শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

পয়ত্রিশ.

রাত ঠিক দুটার সময় জুলেখা পরিবহন তেঁতুলিয়া স্টেশনে থামলো। যাত্রী বলতে প্রায় কেউই ছিল না এক শুদ্ধ ছাড়া। সৈয়দপুর, দিনাজপুরেই বাস অনেকটা খালি হয়ে গিয়েছিল। আজিম ভাই সৈয়দপুর নেমে গেছেন, সামনের সিটের মেয়ে দুটোও নেমেছে সেখানে। তারপর যাও-বা সাত আটজন যাত্রী ছিল, তারাও নেমে পড়েছে পঞ্চগড়। রাত বলেই বোধহয় নতুন কোনো যাত্রী উঠেনি আর। শুদ্ধ ভেবেছিল বাকি রাতটা ও বাসে বসেই কাটিয়ে দেবে।   মাত্র তো তিন-চার ঘণ্টার ব্যাপার, ভোরের আলো ফুটলেই উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয় গিয়ে উঠবে। তাই গা গুটিয়ে নিজের সিটেই বসে থাকে। কিন্তু বেরসিক ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার মুহূর্তে ওকে দেখে তাড়া দিয়ে উঠলো, ‘কী ভাই-ঈ-ঈ,’ ভাইটা বলার পর লোকটা অদ্ভুত এক টান দেয়, ‘বসে আছেন যে? নামতে হবে না?’ শুদ্ধ ড্রাইভারের গলা শুনেই বুঝলো বিশেষ সুবিধা হবে না। তবু বোঝানোর চেষ্টা ওর, ‘ভাই! আমি তো এখানে বেড়াতে এসেছি। থাকার জায়গা নাই। রাতটা বাসে কাটানো যায় না? সকালবেলা ডাকবাংলায় ওঠতাম।’ ওর কথা শুনেই ড্রাইভার সেই ক্যাঁতক্যাতানো হাসি দেয়। বড় বিদ্রুপের হাসি, গা জ্বালানো। হাসতে হাসতেই লোকটা জোরে চেঁচিয়ে ওঠলো, ‘ওই গ্যাদা! গ্যাদারে!’ সেই হেলপার ছেলেটি অন্ধকারে কোথা থেকে এগিয়ে আসে, সঙ্গে দাড়িঅলা মাথায় টুপিপরা কন্ডাক্টর গোছের লোকটিও। ওরা আসতেই ড্রাইভার ব্যঙ্গ করে ওঠলো, ‘দেখছে গ্যাদা কি মামার বাড়ির আবদার। এই ভদ্দরলোক বাসে থাকবার চায়? খ্যাক খ্যাক করে আবারো হাসে ড্রাইভার। এতে হাসির কী হলো! শুদ্ধ খুব অস্বস্তি বোধ করে। আরে বাবা! এতো সিরিয়াসলি নেয়ার কী আছে। আমি কথাটা জাস্ট বলেছি, বলেছি বলেই যে থাকব, তাতো আর না! তুমি থাকতে দেবা না সেটা তোমার ব্যাপার! আমি নেমে যাই। কিন্তু এতো ঢাকঢোল পেটাচ্ছ কেন। সবাইকে ডেকে-ডেকে একেবারে শোনাতে হবে! রাগে-অপমানে মাথায় রক্ত ওঠে যায় ওর। এখন মানে মানে সোজা নেমে পড়াটাও কেমন গায়ে লাগছে। মনে হচ্ছে যেন ওকে ঘাড়ে ধাক্কা মেরে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। ও স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে। গ্যাদা ধমকে ওঠলো, ‘অই মিয়া নামেন! তাড়াতাড়ি নামেন।’ অপমানে আরো গা জ্বালা করে শুদ্ধর। ও তাতিয়ে ওঠে, ‘কথা ভালোভাবে বলতে পারো না?’ হেলপার আরো বেয়াড়া হয়ে ওঠে, ‘আপনে নামবেন নাকি ঘাড়ে ধাক্কা দিতে হইবো। এতো রাইতে আপনারে নিয়া তামশা করুম?’ সেই মাথায় টুপিঅলা দাড়িয়ালা লোকটি ত্রানকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়, আই! তুই চুপ কর। লোকটা শুদ্ধর দিকে এগিয়ে আসে, ‘ভাই, নেমে যান। বাসে থাকার নিয়ম নাই। আপনে নামলে আমরা এখন যাব, নামেন ভাই।’ লোকটার নরম গলা শুনে শুদ্ধর উত্তেজনাও দপ করে নিভে আসে। ও ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লো বাস থেকে। নামতে নামতেই শুনলো, পেছনে ড্রাইভার বলতেছে, ‘দ্যাখগা খোঁজ নিয়া জিএমবি না সিএমবি! ওরাতে বাসে থাকবো, সকালে যাওয়ার সময় বাস বোমা বেরাস্ট কইরা উড়াইয়া দিবো। এইগুলারে বিশ্বাস নাই!’ সেই গ্যাদাই কিনা, শুধরে দিল, ‘বোমার যে পাওয়ার ওস্তাদ, উড়াইবো কী, দেখবেন বাসের কোনো চিহ্নই থাকবো না!’ ধমকে ওঠলো ড্রাইভার, ‘হ তাড়াতাড়ি নাম। কথা কম। হে, আমি তো মরে যাবো, আমি তো মরেই যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবই, আছোস নি কেউ সঙ্গের সাথী, সঙ্গে নি কেউ যাবি, আমি মরে যাবো!! বাস থেকে নেমেই বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাত করে উঠলো শুদ্ধর। এখন শুক্লপক্ষ চলছে। চাঁদের তৃতীয়া তিথির আলোয় থই থই করছে প্রকৃতি। তবু কেমন একটা বিদঘুটে পিশাচ নিথরতায় সবকিছু স্তব্ধ হয়ে আছে। বিখ্যাত সেই বড় তেঁতুলগাছটাকে ক্রস করে ও আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোয়, চৌরাস্তার মোড়ের কাছে যেখানে ঘন দোকানপাট, মার্কেট, চায়ের দোকান নিবিড় হয়ে আছে। কোথায়, কেউ তো জেগে নেই। যেতে যেতে কোনো প্রাণের সাড়া ও অনুভব করে না। একটা দোকানও খোলা নেই। জ্বলছে না আলো। যে-চায়ের দোকানটা বাসের অপেক্ষায় সারারাত জেগে থাকতো, সেটারও ঝাঁপ নামানো। অনেকবারই তো ও রাতে-রাতে পৌঁছেছে এখানে। কখনো তো এতোটা পাথুরে নৈশব্দ্যতা টের পায়নি। বাস থেকে নামার পরই শীত লাগছিল শুদ্ধর। এখন যেন সে-শীত গায়ে কামড় বসাতে চাইছে। ও ব্যাগটা চায়ের দোকানের সামনে পাতা কাঠের বেঞ্চিটায় রেখে হাতকাটা স্যুয়েটার বের করে নেয়। কে জানতো এখানে এসে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হবে! তেঁতুলিয়ায় কি ওর একবার আসা? চার পাঁচবার তো হবেই! গত বছরও ঠিক এ-সময়ই এসে ঘুরে গেল। এমনই এক রাতের অন্ধকারে বাস থেকে নেমেছিল সেদিন। নেমে বেশ অবাকই হয়েছিল। মধ্যরাতেও তেঁতুলিয়া আলোয় আলোয় সয়লাব হয়ে আছে। স্টেশনকে ঘিরে চারপাশের প্রায় সব দোকান খোলা। লোকজন সে সব দোকানের সামনের টুলে বসে-দাঁড়িয়ে আলাপ জুড়ে দিয়েছে। চায়ের দোকান আড্ডায় জমজমাট। অনেকগুলো ভ্যান রিকশা একসঙ্গে ছুটে এসেছিল ওর দিকে। তার থেকে একটাকে বেছে নিয়ে রাতদুপুরেই পৌঁছেছিল উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয়। ভ্যানওয়ালার ডাকে ঘুম থেকে উঠে এসেছিল কেয়ারটেকার মালেক, কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বড় বিরক্ত হয়েছিল মানুষটা। শুদ্ধ এবার তাই ভেবে রেখেছিল, মাঝরাতে মালেককে বিরক্ত করবে না। বাকি রাতটা কোনোমতো বাসে কাটিয়ে সকাল হলেই যাবে ডাকবাংলায়। কিন্তু এখানে আসার পর সব হিসেব কেমন গুবলেট হয়ে যাচ্ছে। ও বিমূঢ় জোছনার আলো-অন্ধকারে একা একা পাথরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। নিজেকে কখনো এতটা অসহায় মনে হয়নি। ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। এখানেই কি কোথাও দোকানের সামনের টুলে-বেঞ্চিতে বসে রাতটা কাটিয়ে দেবে না কি আস্তে আস্তে সাহস করে ডাকবাংলার দিকে এগোবে? পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়! প্রথম কথা হলো ও এখন কোন দিকের পথ ধরবে? ডাকবাংলোয় যদি যায় শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক ধরে এগোতে হবে মনে আছে, সে রাস্তাটা অবশ্য ও চেনে। হাতের বামে বিডিআর ক্যাম্প রেখে সোজা চলে গেছে রাস্তাটা। কিন্তু সে-রাস্তা ধরে এগোনোর পর ডাকবাংলোর দিকে যাওয়ার কাঁচারাস্তার পাশের বড় পাকুড় গাছটার কথা মনে পড়তেই গা ছমছমিয়ে কাঁপতে লাগলো। সেবার ভ্যানচালক কবিরাজ ভাই গাছটা দেখিয়ে বলেছিল, রাত বারোটার পর এই গাছের চেহারা বদলে যায়। গাছটা খালি কাঁপে। মাঝে মইধ্যে আগুনের গোল্লা বের হয়ে আকাশের দিকে ছুটে যায়। রাতবিরেতে অনেকেই দেখেছে এ-দৃশ্যটা। এক অমাবস্যার রাতে নাকি কবিরাজ নিজেও দেখেছিল সেই রহস্যময় আগুন। নভেম্বরের এই হালকা শীতলাগা কোমলতায়ও সে-কথা মনে পড়তেই ওর গা ঘামতে লাগলো। আর, তখনই হঠাৎ কী একটা বস্তু নাকি পিন্ড এসে ওর গা-এর উপর পড়লো। টাল সামলাতে না পেরে ও পড়ে গেল মাটিতে। পড়তে পড়তেই ভয়ে-আতংকে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো, ‘মাগো!’

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]