শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

ছত্রিশ

মাটিতে পড়েও শুদ্ধ টের পায় সেই জন্তু নাকি কী এখনো ওকে জাপটে ধরে আছে। তবে তৃতীয়া তিথির চাঁদের আলোয় বুঝতে সময় লাগে না, ওটা কোনো ভয়ংকর জীব নয়, জীবন্ত মানুষ! তাছাড়া ওকে জাপটে ধরে রেখেই যে চিৎকার করে ওঠেছে সেই মনুষ্য-কন্ঠ, ‘অই! অই! কেরা?’
গলা শুনে সাহস ফিরে পায় শুদ্ধ। জোছনার মায়াঘেরা ছায়ান্ধকারে ও দেখে যে ক্ষীণকায় সে-মানুষটা ওর চেয়েও খানিকটা লম্বা। বাবরি চুল। মুখে দাড়ি। কাঁধে গামছা ঝোলানো। বয়স ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না।
দুজনই গা-হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শুদ্ধ কাঁপা কন্ঠে নিজের পরিচয় দেয়, ‘ভাই! আমি ঢাকা থেকে আসছি! আমাকে চিনবেন না।’
এতো রাইতে?
হাঁ ভাই, বাসটা এই মাত্র নামালো। রাস্তায় অনেক দেরি করে ফেলছে। এখন তো কোনো ভ্যানরিক্সাই দেখছি না।
যাইবেন কোথায় আপনে?
উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলায়!
এখন কি খোলা পাইবেন?
আমি আগেও অনেক রাতে উঠছি। কেয়ারটেকার মালেক আমাকে চেনে।
চিনে তো… লোকটা এক মুহূর্তর জন্য কী ভাবলো, তারপর আচ্ছা! আসেন আমার সাথে- বলতে বলতে হাঁটা শুরু করলো হনহনিয়ে শহীদ আইয়ুব আলী সড়কের দিকে।
মানুষটার পেছনে হাঁটতে-হাঁটতে শুদ্ধর মনে খানিকটা স্বস্তি ফিরে আসে। যাক, এখন তো অন্তত ডাকবাংলোয় যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। ওখানে পৌঁছাতে পারলেই নিশ্চিন্ত। কেয়ারটেকার মালেকেরও কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়ায় অতোটা বিরক্ত হওয়ার কথা নয়, গতবার বিদায় নেওয়ার সময় ওকে ভালোই বখশিস দেওয়া হয়েছে। খুশিতে গদ গদ হয়ে বলেছিল, ‘যখন ইচ্ছা আসবেন স্যার। অসুবিধা নাই।’
মানুষটা এখন শহীদ আইয়ুব আলী সড়কে উঠেছে। হাতের বামপাশে বিডিআর ক্যাম্প দেখে ও ঠাহর করতে পারে। সেই সঙ্গে মনে স্বস্তি এলেও বানের জলে ভেসে আসা কচুরিপানার মতো দুশ্চিন্তার কাটা অহৈতকী খচ খচ বিঁধতে থাকে, ডাকবাংলোয় গেলে আশ্রয় মিলবে ভালো কথা, কিন্তু সহি-সালামতে সে-পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে তো? ঢ্যাঙা-পাতলা লোকটাকে শুরু থেকেই কেমন রহস্যময় লাগছে। এতো রাতে হঠাৎ কোথ থেকে উদয় হলো! আবার কী সুন্দর বলতে না বলতেই ওকে নিজে থেকেই পৌঁছে দেওয়ার ভার নিয়েছে! বাস থেকে যে নামেনি, ও একরকম নিশ্চিত। তাহলে? এলো কোথ থেকে? স্টেশনে কোনো দোকানপাটও তো খোলা দেখলো না। হয়তো বাসস্টেশনের ওপর দিয়ে অন্য কোথাও থেকে ফিরছিল। কেন ফিরছিল? রাত দু’টা আড়াইটার সময় কী এমন কাজ থাকতে পারে একজন মানুষের? আর, কেমন একটু যেন অস্বাভাবিকও লাগছে আচরণ! পা ফেলছে এতো লম্বা যে, তাল মেলানোটাই মুশকিল। কথাটথা না বলায় ভেতরের অস্বস্তি আরো বেশি উসকে উঠতে চাইছে। এই যে এতক্ষণ ধরে একসঙ্গে হাঁটছে, একটা কথা বলা তো দূরের কথা, লোকটার নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত পেল না।
শেষে শুদ্ধই শুরু করলো কথা, ‘ভাই। আপনে আমার জন্য কষ্ট করতেছেন।’ লোকটি কি কোনো উত্তর দিল নাকি দিল না? বুঝতে পারলো না শুদ্ধ। ও আবার কথা তুললো, ‘আপনি কি এই বাসেই আসলেন?’ নাহ, সাড়া নাই। কোনো সাড়া নাই মানুষটার। কেন? বোবা? বোবা হতে যাবে কোন দুঃখে? স্টেশনে তো কথা বলেছিল, বেশ খানিকক্ষণ কথা বলেছে। নাকি তখন বলেই নি কথা, ও-ই ভুল শুনেছে? না না, ভুল শুনবে কেন? ও স্পষ্ট শুনেছে লোকটি চিৎকার করে ওঠেছিল যখন গায়ের সঙ্গে গা’র ধাক্কা লাগলো। তাহলে এখন কেন নিশ্চুপ হয়ে আছে? নাকি কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছে না!
ওরা কখন শহীদ আইয়ুব আলী পাকা সড়ক ছেড়ে উপজেলা ডাকবাংলোর দিকের কাঁচা রাস্তায় নেমে এসেছিল, নিজেরাও বলতে পারবে না। ঘন গাছগাছালির কারণে এখানে অন্ধকার প্রগাঢ়। চাঁদটা বোধহয় মেঘ পরিবৃত হয়ে আছে। দূরে জোছনাও কেমন ফ্যাকাশে ম্যাড়মেড়ে। হঠাৎ এই ঘন গাছগাছালি ছায়া-ঘেরা অন্ধকারে শুদ্ধ দেখলো যে, সেই রহস্যময় পাকুড় গাছটা অন্ধকারকে আরো জমাট তামা বাঁধিয়ে ওর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আর, তখনই, হ্যাঁ, বিদ্যুচ্চমকের মতোই চোখে পড়লো- সামনের সেই মানুষটা হঠাৎ হাঁটা ফেলে পিছনমুখী ঘুরে দাঁড়িয়েছে! ওর চেহারাটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বিকট- চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে আগুনের গোলা। সমস্ত শরীর হাতপা শিথিল হয়ে আসে। মাথার ভেতরটা ওর কেমন চক্কর মেরে উঠে। নিজেকে আর কিছুতেই সামলাতে না পারে না। মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় মাটিতে।
লোকটা ওকে টেনে তোলে দাঁড় করায়। সজোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, ‘কি হইছে আপনার? ডরাইছেন?’
তখন তখনই শুদ্ধর হুঁশ ফিরে। ও দেখে যে সেই লোকটি যাকে ও মনে করেছিল অশরীরী কিছু, গভীর যত্নে ওকে আগলে ধরে আছে। ফিসফিস করে বলছে, ‘চলেন হাঁটি। জায়গাটা ভালো না!’ কথাটা শুনেই সমস্ত ভয়ডর আপনা থেকেই মিলিয়ে যায়। যাক এ-লোকটি অন্তত ভয়ের কারণ নয়। প্রেতাত্মা-ফ্রেতাত্মা বা ভূতটুত হলে নিজেই সরে যাওয়ার কথাটা এভাবে ঘনিষ্ঠ স্বরে বলতো না। বলতো আয় তোকে চিবিয়ে খাই! ও-মানুষটার হাত শক্ত করে ধরে রেখে জোরে জোরে পা চালায়। এতক্ষণে যেন মানুষটাও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠলো, ‘তেঁতুলিয়ায় আসছেন কেন? বেড়াইতে?’
এবার শুদ্ধ চুপ। কী উত্তর দেবে সহসা ভেবে পায় না? কী উত্তরই বা দেওয়ার আছে ওর? কেন এসেছে তেঁতুলিয়ায়, ও নিজেও কী তা ভালো করে জানে? যদি বলে মহানন্দার ডাকে এসেছি। কেমন শোনাবে কথাটা? আপনাদের মহানন্দা আমাকে ডাকে! বার বার ডাকে! আমি বুকের ভেতর ওর কলরোল শুনতে পাই। আমাকে ডাকে ওপারের কুয়াশামগ্ন দার্জিলিংয়ের পর্বতমালা! ডাকে হিমালয়ের মেঘছোঁয়া হাওয়া! এসব বললে নিশ্চয়ই মানুষটা ওকে পাগলটাগল বা এ রকম গোছেরই কিছু একটা ঠাওরাতে পারে! আরেকটি যে কারণ আছে, যা বড় গভীর আর সংগোপনের, তা কি ও কখনো মুখ ফুটে বলতে পারবে, না বলা সম্ভব? নিজেই নিজের ভেতরের মুগ্ধতার আবেশে বুদ হয়ে রইলো। আহা! আবার যদি ফিরে আসতো গোধুলির সেই কণেদেখা আলো? সন্ধ্যার অনিন্দ্য স্বর্গীয় ক্ষণ!
লোকটি আবারো জানতে চায় শুদ্ধর তেঁতুলিয়ায় আসার কারণ, আগমনের হেতু। ওর সাদামাটা উত্তর, ‘এই ছোটখাটো একটা কাজ ছিল!’ ভাগ্য ভালো যে মানুষটা ঘাটায় না, জানতে চায় না কী সেই কাজ! ঘাটালে যে কী রেখে কী বলতো! গুছিয়ে মিথ্যে বলার অভ্যাস ওর একদম নেই।
উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোর গেটের কাছে পৌঁছুতেই যেন প্রাণ ফিরে পেল শুদ্ধ। যাক! সমস্ত ক্লান্তি এখনই একটু পরই বিছানার নরম চাদরে ঢেলে দেওয়া যাবে। ভেতর থেকে তালা দেওয়া লোহার গেটটার সামনে দাঁড়িয়ে ও সজোরে ডেকে উঠলো, ‘মালেক ভাই! মালেক ভাই! ও মালেক ভাই!’
মালেক ভাইয়ের সাড়া নেই। সেটাই স্বাভাবিক। রাত আড়াইটে তিনটের সময়ই সম্ভবত মানুষের ঘুম সবচেয়ে নিবিড় হয়, গভীরে পৌঁছায়। তবু শুদ্ধ অনেক অনেকক্ষণ ধরে আবদুল মালেককে ডাকে, ডাকতে থাকে গলা ছেড়ে। সঙ্গের মানুষটাও ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরো উঁচু স্বরে ডেকে যেতে লাগলো। এত ডাকাডাকির পরও যখন কাজ হলো না, তখনই মানুষটা, সেই ঢ্যাঙা-পাতলা মানুষটা হঠাৎই এক কান্ড ঘটিয়ে বসলো। হুট করেই দেয়াল টপকানো শুরু করলো, হাতে-পায়ে খামচে খামচে, বেশ অভ্যস্ত ভঙ্গিতে। দেখতে না দেখতেই দেয়াল টপকিয়ে ও ভেতরে চলে গেল। শুদ্ধ ভাবতেই পারেনি যে মানুষটা ওর জন্য এতোটা সিরিয়াস হয়ে উঠবে। ভেতরে ভেতরে ও সংকোচিতই বোধ করে। সংকোচে মরীয়া হয়ে উঠে। তবু পেছন থেকে তাগিদ দেয়, ‘বইলেন ঢাকা থেকে শুদ্ধ সাহেব এসেছেন। শুদ্ধ! শুদ্ধ!’
দশ পনেরো মিনিট পরই মানুষটা ফিরে আসে একা। সেই দেয়াল টপকিয়েই। ফিরে এসে জানায়, ‘মালেক গেট খুলবো না। ডাকবাংলা নাকি এখন বন্ধ। কাউকে রাখার পারমিশন নাই।’

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]