শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

সাঁইত্রিশ.

ডাকবাংলোয় থাকার পারমিশন নাই? কী বলে মানুষটা! শুদ্ধ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেন? হঠাৎ ডাকবাংলোয় থাকার পারমিশন বন্ধ হবে কেন? ও-তো এখানে আগেও আরো চার-পাঁচবার থেকে গেছে। কেয়ারটেকার আবদুল মালেক একবার শুধু বলেছিল, ঢাকা থেকে অফিসার এলে রুম ছেড়ে দিতে হবে। তো, সেবার আর অফিসার আসেনি ঢাকা থেকে। ও তিনচারদিন নির্বিঘ্নেই কাটিয়ে যেতে পেরেছিল। আজ তবে এ কেমন আচরণ আবদুল মালেকের! একবার নিজেও তো আসতে পারতো! ভালোমন্দ সব বলতে পারতো খুলে! প্রতিবার তো তাই আসে! ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে নিজেই সামনে এসে দাঁড়ায়। আজ কেন এলো না? নাকি মানুষটা ওর পরিচয়ই জানাতে পারেনি মালেককে! জানালে হয়তো ঠিকই আসতো। ওর সঙ্গে তো এখন দেওয়া-নেওয়ার একটা ভালোই বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গেছে! ভাড়া মেটানোর পাশাপাশি বখশিশও কি কম দিয়েছে? গতবার তো হাত ভরে দিল তিন’শো টাকা! বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে দীর্ঘঃশ্বাস। এখন ও করবেটা কী! কোথায় যাবে এই গভীর রাতে!
জোছনাভেজা হিমেল ঠান্ডায় দুশ্চিন্তায় নিভতে নিভতেই হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠলো শুদ্ধ। আচ্ছা! চার-পাঁচ মিনিটের ব্যবধানেই তো আর একটু সামনেই সরকারি আরেকটি নতুন ডাকবাংলো রয়েছে। শেষবার যখন এসেছিল, কবিরাজ ওকে এই ডাকবাংলো ছাড়িয়ে ওখানে ওঠাতে চেয়েছিল- ওটা আরো স্ট্যান্ডার্ড বলে। জোর করে ওকে দেখিয়েও এনেছিল। সত্যিই স্ট্যান্ডার্ড! ঝকঝকে নতুন টাইলস, বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, রুমও বড়, সবচেয়ে বড় কথা অ্যাটাচড বাথ আছে। ভালোই লেগেছিল ওর। তবু এ ডাকবাংলো ছাড়েনি সেবার, এটা ছেড়ে নতুনটাতে ওঠেনি, কারণ এখানে বেশ কয়েকবার থেকেছে। আবদুল মালেক প্রায় আপন মানুষের মতোই আগলে রাখে ওকে। তাছাড়া বেশ কমফোর্ট লাগে। মনে হয় যেন নিজের জায়গায় এসেছে! এখন দেখো সে-ডাকবাংলো থেকেই লাথি খেয়ে বেরিয়ে যেতে হলো! হ্যাঁ, লাথি খাওয়াই তো! রীতিমতো ওষ্ঠা খাওয়া। ও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কাছে জানতে চায়, ‘ভাই, এদিকে না আরেকটা সরকারি ডাকবাংলো আছে?’
‘হ। আসেন আমার সাথে!’ মানুষটার মধ্যে যেন উৎসাহের কমতি নেই, নেই সামান্য বিরক্তিও। তবু মনে মনে লজ্জা বোধ করে শুদ্ধ। অহেতুক অন্য একজন মানুষকে রাতদুপুরের পথে পথে ঘোরানুটা কোনো কাজের কথা নয়।
নিবিড় গাছপালার ছায়াঘেরা শিশিরভেজা মাঠের পর মাঠ দিয়ে মানুষটা ওকে নিয়ে চলে থপ থপ পায়ে। আশেপাশে সবজির টালা, গাছগুলো জোছনার আলোয় কেমন উদভ্রান্তের মতো মুখ করে আছে। যেন ওর দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় নেই কারো এমনই একটা বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা। দুশ্চিন্তার দুলুনিটা মাথা থেকে বেয়ে বেয়ে ঘাড়ে, ঘাড় থেকে বুকে, বুক থেকে সারা শরীরে নেমে আসে, শুদ্ধ টের পায়, যদি এখানেও না মেলে থাকার একটুকু জায়গা!
নতুন ডাকবাংলোর সামনে গিয়ে আরো বেশি হতাশ হতে হলো। আগেরটায় তো তবু একজন আবদুল মালেক ছিল, এখানে কথা বলারও কাউকে পাওয়া গেল না। অনেক অনেকক্ষণ ডেকে ডেকে কারো সাড়া না পেয়ে চুপচাপ শুধু শুধু দাঁড়িয়ে রইলো শুদ্ধ। ভাগ্য ভালো যে এ-মানুষটিকে পাওয়া গিয়েছিল, তা নইলে আজ কী হতো! ভেবে ভেবে গা শিউরে উঠলো! মানুষটা যেন ওই আকাশের তৃতীয়া তিথির চাঁদটার মতোই আলো জ্বালিয়ে রেখেছে! কালি অন্ধকার রাত হলে তো ও এখানে ডাকবাংলো থেকে ডাকবাংলোয় হাঁটার সাহসই পেত না! মানুষটা ওকে একা ফেলে যেতে পারছে না। অথচ প্রচ্ছন্নভাবে বিদায়েরও একটা ইঙ্গিত যেন ওর কন্ঠস্বওে এই এতোক্ষণে বেজে ওঠলো, ‘বাসা তো পাইলেন না, কী করবেন এখন?’
মানুষটার প্রশ্নের ঘায়েই যেন হঠাৎ শুদ্ধ নিজের মনেই বলে উঠলো খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টায়, ‘আচ্ছা কবিরাজ ভাইয়ের বাড়ি চেনেন? ভ্যান চালায়। আমাকে বলছিল, তার নাম বললেই তেঁতুলিয়ার সব মানুষ তাকে চিনতে পারবে!’
‘চিনবো না ক্যানো। আমাদের বাড়ির সাইডেই তো ওর বাড়ি!’
শুদ্ধ যেন নতুন করে আরেকবার সাহস ফিরে পায়, ‘চলেন। কবিরাজের বাড়ি যাই।’
‘আমাকে তো ওখান দিয়েই যেতে হবে। চলেন।’ মানুষটাও সমান উৎসাহী।
টালা, জাংলাপথ ঘেষে ওরা দুজন আবারো শহীদ আইয়ুব আলী সড়কে উঠলো। সড়ক ধরে হাঁটতে লাগলো পুরনো বাজারের দিকে। শুদ্ধ নীরবে অনুসরণ করে মানুষটাকে। এসব পথঘাট ওর অচেনা নয়। কবিরাজের বাড়িতে না গেলে কী হবে, তেঁতুলিয়ার সব রাস্তাঘাট যাকে বলে ওর ঝাড়া মুখস্থ! একবার তো আর আসেনি! পথঘাট চেনার পাশাপাশি কবিরাজের সঙ্গেও গড়ে ওঠেছে একটা অন্তরঙ্গ গাঢ় সম্পর্ক। আজ থেকে চার বছর আগে ও যখন তৃতীয়বারের মতো এলো তেঁতুলিয়ায়, সে-সময়ই একদিন পুরানা বাজারে মহানন্দার তীরের রাস্তায় সাত-সকালে ওর সঙ্গে দেখা। সেদিন সকালে নদীর তীরে তীরে হাঁটতে হাঁটতে অবশ ক্লান্ত শুদ্ধ কবিরাজের খালি ভ্যান দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, ‘ভাই! যাবেন?’ ‘কোথায়?’ জানতে চেয়েছিল ছোটোখাটো মানুষটা।
শুদ্ধ তখন কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গার নাম বলতে পারেনি। একবার বলেছিল ডাকবাংলোয়, আরেকবার বলেছিল বাজারের কোনো একটা হোটেলে নিয়ে চলেন। বাজারের হোটেলে নাস্তা-খাওয়া শেষ হতেই বলেছিল মহানন্দার তীর-ছোঁয়া বাংলাবান্ধার রাস্তা ধরে জিরো পয়েন্টের দিকে যেতে।
আসলে সেদিন ও পুড়ছিল, একলা একা তেঁতুলিয়ার ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার অগ্নিকুন্ডে। কবিরাজ সেই গনগনে একাকীত্বের দহন থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। মহানন্দার তীরে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল ওপারের মহা রহস্যময় অদৃশ্য পাহাড়গুলোর সামনে। সত্যমিথ্যে কত গল্প, মিথ, ইতিহাস, ভূতের কাহিনি, জীনের কিসসা! সময়গুলো ওর ভরে উঠেছিল মনোরম। তারপর সে-যাত্রায় যতদিন ও তেঁতুলিয়ায় থেকেছে কবিরাজ-ই ছায়া হয়ে ছিল। পুরো তেঁতুলিয়া থানাটাই ওর ভ্যানে ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে। বাংলাবান্ধা থেকে দেবনগর, সালবাহান থেকে ভোজনপুর, বুড়াবুড়ি- কোনো জায়গাই বাদ রাখেনি। এরপর, বছর বছর যতবারই এসেছে, সাত-সকালেই কবিরাজ ভাইকে আগেভাগেই খুঁজে বের করেছিল তেঁতুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে। সারা মুখে বলিরেখা, ছোটখাঁটো সাইজের মানুষটাও যেন ওকে দেখে নতুন জীবন পেয়েছে। যতদিন শুদ্ধ থেকেছে তেঁতুলিয়ায়, অন্য কোনো খেপ নেয়নি। শুদ্ধও যাবার সময় উপযুক্ত প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করেনি। কেমন একটা আত্মার বন্ধনই অনুভব করেছে দুজন দুজনের জন্য। সেই কবিরাজভাই এখন এই গভীর রাতে ওকে দেখলে কী ভাববে, কে জানে!
রাস্তা থেকে কবিরাজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে দূর-সীমান্তে চোখে পড়ে আলোর রোশনাই। জোছনায় চোখে পড়ে মহানন্দা নদী তীরবর্তী ঘন বাঁশঝাড়ও। মানুষটার পিছে পিছে শুদ্ধ কবিরাজের উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। একপাশে ছোট্ট রান্নাঘর। আর দক্ষিণপাশে দোচালা একটা ছনে ছাওয়া ঘর। বারান্দাটা উঠোনের প্রায় সমান সমান। দরাজাটা কাঠের। জোছনাময় প্রকৃতির সঙ্গে যেন অদ্ভুতভাবে মিশে আছে বাড়িটা। খুব বেশিক্ষণ ডাকতে হলো না। সেই মানুষটাই ডাকছিল গলা টেনে টেনে, ‘কবিরাজ। ও কবিরাজ! কবিরাজ রে!’ চার-পাঁচবারের ডাকাডাকিতেই ভেতর থেকে সাড়া এলো, ‘অই! ক্যারা?’
‘আমি শাহাব্দি। খোল্। ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে!’
মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল কবিরাজ। ছোটখাটো সেই মানুষটা অন্ধকারে শুদ্ধকে দেখে প্রথমে যেন ঠিক ঠাহর করতে পারলো না। নাকি কল্পনাতেও ছিল না যে প্রায় মাঝরাতে আগের দেখা ভ্যানের কোনো এক প্যাসেঞ্জার চলে আসতে পারে ওর বাড়ি! বোকার মতো শুধু শুধু বোবা-বিস্ময়ে হে হে করতে লাগলো।
শুদ্ধ সঙ্গে থাকা ম্যাচের একটা কাঠি জ্বালিয়ে নিজের মুখের উপর ধরতেই বিস্ময়ে আনন্দে কবিরাজের চিৎকার, ‘ও ভাই! আপনে? এতো রাতে কেমন করে আসলেন?’ বিস্ময় যেন কাটতেই চায় না ওর। ততক্ষণে কবিরাজের বউবাচ্চাও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কবিরাজ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো, ‘অই, একটা চিয়ার এনে দে তো রে!’ কী করতে কী করবে দিশেহারা অবস্থা। কবিরাজের মেয়েই হবে বোধ হয়, ঘর থেকে দৌড়ে চেয়ার এনে দুয়ারের মাঝখানে পেতে দেয়। শুদ্ধ চেয়ারে বসতেই শাহাব্দি বিদায় নিতে চাইলো। কারই বা ভালো লাগে মাঝরাতে ঘুম রেখে অন্যের বাড়িতে বেহুদা দাঁড়িয়ে থাকতে!
শাহাব্দি চলে যেতেই এক মুহূর্ত আর দেরি করলো না শুদ্ধ। মাঝরাতেই খুলে বসলো ব্যাগ। ইচ্ছে ছিল ঢাকা থেকে বয়ে আনা উপহারগুলো ফিরে যাবার সময় কবিরাজের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু এখন এই আকস্মিকভাবে ওর বাড়িতে চলে আসায় যাদের জন্য উপহার, ওদের হাতে তুলে দেয়ার লোভ ও কিছুতেই সামলাতে পারলো না। প্রথমেই কবিরাজের বউয়ের হাতে তুলে দিল শাড়ি। রোজার ঈদের জাকাতের শাড়ি, তখনই রেখে দিয়েছিল, দুইমাস আগের কথা সেটা। এরপর বাচ্চার হাতে ধরিয়ে দিল শার্ট, পাঞ্জাবি, কবিরাজকে দিল শার্ট আর লুঙ্গি। মেয়েটিকে এক পিস কাপড়, সালোয়ার বা কামিজ যা খুশি বানিয়ে নেবে। অন্ধকারও যেন ওদের খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো। কবিরাজের ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গেই ড্রেস পরে ফেললো এই রাতের আঁধারেও। মাপটা ঠিক হয় না। একটু বড় বড়। তাতে কী। অনেকদিন পরতে পারবে। শুদ্ধ একটু বড় দেখেই এনেছে।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]