শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

আটত্রিশ.
শুদ্ধর বুক থেকে কখন দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সরে গিয়েছিল! এই প্রথম ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকভরে শ্বাস নেয়। চাঁদ তো আছেই। মাঝরাতের ঝকঝকে পরিষ্কার স্বচ্ছ আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ তারাও ফুটে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ পাড়া-বেড়ানি মেয়ের মতো টই টই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সীমান্তের দিকের আকাশ অস্বাভাবিক আলোয় উজ্জ্বল। তখনো চোখে পড়েছিল কবিরাজের বাড়িতে ঢোকার মুখে। মনে হচ্ছে যেন স্টেডিয়ামের বাতি জ্বলছে। ব্যাপার কি? কিসের অতো আলো-প্রশ্নটা যখন মনে গুঞ্জরিত হচ্ছিল, তখনই কবিরাজ জানায়, ‘ভাই, অরা তো বর্ডারের চাইরপাশে সারারাইত লাইট জ্বালিয়ে রাখে। কিয়ের যে লাইট। এত্ত পাওয়ার! একটা পিপড়া গেলেও দেখা যায়। ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও জ্বলে। কোনো সময়ই দেখি অগো কারেন্ট যায় না।’ এইভাবে গল্প জমে উঠে, সীমান্তের, সীমান্ত পারের মানুষের, গরু চালান কীভাবে হয়, কীভাবে আসে অবৈধ পণ্য। এ প্রসঙ্গেই উঠে এলো শাহাব্দির কথা, কবিরাজ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো, ‘ভাই আপনে শাহাব্দিরে কেমনে পাইলেন?’
শুদ্ধ বললো, ‘আরে আমি কি আর শাহাবুদ্দিরে পাইছি নাকি! রাস্তাই না শাহাবুদ্দিরে জুটাইয়া দিছে। উনারে না পাইলে যে আমার অবস্থা কী হতো! আপনার বাড়িতেই তো আসতে পারতাম না।’
‘ভাই! শাহাব্দি কইলাম ডেঞ্জারাস! গরুর চোরাচালানি করে। জিএমবির লোকজনের সাথে ওঠবস! হুম!’
‘বলেন কি!’
‘আমি তো আপনার সঙ্গে অকে দেখে চিন্তা করতেছি, কেমনে কী হইল! এইসব মানুষের সাথে ভাই বেশি মেলামেশা করা ভালো না।’
শুদ্ধ এসব কথা শুনে আগেই তব্দা মেরে বসেছিল, ঢোক গিলে বললো, ‘লোকটা কিন্তু আমার উপকারই করেছে!’
‘অগো আবার উপকার!’
গল্পে গল্পে এভাবেই সময় পার হতে থাকে, আর চোখে ঘুম নেমে আসে শুদ্ধর, চোখ ভরা ঘুম। এমন ঘুম যে ওর আর ঠিকমতো বসে থাকতেও ইচ্ছে করে না। মাঝে মধ্যেই টাল সামলাতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে পড়ে যায়। অথচ কবিরাজের এসব দিকে খেয়াল নেই। ও কি আজ শুদ্ধকে ঘুমানোর কথা বলবেই না নাকি? এ-কথা সে-কথা কত কথা ওর। শুধু ঘুমের কথাই যেন হারিয়ে ফেলেছে। শেষে আর থাকতে না-পেরে শুদ্ধই তুললো কথাটা, ‘কবিরাজ ভাই, আপনে ঘুমাইবেন না?’
‘না ভাই, ঘুমাতে হবে না। সকালই তো হয়ে আসলো।’
ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গুণলো শুদ্ধ, বলে কী কবিরাজ! আজ ঘুমাতে হবে না! আরে ভাই, তুমি তো অর্ধেক রাত ঘুম কাবার করে রেখেছোই। তোমার ঘুমের দরকার না-ই হতে পারে। কিন্তু ভাই আমার তো আর না ঘুমালে চলছে না! মনে মনে গজ গজ করতে থাকে শুদ্ধ। সকাল হতে আরো প্রায় তিন সাড়ে তিন ঘণ্টা বাকি। এতক্ষণ ওকে এই শক্তপোক্ত কাঠের চেয়ারটার মধ্যে বসে থাকতে হবে? এবারের ট্যুর তো তাহলে কেঁচে যাবে দেখছি! রাতে একটু ঘুমাতে না পারলে দিনটাও ম্যাদম্যাদা যাবে। ওদিকে দেখো একটা দুটা মশা সেই কখন থেকে পায়ে চালিয়ে যাচ্ছে স্টিমরোলার। পা ব্যথায় জ্বলছে। শেষে আর না-থাকতে পেরে গাণ্ডুর মতো বলে বসলো, ‘কবিরাজ ভাই একটু যে ঘুমাতে হয়!’ কবিরাজ যেন ওর কথা শুনেও শুনলো না। নিশ্চুপ হয়ে রইলো। শুদ্ধ জোরে গলা কাশি দেয়। কাশি দিতে দিতেই বলে, একটু যে শোয়া দরকার ছিল! শুদ্ধর কন্ঠে যেন অনুনয় ঝরে। তবু কবিরাজের মুখে কথা নেই। থম মেরে বসেই থাকে।
শুদ্ধ অবশেষে দাঁড়িয়ে পড়লো। এক দুটা মশা যেন পায়ের রক্তের মধ্যে জন্মের মজা খুঁজে পেয়েছে। এক কামড়ে কারো পোষাচ্ছে না বুঝি। শুদ্ধ দুয়ার জুড়ে হাঁটে। পা আছড়াতে আছড়াতে হাঁটে। গোবর-লেপানো দুয়ার। জোছনায় ভাসছে। হেঁটে হেঁটেও তন্দ্রার ভাবটা ওর কাটতে চায় না। নিচু বারান্দায় ঝিম মেরে বসা কবিরাজের দিকে তাকিয়ে ও ভাবে, হলো কী মানুষটার? এমন করছে কেন? ও কি কোনো কারণে ঘরে জায়গা দিতে চাচ্ছে না? কী সেই কারণ? ঘরে স্থান সংকুলান নেই? নাকি ঘরে বউ আছে বলে পরপুরুষ ঢুকাতে চাইছে না! আরে আমাদের টাউনের বাড়িতেও তো হঠাৎ অতিথি এসে হাজির হয়। আমরা তাদেরকে তো নিজেদের ঘরের ভেতরেই থাকতে দিই। মাথা গোঁজাগুঁজি করে হলেও তো কাটিয়ে দেই একসঙ্গে। আর, তোমার তো বাবা বিশাল গ্রাম, নাইবা রইলো তোমার ঘরে বারান্দা, মেঝে তো আছে! ঘরে রাখতে না চাও, মেঝের মধ্যেই না হয় কোনোমতো একটা পাটিটাটি বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থাটা করে দিলেই পারো! রাতটা কেটে যাক! যার উদ্দেশে মনে মনে এইসব ক্ষেদ, অভিমান, উপদেশ-পরামর্শ- সে তখন কাঁচুমাচু হয়ে মাথা গুঁজে রেখেছে দু’ হাঁটুর মাঝখানে।
কতক্ষণ দুয়ারে হেঁটে-দাঁড়িয়ে এলোমেলো সময় কাটিয়ে আবারো যখন বসতে যাবে সে-চেয়ারটায়, তখনই কবিরাজের বউ বেরিয়ে এলো ঘর থেকে, আগের সেই সংকোচটুকু এখন নেই, ‘ভাইরে ঘুমাইতে দিবেন না? ভাই ঘরে এসে একটু ঘুমায়ে নেন। আসেন!’
কবিরাজ সঙ্গে সঙ্গেই বউয়ের প্রস্তাব সসংকোচে নাকচ করে দেয়, ‘না না। ঘুমান লাগবো না! রাইত বেশি নাই।’ কবিরাজের বউয়ের কন্ঠে প্রতিবাদ, ‘হ। টাউইননা মানুষ। সারারাত বাইরে বসে থাকবো! আসেন ভাই। ঘরে আসেন।’
ঘরের মানুষটার এই ডাক উপেক্ষা করতে পারলো না শুদ্ধ। আসলে উপেক্ষা করার শক্তিও ওর নাই এ-মুহূর্তে। ও এখন একটু বিছানায় শরীরটা কোনোমতো ছেড়ে দিলেই বাচে। তাই কবিরাজের ডাকের তোয়াক্কা না করেই উঠে দাঁড়াল। ছোট্ট সেই দরোজা দিয়ে কোনোমতো মাথা নিচু করে ঢুকলো ঘরের ভেতর। আর ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই তীব্র একটা ঝাঝালো গন্ধ এসে নাকে ধক করে ধাক্কা মারলো। গন্ধটা শুদ্ধর চেনা। খুব খুব চেনা। শৈশব ওর গ্রামেই কেটেছে। বাড়িতে ছিল বিশাল এক গোয়াল-ঘর। সে ঘরটায় সময়ে-অসময়ে মাঝে মধ্যেই ঢুকে পড়তে হতো। কখনো খেলাচ্ছলে কখনো কাজেকর্মে। মা একটা গাভী পালতো। সে গাভীর দুধ বেচা টাকায় চলতো সংসার। আরো তিনচারটে গরুও পালতো মা। সেসব কারণে গোয়ালঘরে আসা-যাওয়াটা ছিল নিয়মিতই। তাছাড়া একটা পেয়ারা গাছের ডালপাতা ঝাঁকড়া হয়ে সেই গোয়ালঘরের টিনের চালার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ডালপালা। সেখানে গিয়ে সেই চালার ওপর পেয়ারা গাছের ছায়ায় সময়ে-অসময়ে বাড়ির পোলাপানগুলোকে নিয়ে বসে থাকতেও ভালো লাগতো।
শুদ্ধ সবিস্ময়ে দেখলো কবিরাজের পুরো ঘরের মেঝেতে খড় বিছানো। একপাশে দুটো গরু। একটা গাভী আর বাছুর। ওরাও মনে হয় এই গভীর রাতের অনাহুত অতিথির আগমনে জেগে উঠেছিল। অলস ভঙ্গিতে গাভীটা জাবর কাটছে। কবিরাজের ভাঙা গলা, যেন কোনো একটা কিছু অপরাধ করে ফেলেছে এমন ভঙ্গিতে বললো, ‘কী করুম ভাই। গরু চোরের যে কী অইত্যাচার! বাইরে রাখলেই চুরি হয়ে যায়। আপনের কী আর ঘুম হবে!’
‘না না। কোনো অসুবিধা নাই।’ শুদ্ধ কবিরাজের সংকোচ কাটানোর চেষ্টা করলো।
টিমটিম করে ঘরের এক কোণে একটা হারিকেন জ্বলছিল। একপাশে ছোট নড়বড়ে চৌকিতে বুঝি ওরা তিনজন ঘুমায়। সে সাইডে কবিরাজের ছেলের পাশে জায়গা দেয়া হলো শুদ্ধকে। কোনোমতো জুতা-মোজা খুলে যে শার্টপ্যান্ট গায়ে ছিল, তা পরেই বিছানায় গা গুজে দিল ও। চৌকির পাশ ঘেঁষেই বাঁশ দিয়ে আরেকটা বিছানার মতো জায়গা তৈরি করা। সেখানে কবিরাজ ওর বউকে নিয়ে শুলো। শোয়ার পরই শুরু হলো ওর আফসোস, ‘ইস ভাইরে যে আজ কী কষ্টের মধ্যে ফেললাম! শহরে কী সুন্দর দালানকোঠার মধ্যে থাকে।’ শুদ্ধ কবিরাজকে ধমকে থামিয়ে দেয়, ‘আপনে চুপ থাকেন তো। আমার সব রকম পরিবেশেই ঘুমানোর অভ্যেস আছে।’
সত্যিই কি আছে? জীবনে কখনো তুমি কুঁড়েঘরে রাত কাটিয়েছো? তোমার দৌড় তো বড়জোর টিনের ঘর পর্যন্ত। তারপরও টিনের ঘরে থাকতে তোমার কত রকমের বায়ানাক্কা। শীতের দিনে থাকলে অতিরিক্ত শীতে ঠান্ডা লেগে যায়, গরমের দিনে থাকলে অতিরিক্ত গরমেও ঠান্ডা লাগে। লাগবেই তো! তুমি যে শহরের দরদালানের নন্দপুতুল! সে কারণেই বুঝি শুয়ে ওর যেটুকু ঘুম চোখে ছিল, সেও উবে গেল। তাছাড়া গরুর শরীরের একটা গন্ধ তো ছিলই, যে-কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে- তারও তীব্র গন্ধ এসে মস্তিষ্ক-জুড়ে মোচড় মারছে। ওদিকে তো থামছেই না কবিরাজের সংকোচ সলজ্জতার বাহুল্য প্রকাশ, ‘ভাই! আপনারে কলাম আমি ভাই ঘরে শুতে বলি নাই। আপনার মনে হয় কষ্ট হইতেছে।’ শুদ্ধ আবারো মানুষটাকে ধমকিয়ে থামায়। তারপর ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাকি রাতটা ঘুম আর সহজে চোখে আসতেই চায় না। ও সাত পাঁচ ভাবে, সাত-পাঁচ ভেবে-ভেবে কাঁথা-বালিশের গন্ধটা গরুর চুনের গন্ধটা ভুলে যাওয়ার খেলায় মেতে ওঠে। এইভাবে ভুলে-থাকার নেশায় ডুবে যেতে যেতে কখন যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, বলতেও পারবে না। বাইরে রাতের অন্ধকার তখন ঘুম থেকে জেগে একটু একটু করে শুরু করেছে আলোর মুখ দেখতে, আবছা অস্পষ্ট।

ছবি:আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]