শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

তেত্রিশ.

তারপর কত স্টেশন…কত নাম! সিরাজগঞ্জ,বগুড়া,শিবগঞ্জ! কত মানুষ উঠলো, নামলো- আজ কোনো শৃংখলা নেই, ঈদের পরের দিনের যাত্রীদের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে আজ শুধু পয়সা কামাবার দিন। ছোট হোক বড় হোক প্রতিটি স্টেশনে থামছে জুলেখা পরিবহন। দেরিও করছে ম্যালা! যাত্রীরা কেউ কিছু বলছে না। সবাই কী আশ্চর্য চুপচাপ, নীরব। যেন কোনো যাদুটোনা করে বোবা বানিয়ে রাখা হয়েছে সবগুলো মানুষকে। বাসে ওঠার পর থেকেই শুদ্ধ দেখছে নিচে বসা যাত্রীগুলো যেন জাগতেই পারছে না। এর ওপর ও, ওর ওপর সে শুয়ে-বসে ঢুলছে। সিটে বসা সব মানুষ দেখার সুযোগ নেই। শুদ্ধ এখন আজিমউদ্দীন আহমেদের পাশে এসে বসেছে। শিবগঞ্জেই তার পাশের আসনটি খালি হয়েছিল। ওকে ডেকে নিজের পাশে বসিয়েছেন মানুষটা। তারপর কথা বলতে বলতেই কখন ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎই জেগে ওঠে আকস্মিক জানতে চান, তেঁতুলিয়ায় যে যাচ্ছেন, থাকবেন কই?
শুদ্ধ নিজেও ভেবে দেখেনি কোথায় থাকবে। আসলে ভাবাভাবির দরকার হয় না। যে চারপাঁচবার গেল, কখনো তো থাকার অসুবিধে হয়নি। ঠিক ঠিকই থাকার জায়গা মিলে গেছে। ও নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, ডাকবাংলো-টাংলো একটা পেয়ে যাবো নিশ্চয়ই। তারপর নিজের দিক থেকে দৃষ্টিটা ফেরাতে চাইলো উলটো প্রশ্নে, কদিন থাকবেন বাড়িতে?
তিন চার দিন থাকবো আর কি! অফিস খুললেই চলে আসব।
এতো কষ্ট করে যাচ্ছেন? কটা দিন থাকবেন না?
তা কি থাকার উপায় আছে? আপনে তো ভালো করেই জানেন। গোলামি করি।
সত্যি আমরা সবাই গোলামি করছি। কিন্তু কার গোলামি করছি আজিমভাই?
অফিসের যারা মালিক? মালিকের?
সে মালিক আসলে কে? কেমন?
এমন প্রশ্ন কখনোই করবেন না শুদ্ধ ভাই। তাইলে কখনোই চাকরি করতে পারবেন না।
হুমম। শুদ্ধ কতক্ষণ চুপ রইলো। তারপর আপন মনেই বললো, যেন একটু ভিন্নরাস্তায় সরতে, আমরা কি শুধু মালিকের গোলামি করি? যাদের জন্য গোলামি করি, তাদের গোলাম নই?
সংসার করাটাই তো গোলামি। হেসে উঠলেন আজিমউদ্দীন আহমেদ। তবে শেকলটা ভালোবাসার, মায়ার। তাই না ভাই?
শুদ্ধও হেসে ওঠে, হে একদম! ঝাক্কাস বলেছেন ভাই!
গোলামি মনে করলেই গোলামি। না মনে করলে অনেককিছু!
অনেককিছু?
হ্যাঁ, সংসারের ভালোবাসা। মাস শেষে বেতন! নিশ্চিন্ত জীবন! ব্যাংক ব্যালেন্স!
শুদ্ধ আজিমউদ্দীন আহমেদের দিকে নতুন চোখে তাকায়। লোকটার যে এতো জ্ঞানগম্যি আগে তো তা জানা ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর শুদ্ধ আবারো জানতে চায়,
শুধু কি সম্পত্তি দেখতে যাচ্ছেন? নাকি না গিয়ে পারেন না?
স্মিত হাসলেন আজিমউদ্দিন আহমেদ, সত্যি কথাই বলছেন ভাই, না গিয়ে পারি না। রিটায়ার্ডের পর তো এখানেই থাকবো।
কেন? ঢাকায় না শুনলাম ফ্ল্যাট নিয়েছেন?
ধুর! ঢাকায় থাকতে ইচ্ছে করে না ভাই। দমবন্ধ হয়ে আসে। ঢাকা শহর চলে গেছে রাজমিস্তিরিদের দখলে। খুটুর খুটুর চলতেই থাকে। কোনোদিন আর এই শহরের ফুটপাত রাস্তাঘাটের কাজ কমপ্লিট হবে না। কাজ খালি চলতেই থাকবে। চোরদের হাতে সব। আর কি হাঁটা যায় কোথাও, বলেন? শুধু চাকরির জন্য থাকতেছি। ফ্ল্যাট কিনছি, মেয়েটা থাকবে। একটাই তো মেয়ে, ওকেই দিয়ে যাব। সৈয়দপুরই আমার আসল জায়গা। এখানে জন্মাইছি এখানেই মরবো।
জন্মটান এমনই। সেই কবে কত মাইল মাইল বছর আগে সৈয়দপুরের এক নিভৃত গ্রামের নির্জন বাড়িতে জন্মেছিলেন তিনি। সেই বাড়ির গন্ধ নিতে নিতে চোখ খুলতে শিখেছেন। সেই বাড়ি, বাড়ির বৃক্ষ-বৃক্ষছায়া-চিলতে আকাশ-রোদ-মেঘ-বৃষ্টি দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠেছেন। আস্তে আস্তে বেড়েছে দেখার গন্ডি। ধীরে ধীরে পা পড়েছে বাইরের জগতে, স্কুল, স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে শহর- ঢাকার জীবনে অভ্যস্ত হওয়া। তারপর সেই বাড়ি থেকে জন্মগ্রাম থেকে দীর্ঘ দীর্ঘদিনের ব্যবচ্ছেদ জীবন সংগ্রামে ঢাকা পড়ে গেছে শৈশব, এমন কি নিজের সত্তাটুকু। আজ ভাঁটিবেলায় এসে, ষাট বছর পাড়ি দেওয়ার পর, জন্মভূমির টান, শৈশবের মায়া ফিরে ফিরে ডাকে তাকে। সে ডাককে হয়তো কেউ কেউ উপেক্ষা করতে পারেন কেউ পারেন না, পারেননি আজিমউদ্দিন আহমেদও। অফিসের অচেনা সেই মানুষটিকে আবার নতুন চোখে দেখে শুদ্ধ নতুন অনুভবে।
ঝিম ধরা পড়ন্ত বিকেলে বাস থামল গোবিন্দগঞ্জ স্টেশন। দাড়িঅলা টুপিমাথা সেই কন্ডাক্টর কোথা থেকে বেরিয়ে এসে এতোক্ষণে জানান দেয়, বিশ মিনিটের রেস্ট। খাওয়াদাওয়া, বাথরুম যার যেটা সারন দরকার- সেরে নেন। পরে আর কোনো চান্স নাই।
বাসসুদ্ধু যাত্রী নেমে যায়। শুদ্ধও নামলো আজিমউদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে। ক্ষুধা সেই কখন থেকে কাতরে বেড়াচ্ছে। ক্ষুধা গোঙরাচ্ছে। শুদ্ধ ভেবেছিল বগুড়ার কোনো ফুড ভিলেজে খাওয়াবে ড্রাইভার। তাতো খাওয়ালোই না, উলটো বাসটা শুরু করলো যম নিয়ে টানাটানি। কী যে স্পিডে এলো জুলেখা পরিবহন আর কী পাগলামো গতি তার। একেকবার মনে হচ্ছিল, গেল বুঝি রাস্তার পাশের কোনো খালে বা নদীতে উলটে অথবা বিপরীত দিক থেকে আসা কোনো ট্রাকের ধাক্কায় যাবে ভচকে! তারপর তো স্টেশনে স্টেশনে দাঁড় করিয়ে রাখার বিপুল অত্যাচার ছিলই! যেখানে থেমেছে গা গেড়ে বসেছে বাসটা। নেমে যে কিছু খেয়ে আসবে তাও পারেনি। ওদিকে ড্রাইভার ব্যাটা তো প্রতিটি স্টেশনেই এটা ওটা চেখেছে আরামে। কখনো পান, সিগারেট, কখনো আবার হর্স ফিলিংস! হ্যাঁ, হর্স ফিলিংস! এনার্জি ড্রিংকস! যেমন নাম, তেমনি যেন তার কাজ! নইলে ড্রাইভার ব্যাটা অতো গোয়ার গোবিন্দ হওয়ার শক্তি পেল কীভাবে? হর্স ফিলিংস পান করলে কি গায়ে ঘোড়ার শক্তি মেলে? ক্ষুধা কখনই মরে গিয়েছিল। তারপরও খাওয়ার কথা শুনেই পেটটা আবার ক্ষুধায় চো চো করে উঠলো। আজিমউদ্দীন আহমেদকে নিয়ে তড়িঘড়ি বাস থেকে নেমে পড়লো শুদ্ধ।
গরুর মাংশ ডালভাত দিয়ে আধাপেটা ভাত খেয়ে সবার আগে আগেই হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো দুজন। তারপর বয়স্ক মানুষটা এমন এক কা- করলো, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না শুদ্ধ। পাশের দোকান থেকে কিনে নিজে একটা পান মুখে দিয়ে শুদ্ধর দিকে একটা পান বাড়িয়ে তো দিলই, সঙ্গে একটা বেনশনও জুড়ে দিল, নেন টানেন।
আজিমউদ্দিন আহমেদের আন্তরিক গলার ধমকে সব দ্বিধা নিমিষেই মুছে গেল শুদ্ধর। ও একই সাথে সিগারটেটা ধরিয়ে, মুখের পান চিবুতে লাগলো। কী আশ্চর্য, পানের রসের কারণেই কিনা সুখী সুখী একটা অনুভব নিজের ভেতর টের পায়। ও একবার পান চিবোয় তো আরেকবার সিগারেটে জোর টান দেয়। আজিমউদ্দিনও যেন সেই তবক দেওয়া পানের গুণে মুখর হয়ে ওঠলো কথায়। বাড়ির কাছে এসে মাটির ঘ্রাণ পেয়েই কিনা, কত কথা যে বুক ঠেলে উছলে উঠলো ওর, শৈশব-কৈশোরের সৈয়দপুর, সৈয়দপুর ছেড়ে যাওয়ার সেই সব মুহূর্ত! যৌবনের সেই দিনগুলোর কথা। এই মানুষটার সঙ্গেই যে এত বছর চাকরি করছে একসঙ্গে, অথচ কোনোদিন প্রাণ খুলে কথা বলা দূরে থাক, ভালো করে তাকানো পর্যন্ত হয়নি। ভালো করে জানবে কী করে! আসলে অফিস অফিসই। সেখানে হৃদয়বৃত্তির জায়গা নেই। সবকিছু চলে ডেকোরাম মেনে মেনে। আর যাদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়, সেখানে জড়িত থাকে কোনো গোপন স্বার্থ। হয় অর্থের লেনদেন নয়তো নারী-বিষয়ক কোনো ব্যাপারস্যাপার। আজিম ভাইয়ের কথা শুনে অফিস সম্পর্কে নতুন এক অবলোকন হলো ওর। আজিম ভাই বললেন, অফিসের যে মেয়েগুলার কথা বললেন, ওরা আপনার সাথে কথা বলে না এইটা আপনার জইন্য ভালোই হইছে- জানেন ওরা কতোটা উচ্ছৃংখল, কতোটা খারাপ। একসঙ্গে অই পাকিস্তানিটার বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকে!
কী বলছেন আজিম ভাই?
জি। মানুষ যে অ্যাডফার্ম সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে এমনে এমনে বলে না ভাই। এই মেয়েগুলা কাউরে সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানে না। মনে করে অফিসের অরাই মা-বাপ। এই অফিস দেখবেন বেশিদিন টিকব না। আপনাকে বলে রাখলাম। পারলে সরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
হঠাৎ মনটা কেমন ছোট হয়ে যায় শুদ্ধর। আজিম ভাইয়ের কথা শুনে অনিশ্চয়তার একটা কালোমেঘ মনের আকাশকে ঘিরে ফেলে।

ছবিঃ আনসার উদ্দিন খান পাঠান