতীন স্যার যে ভঙ্গিতে বলেছিল, অবিকল সেভাবেই! আর তার রেশেই কিনা রেবার গাল ফুলানিও দূর হয়েছিল মুহূর্তেই। ও আবারো সরব হয়েছে, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো, মানিকরতন! বুঝেছো?
চাঁদঝলসানো রেবার মুখের দিকে তাকিয়ে ও কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি ওকে কবিতা পড়ানোর, তবে মনে মনে বলে উঠেছিল, ওসব কবিতা তো তুমিই আমাকে দিয়ে লিখিয়েছো রেবা, ওসব তো তুমিই! তুমিই তো আমার পদ্মপাতা! মনসরোবর! জীবনদিঘির জল!

রেবাদের বাড়ি থেকে প্রায় উড়তে উড়তে সেদিন বাড়ি ফিরেছিল শুদ্ধ। মা কি ওকে দেখে কিছু বুঝতে পেরেছিল? বারবার শুধু দেখছিল। সে কেমন অন্যরকম এক তাকানো। সে-রকম তাকানো মায়ের চোখে ও আগে কখনো দেখেনি। এর কারণও হয়তো থাকতে পারে। ছেলে কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনই সেই যে সাতসকালে গরম ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো, আর ফেরার নাম নেই! দুপুর গেল, বিকেল ফুরালো, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তারপরও ছেলের দেখা নেই। দেখা নেই তো দেখা নেই, যাওবা ফিরলো রাত দশটায়, দেখো তার রকমসকম, নিজের ভেতর নিজের কেমন ডুবে থাকা। একবারো বললো না, মা এই কারণে দুপুরে ফিরিনি বা এই কারণে দেরি হয়েছে! কলেজে ভর্তির খবরটাও তো বলতে পারতো! মায়ের মন যে সন্তানের জন্য কেমন পাগলপারা থাকে, তা যদি ওরা একটুখানি হলেও বুঝতো! মা-ই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করলো শুদ্ধ কলেজে ভর্তি হলো কী হলো কিনা, দুপুরে খেয়েছে কী খায়নি, রাতে খাবে না কেন! তা শুদ্ধ যা সত্য তাইই বলেছিল- রেবাদের বাসায় যাওয়ার কথা, দুপুর, রাতে খাওয়ার কথা, কিছুটা অবশ্য রেখেঢেকে। তারপর আবার ডুবে গিয়েছিল নিজের মনে।
হ্যাঁ, ডুবে যাওয়াই তো। কেমন একটা অদ্ভুত ঘোরে আচ্ছন্ন হয়েছিল ও। সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি। একেই কি বলে ভালোবাসা? এর নামই প্রেম? কী আশ্চর্য! যে মেয়েটিকে ঘিরে সেই কবে থেকে ওর মনের ভেতর এতো মেঘ রোদ বৃষ্টি শিশির কুয়াশা, সেই কিনা আজ কেমন স্বপ্নের মতো নিজের বাড়িতে ডেকে নিল, ওর কবিতা পড়ার আকুলতা দেখালো, বললো যে ওকে ছাড়তে মন চাইছে না! এসব কি সত্যি সত্যি বলেছে রেবা? নাকি স্বপ্ন! এমন স্বর্গীয়ক্ষণও কি কারো জীবনে আসতে পারে?
তখন ঘরে একটা আলাদা টেবিলল্যাম্প ছিল না। ষাট পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়েই নিজের কবিতার বাইন্ডিং বুক খাতাটা বের করে নিয়েছিল। পাগলের মতো হুমড়ি খেয়ে একটার পর একটা কবিতা পড়েছে। কবিতা পড়েছে আর অবাক হয়েছে! এসব কবিতা কি সত্যিই ওর লেখা? কী অদ্ভুত ভালো যে লেগেছিল! কীভাবে এতো সুন্দর সুন্দর কথা এতো সাজিয়ে গুছিয়ে ও লিখতে পারলো! এমন সুন্দর সুন্দর শব্দরাই বা এলো কোথা থেকে? যতীনস্যার যেহেতু রেবার কাছে ওর কবিতার প্রশংসা করেছে, তাহলে এসবের তো নিশ্চয়ই সামান্য মূল্য হলেও রয়েছে। হ্যাঁ, রেবা, তোমাকে আমি কবিতাগুলো দেখাবো, তোমাকে পড়াবো সব কবিতা! সব কবিতা তোমাকে পড়াবো! ইচ্ছে করছিল তখন তখনই দৌড়ে ছুটে যায় রেবাদের বাড়ি!

ছবিঃ প্রাণের বাংলা