শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

চৌত্রশি.

খেয়েদেয়ে টনটনা হয়ে ড্রাইভার বাসে উঠে বসতেই, হেলপার ডেকে ডেকে সব যাত্রীকে আবারো জড়ো করায়। ততক্ষণে দেখো বিকেলের আলো কেমন মিইয়ে যেতে শুরু করেছে। প্রকৃতিতে নেমে এসেছে হিম নিস্তব্ধতা। সেদিকে লক্ষ্য করেই কিনা আজিমউদ্দিন আহমেদ বললেন, শুদ্ধভাই, আপনার তো তেঁতুলিয়া পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে। এক কাম করেন ভাই। আজ রাতটা আমার সাথে সৈয়দপুর থেকে যান। কাল সকালে উঠে আবার রওনা দিয়েন। শুদ্ধ সবিনয়ে জানায়, না আজিমভাই, আজকে আমাকে পৌঁছাতেই হবে। তা না হলে কবে আবার ফিরবো, ঘোরাঘুরির সময় পাব না। অফিস থেকেও তো ছুটি নিয়ে আসিনি।
হ্যাঁ, ছুটি নিলে তো আমিই জানতাম। তবে ছুটি চাইলেও মনে হয় পেতেন না।
তাই?
হুমম। কাউরেই তো দেয় নাই, বিশেষ করে আপনাদের ক্রিয়েটিভ ডিপার্টমেন্টকে। কিসের জানি একটা পিচ আছে বললো!
হ্যাঁ, একটা মোবাইল কোম্পানির। মোটরঅলা নাকি কি?
বাসটা আবার নতুন করে যাত্রারম্ভ করলো। পেটে দানাপানি পড়াতেই কিনা ড্রাইভার লোকটাও যেন নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ও কি আবারো হর্স ফিলিংস-এ চুমুক দিচ্ছে নাকি? তাই-ই তো মনে হচ্ছে। অশ্বশক্তি সম্পন্ন হবে! বেশ! শুদ্ধ এখন যে সিটে বসেছে ড্রাইভারকে সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। তবে মাথা একটু বাইরের দিকে সরালেই লুকিং গ্লাসে লোকটার সেই মোটা গোফঅলা মুখটা চোখে পড়ছে। চালাতে চালাতেই সামনের সিটের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আবারো শুরু করেছে ক্যাঁতক্যাতানো হাসি। শুদ্ধ লুকিয়ে গ্লাসে তাকানো এড়াতে চায়। কিন্তু না চাইলেও চোখ বারবার চলে যায় ওদিকে। শেষে আবারো আজিমউদ্দিন আহমেদের দিকে তাকিয়ে উনার সঙ্গে কথা বলায় মনোযোগী হয়ে ওঠে।
মোবাইল কোম্পানিগুলা তাহলে বাংলাদেশের বাজারে ভালোই মনোযোগ দিছে।
মনোযোগ দিছে মানে। তিনচার বছরের মধ্যে দেখেন না কী অবস্থা হয়!
তিনচার বছরও লাগবে না। মোবাইল কোম্পানির তো বাংলাদেশে হিউজ বাজার।
হিউজ। সবার হাতেই দেখবেন মোবাইল। সবার হাতে।
হ্যাঁ, এখনই লোকজন কিনতেছে
দামটা একটু কমাক না! দেখবেন। আর নেটওয়ার্কটা ঠিকঠাক হোক। মাত্র তো জায়গায় জায়গায় টাওয়ার বসাইতেছে।
আমাদেরও তো ব্যবসা বাড়বে।
বাড়বে মানে? একটা মোবাইল কোম্পানি ধরতে পারলেই তো খ্যান। আর কিসসু লাগবে না। ফিউচারে মোবাইলেই হবে মূল ব্যবসা।
ব্যবসা তো হবে কোম্পানির, আমাদের কি?
আমাদের আর কি? আমরা যেমন ছিলাম, তেমনই থাকবো।
আরো হয়তো খাঁটনি বাড়বে।
বাড়বে মানে দম বার হয়ে যাবে!
হুমম। এখনই কি কম? আজিমভাই আমার আর চাকরি করতে ভালো লাগে না, ভাই
কেন ভাই?
সেই সকাল দশটায় আসি। এসে বসে থাকি। গালগল্প হয়। কাজ হলে হলো না হলে নাই। বসদের কাজ শুরু হয় সন্ধ্যার পর। রাত দশটা নাই বারোটা নাই, এসব কি ভালো লাগে কন
ভালো লাগার তো কথা না।
যদি ওভারটাইম দিত, একটা কথা ছিল, ওভারটাইম তো দেয়ই না, গভীর রাতে কীভাবে বাসায় যাই, সেই চিন্তাও কেউ করে না। রাত একটায় বাসায় ফিরা সকাল দশটায় অফিস!
কোনো কোনো পোলাপানও তো তাল মিলায় বসকে খুশি রাখার জন্য
হ্যা হ্যা। ওরাই তো নষ্ট করছে।
ওই যে পাকিস্তানিটা। ওর তো অফিস সারারাত খোলা থাকলেই সুবিধা
পাকিস্তান ইন্ডিয়ান সবারই রাতে অফিস থাকলে সুবিধা। ফ্রি খাওয়াদাওয়া, সময় কাটানো
শুধু কি সময় কাটানো! অফিসে যে কতকিছু হয় শুদ্ধভাই। কিছুই তো মনে হয় টের পান না। আমাদের চোখ হইলো চাইট্টা। না দেখতে চাইলেও দেখতে হয়।
শুদ্ধর চোখও কি চারটা? তাকাতে না চাইতেও ওর চোখ আবারো চলে গেল লুকিং গ্লাসে। ড্রাইভারের ক্যাঁতক্যাতানো হাসি এবার আরো বাড়বাড়ন্ত। লুকিং গ্লাসে সামনের সিটের মেয়েদুটোর দিকে তাকাচ্ছে আর দন্ত প্রসারিত করে ক্যাঁতক্যাতানো হাসি দিয়েই যাচ্ছে সমানে। সেই সাথে ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে বাসের গতি। বাসের গতি বাড়তে বাড়তে প্রায় লাফিয়ে উঠছে। যেন উড়তে চাইছে চূড়ান্ত পাগলামোর পর্যায়ে। আর এই মাত-কর তাফালিং গ্রাসেই আবার আবারো ক্যাসেটে ভেসে ওঠলো গান। হা হা আবারো!
আমি তো মরে যাবো
আমি তো মরেই যাবো
চলে যাবো
রেখে যাবো সবই
আছোস নি কেউ সঙ্গের সাথী
সঙ্গে নি কেউ যাবি
আমি মরে যাবো!!
এবং গানের তালে তালে ড্রাইভার লোকটা উন্মাদপ্রায় উন্মাতাল নাচে মদমত্ত হয়ে মাথা দোলাচ্ছে, ভুড়ি নাচাচ্ছে, স্টিয়ারিং ছেড়ে সিট ছেড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে চাইছে। ভয়ংকর এক ভয়ের ভেতর ডুবে যেতে থাকে শুদ্ধ। এরশাদ শিকদার ছাপিয়ে চোখের সামনে মূর্ত কাপালিকের মতো বিশাল রামদা হাতে ভেসে ওঠে বীভৎস ভয়ংকর চেহারার এক মানুষ। বেটে মোটা। সারামুখে ঘন কুচকচে গোঁফ-দাড়ি। মোটা ঠোঁটজোড়ায় যেন রক্তপানের নেশা চারিয়ে ওঠতে চাইছে। রামদা হাতে সারা বাংলাদেশকে প্রকম্পিত করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে! আবার বাংলার সাথে মিলিয়ে নাম নিয়েছে বাংলাভাই!
তার তো চারুণভুমি এই নর্থ বাংলায়! এ-অবস্থায় কি তেঁতুলিয়ায় আসাটা ঠিক হলো? নিজের কাছেই নিজে জিজ্ঞাসিত হয়ে থাকে শুদ্ধ।
আরে আমার কি? শুদ্ধ যেন এক ধমকে নিজের ভেতরের জমে থাকা ভয়টা কাটাতে চায়। আমার কি হবে? আমি কি পলিটিক্স করে বেড়াই? কিন্তু বেয়াড়া মন মানে না ওর কথা। দুনিয়া-বোঝাই কি পলিটিক্যাল লোক মরছে? প্রতিদিন তো মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ নিরীহ মানুষ। সেই যে রমনার বটমূল থেকে শুরু হলো বোমা বিস্ফোরণ! তারপর ঢাকার বাইরের উদীচির অনুষ্ঠানে, ২১ আগস্ট আওয়ামী জনসভায়, মন্দির-মসজিদ-মাজার-বিচারালয়- কোথায় বাদ আছে? কোথায় মরেনি মানুষ? তোমার জন্য কি আদৌ নিরাপদ কোনো জায়গা আছে এখনকার এই বাংলাদেশে? বলো আছে কোথাও একে ফোঁটা স্বস্তি? ১৭ আগস্ট জিএমবি সারা বাংলাদেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জানান দিয়েছে তার শক্তি কতো প্রচন্ড আর কতো দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকতে পারে। তুমিও বাংলাভাইয়ের নেটওয়ার্ক-এর বাইরে নও। বরঞ্চ তোমার মাথা পাতা রয়েছে বাংলাভাইয়ের রামদার নিচে।
শুদ্ধ ঘামতে ঘামতে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে, এখন আর সেই ভীতিকর অবস্থাটা নেই। সরকার তো মনে হচ্ছে আন্তরিক। জেএমবি-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
পরমুহূর্তেই নিজের যুক্তিটা নিজের কাছেই বড়ো ঠুনকো লাগে। নিষিদ্ধ জিএমবি তো আরো বেশি ভয়াবহ। ওদের তৎপরতায় তো মনে হচ্ছে ক্ষমতাসীনরাও ভেতরে ভেতরে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। আবারো চোখ চলে যায় লুকিং গ্লাসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ড্রাইভারের ভুড়ি। ব্যাটা গানের সঙ্গে মাতোয়ারা হয়ে নেচে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর গায়ের শার্টও শরীর থেকে সরিয়ে ফেলেছে। লুকিং গ্লাস শুধু ধরে রেখেছে ওর ভুঁড়িটা। সামনের সিটের তরুণীদ্বয় কি উপভোগ করছে? গানের শব্দ আরো চড়া,
মরার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যাবে কান্নাকাটির ভিড়
সবাই মোরে মাটি দিতে হইবে অস্থির।
আমায় দেবে মাটি
আমায় দেবে মাটি ভুল ক্রটি চেয়ে নেবে ক্ষমা
কেউবা এসে হিসাব করবে কোন ব্যাংকে কি জমা?
আমি মরে যাবো
হঠাৎ মানুষের কন্ঠের একটা তীব্র আর্ত চিৎকার গাড়ির শব্দ গানের শব্দ ছাপিয়েও উচ্চাঙ্গ নিনাদ তুলে মিলিয়ে যায়। ড্রাইভার গানের শব্দ কমিয়ে দিয়ে দরোজার কাছের সিটটায় বসা হেলপারের উদ্দেশে চেঁচিয়ে জানতে চায়, কি অইলো রে গ্যাদা?
গ্যাদা বাসের দরোজাটা অর্ধেক খুলে দুহাতে বাসের রড শক্ত করে ধরে মাথাটা অনেকটাই বের করে পেছন দিকে তাকিয়ে সে অবস্থায়ই জানান দেয়, ওস্তাদ! একটা মানুষ পড়ছিল গাড়ির নিচে।
গ্যাদা আবারো বাসের দরোজা লাগিয়ে নরম্যাল হয়েছে। ড্রাইভার ভ্রু নাচিয়ে জানতে চায়, কী অবস্থা?
গ্যাদা নির্বিকারভাবে জানায়, এক্কেবারে রাস্তার লগে মিশ্যা গেছে গা ওস্তাদ! নাড়িভুড়ি বাইর অইয়া গ্যাছে!
হা হা হা। প্রবল উল্লাসে হেসে উঠলো ড্রাইভার। এতো প্রমত্তকার যে-উল্লাস, হাসির উল্লম্ফনে ওর দুচোখ ওপর এবং নিচের মাংসপেশীতে ঢাকা পড়ে গেল। হাসতে হাসতে সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে সিট থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর আবারো বসে জোড় হাতে ধরে ফেললো স্টিয়ারিং! আর তখন দেখো হাসির তোড়ও শুরু করেছে কমতে, পরিণত হয়েছে আবারো ক্যাঁতকেতানো রূপে, সে-স্টিয়ারিংটাকে সম্পূর্ণ নিজের অধিকারে এনে জিজ্ঞেস করলো,
কী অবস্থা হইছে, কইলি?
ওস্তাদ নাড়িভুড়ি এক্কেবারে বাইর অইয়া গেছে গা!
আবারো ড্রাইভারের উন্মত্ত হাসির উচ্ছসিত প্রস্রবণ! হাসতে হাসতে তার চোখ মাংসপেশীতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সে সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রবল উত্তেজনায়, স্টিয়ারিং হাত থেকে সরে গেছে। দেখে বুক কেঁপে ওঠলো শুদ্ধর। ও কার গাড়িতে চড়েছে। এ কোন উন্মাদ! গানের সাউন্ড বেড়েই যাচ্ছে, বেড়েই যাচ্ছে, বেড়েই যাচ্ছে-
মরে যাবো রেখো যাবো দুনিয়ার সম্পদ
সেই সম্পত্তি ডেকে আনবে আপদ আর বিপদ
সম্পদ ভাগের জন্য মনমালিন্যর হবে সূত্রপাত
একজন করবে আরেকজনকে আঘাত অপবাদ
আমি তো মরে যাবো-

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]