শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

ঊনচল্লিশ.

তারপর, জলজ্যান্ত এক সকাল কোন পাতাল বিহ্বলতায় বিসর্জন দিয়ে যখন ঘুম-মুচড়ানি ভেঙে জেগে উঠলো, ঘর ভরা কড়া আলো। বেলা কত হলো কে জানে? বুকের ভেতরটা কেমন ধক ধক করছে। ঘড়ি দেখে মন আরো বিষন্ন হয়ে উঠলো। সাড়ে দশটা বাজে। ভেবেছিল রোদ ওঠার আগে আগেই প্রথম আলোয় একবার আফরিনদের বাড়ির সামনের সেই রাস্তাটায় হেঁটে আসবে। যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায় বা সামনে পড়ে কনে-আলোয় ভাসা সেই মেয়েটা? তা তো হলোই না, এখন দেখো, থাকার জায়গাটা নিয়েও ঠানঠাহরে থাকার জো নেই! কীভাবে থাকে! কাল রাতের বেলা দু-দুটো ডাকবাংলোর কেয়ারটেকারই যে রকম আচরণ করলো! শুদ্ধ লাফিয়ে বিছানা ছাড়ে!
মানুষগুলো সব গেল কোথায়? কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। মনে হচ্ছে দুনিয়ায় ও একা। বিরান কারবালার শোকস্তব্ধতা। দম কেমন বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তাছাড়া গরুটা বাইরে নিয়ে গেলে কী হবে, সেটার গায়ের গন্ধ, পুরনো কাঁথার স্যাঁতসেতে গন্ধের ধাক্কা যুগপৎ যেন হঠাৎ করেই আবার প্রবল হয়ে ওঠলো। ওরা যে কীভাবে এ-ঘরের ভেতর বাস করে, কে জানে! মানুষ বোধ হয় অভ্যাসের দাস। গরু নিয়ে ঘরে থাকতে থাকতে হয়তো গরুর শরীরে যে গন্ধ আছে সেটা বোঝার ঘ্রাণশক্তিই ওরা হারিয়ে ফেলেছে! তা নইলে তো দিনের পর দিন গরুর সঙ্গে থাকা সম্ভব হতো না! কাল রাতে যে কোথায় মোজাটা রাখলো! বহু কষ্ট করে খুঁজেটুজে চৌকোর তলা থেকে উদ্ধার করতে হলো সেই কালো দুটো কাপড়ের দলা। জুতোটা কোনোমতো পায়ে চাপিয়ে ব্যাগ হাতে নিয়ে অস্থির ভঙ্গিতে বাইরে ছুটে এসেই দেখলো, দুয়ারে পাটি বিছিয়ে একসঙ্গে জবুথবু হয়ে বসে আছে কবিরাজ, ওর বউ এবং পাঁচ ছ-বছরের ছেলেটা। ওর হাতে ব্যাগ দেখে সবাই একসঙ্গে রই রই করে উঠলো। কবিরাজের বউ গলা উচিয়ে বললো, ভাই কোথায় যাচ্ছেন? হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে নিন।
শুদ্ধ তাকাল মহিলার দিকে। দারিদ্র্যের চিহ্ন লেগে রয়েছে সর্বাঙ্গ জুড়ে, শাড়িটা বহু পুরনো বোঝাই যাচ্ছে, চুলে বোধহয় নিয়মিত তেল পড়ে না; অথচ মনের ভেতরটায় এতোটুকু কৃপণতা নেই, দৈন্যের সামান্য ছায়া পর্যন্ত নেই। কাল রাতে উনিই তো সব সংকোচ ঝেটে তাড়িয়ে ওকে ঘরে তুলে নিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিল। ও ভেবে রেখেছিল সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে যাবে এ-বাড়ি ছেড়ে। নাস্তা সারবে তেঁতুলিয়া বাজারে। কবিরাজের আচরণটা ঠিক ভালো লাগেনি। ঘরে নিয়ে ওর একটু শোয়ার ব্যবস্থা করে দিতে মনের ভেতর ওর সে কি দোলাচল অস্বস্তি! অথচ কবিরাজের বউটা ঠিক উলটো। মহিলার দিকে তাকিয়ে ও আর বাইরের দিকে পা বাড়াতে পারলো না। ব্যাগটা পাটির এক কোণে রেখে সেখানেই বসে পড়লো। কবিরাজের বউয়ের যে সবদিকেই খেয়াল আছে, তার আবারো প্রমাণ পেল শুদ্ধ। স্বামীকে ধমকিয়ে উঠিয়ে তাগিদ দিল, ভাই রে নিমের ডাল এনে দিন, দাঁত মাজবো। বাথরুম দেখিয়ে দিন! কবিরাজ শুধু জানে হে হে করতে। তাই করতে করতে বউয়ের নির্দেশ তামিল করলো।
বেশ বড় বড় দুটো পরোটা বানিয়ে রেখেছে কবিরাজের বউ, সঙ্গে ডিমভাজা, আলুভাজি। তৃপ্তি নিয়েই খেল শুদ্ধ, খেতে খেতে অনুভব করলো, একটা গোসল দিয়ে খেতে পারলে বুঝি আরো বেশি ভালো লাগতো!
নাস্তা খাওয়া শেষ হতেই আবারো শুরু হলো দুজনের সেই ভ্যানযাত্রা। একদিন যে-যাত্রায় ওরা চষে বেড়িয়েছে তেঁতুলিয়া থানার পুরো গ্রাম, বাংলাবান্ধার জিরো পয়েন্ট থেকে সালবাহান-ভোজনপুর! খুঁজেছে আফরিনকে দেখার এক টুকরো গোধুলি আলোর মুহূর্ত, অলস বসে সময় পার করেছে মহানন্দার তীরে তীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আজ সেই ভ্যানে ছুটছে কেবল একটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে।
কিন্তু প্রথমেই ধাক্কা। সরকারি ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার সোজা জানিয়ে দিল, সারা দেশে একযোগে জিএমবি-র বোমাবাজির ঘটনার পর প্রশাসন ডাকবাংলো অতিথিদের জন্য আপাতত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। যাতে জঙ্গীরা কোথাও আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। পরবর্তী নির্দেশ দেয়া না পর্যন্ত এখানে কাউকে থাকতে দেওয়ার পারমিশন নাই।
শুদ্ধ মধ্য-বয়স্ক লোকটার হাতপা ধরলো, ‘আংকেল! আমাকে দেখে কি আপনার সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে? আপনি যদি থাকতে না দেন, আমি ভীষণ বিপদে পড়বো। আমাকে তাহলে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। তেঁতুলিয়ায় থাকা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’ লোকটির রুঢ় গলা, ‘আপনাকে থাকতে বলেছে কে? দিনের গাড়িতেই চলে যান। দেশের পরিস্থিতি যে কতটা খারাপ বুঝতে পারছেন না! যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো জায়গায় জিএমবি হামলা করতে পারে। আপনার তো এ সময়ে বের হওয়াই উচিত হয় নাই।’
আমি ঘটনার ভয়াবহতা ঠিক অনুধাবন করতে পারিনি কেয়ারটেকার সাহেব। শুদ্ধর মনের ভেতর হলাহল বয়ে চলে। যেদিন সারা বাংলাদেশ জুড়ে একসঙ্গে বোমাবাজির ঘটনা ঘটলো আমার অস্তিত্বও প্রবলভাবে নড়ে উঠেছিল। আমি আমার দেশ, আমার মাটি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। তবু সেই উদ্বিগ্নতার ভেতরই ছুটে এসেছি বাংলার এই সবুজ প্রান্তরে, আমি একটা অ্যাড ফার্মে চাকরি করি, ক্রিয়েটিভ সেকশনে, সেটা ফেলে, স্বাচ্ছন্দ্য ফেলে, আমার মায়ের বাঁধন ফেলে, আমি ছুটে এসেছি মহানন্দার ডাকে। মহানন্দা আমাকে ডাকে, পদ্মা আমাকে ডাকে, যমুনা আমাকে ডাক দেয় মেঘনা আমাকে ডাক দেয়- আমি সেই ডাককে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারি না। না এসে কিছুতেই স্থির থাকতে পারি না। তখন শহরের ইট কাঠ রড সিমেন্টের জীবন বড় বেশি অসহনীয় হয়ে উঠে। রুঢ় কঠিন হৃদয়হীন মানুষগুলোর ভিড়ে ভাল্ লাগে না আর সময় কাটাতে! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, বন্ধ হয়ে আসে! আমি ছুটে আসি এখানে।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাটোয়ারি

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]