শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

চল্লিশ.

সরকারি ডাকবাংলো ছেড়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোর দিকে হেঁটে যেতে যেতে শুদ্ধ বাধে আটকে যাওয়া পানির ব্যর্থ স্রোতের মতো আপন ঘূর্ণাবর্তেই যেন নিজের সঙ্গে নিজে খাবি খেতে থাকে। আমি কি শুধু মহানন্দার ডাকেই ছুটে আসি? শুধু কি ওপারের কুয়াশামগ্ন দার্জিলিংয়ের পর্বতমালা, হিমালয়ের মেঘছোঁয়া হাওয়াই আমাকে টেনে নিয়ে আসে?
না না না, কেয়ারটেকার সাহেব! কখনো আপনাকে বলতে পারবো না সে-কথা, কাউকে না! আহা! আবার যদি ফিরে আসতো সেই অনন্য গোধূলি-মুহূর্তের কনেদেখা আলোর স্বর্গীয় ক্ষণ! আবার যদি চোখের সামনে ভেসে ওঠতো সেই অপার্থিব মুখচ্ছবি! বড় বিস্ময়কর বড় বিমুগ্ধকর সে-অভিজ্ঞতা! কী করে ভুলি! কখনোই যে ভোলা সম্ভব না। আহা! সেদিন যে কী মায়াময় হয়েছিল প্রকৃতি। নীল আকাশ আর সাদামেঘ ঈষৎ লাল, কমলা আর হলুদের আঁচড়ে রঙিন হয়ে উঠেছিল। আর সেই রঙিন আলোয় আফরিনকে মনে হয়েছিল অন্য কোনো গ্রহান্তরের! যেন এ পৃথিবীর কেউ নয়! সন্ধ্যাতারার কোন্ আলো এসে পড়েছিল ও-মুখে।
তখন কি আর ও জানতো সে-মুখটাই চিরদিনের জন্য দাগ কষে দেবে হৃদয়ে। কখনো কোনোদিনও ভোলা সম্ভব হবে না? জানতো কি, ও মুখ দেখার আকুলতায় বুকের ভেতর জমবে মেঘ, হবে বৃষ্টি- একটুও কি বুঝতে পেরেছিল! সেবার ঢাকা ফিরে আসার পর মেয়েটার মুখ বিশেষ করে গোধুলিলগ্নের কনে দেখা আলোর মুখচ্ছবিটা বারবারই মনে ফিরে ফিরে বাজতে লাগলো। কী যে ঐশ্বরিক আর রোমাঞ্চকর সে-অনুভূতি, যার জন্য বুঝি জীবনের আর সবকিছু দূরে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া যায়। সব মিথ্যে শুধু ও-মেয়েটিই সত্য, ওই মুহূর্তটাই সবচেয়ে দামী। আশ্চর্য যে, সে ঘটনার পর এতদিনেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আর কোনো মেয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেনি, উঠলোই না। মা কবে থেকে বিয়ের তাল উঠিয়েছে। শুদ্ধ শুধু সময়ের পর সময় চেয়ে নিয়েছে আর প্রতি-বছরই ঠিক একই মাসের একই দিনে ছুটে আসতে চেয়েছে এই তেঁতুলিয়া। সব সময় যে পেরেছে, তা না। আর যতবারই এসেছে এখানে, সন্ধ্যেবেলা তেঁতুলিয়া স্টেশন থেকে কবিরদের বাড়ির পথের দিকে আনমনে হেঁটেছে। না, সেই কণে দেখা আলোর মুহূর্ত যেমন আসেনি, সে আলোয় আফরিনের মুখটিকেও দেখা হয়নি আরেকবার।
আচ্ছা, আফরিনকে কি ও বিয়ে করতে চায়? ওকে পাওয়ার জন্যই কি বারবার ছুটে আসে এখানে? সম্ভবত না। শুদ্ধ টের পায়, আফরিনকে যদি ও পেয়েই যায়, তাহলে ওকে ঘিরে যে মনের ভেতর অদ্ভুত রোমাঞ্চকর জগত আছে, তা হারিয়ে যেতে পারে, দুর্লভ এই ঐশ্বর্যকে ও হারাতে চায় না, হারানোটা কোনোমতোই ঠিক হবে না, বরং তা ঝালিয়ে নিতেই যেন বারবার ওর ছুটে আসা।
না না। আমি তো আফরিনের আকর্ষণে এখানে আসি না। আমি আসি মহানন্দার টানে। মহানন্দার ডাক আমি শুনতে পাই। মহানন্দা আমাকে ডাকে। মাঝে-মধ্যেই ডাকে মহানন্দা! এখনো ডাকছে। মহানন্দাকে দেখার আকুলতায় শুদ্ধ ভেতরে-ভেতরে ছটফট করে। মনে হয় যেন একরাত নয়, এক সহস্র রাত হলো ও এখানে এসে পৌঁছেছে, অথচ মহানন্দার কূলে এখনো গা ভাসানো হলো না। কীভাবে ভাসাবে গা? থাকার জায়গায়ই তো হলো না। আগে একটা জায়গায় ওঠাটা জরুরি। তারপর একটা গোসল, থিতু হয়ে নেওয়া! সারাদিন সারারাতের জার্নির ধকল তো আছেই, ঘুমও তো ঠিকমতো হয়নি। এইসব ভাবনার ক্যাওয়াজে ক্যাওয়াজে শুদ্ধ কবিরাজের ভ্যানের পাশে হাঁটতে হাঁটতে উপজেলা ডাকবাংলোর গেটে অচিরেই পৌঁছে যায়।
এক দু-বার ডাকতেই ডাকবাংলোর বাইরে বেরিয়ে এলো কেয়ারটেকার আবদুল মালেক। শুকনো, কালো, বেটেখাটো ভারী গোঁফের সেই মানুষটা। এসেই শুদ্ধকে দেখে নীরস গলায় বললো, ‘ওহ! রাতে আপনে আসছিলেন?’ চেনা মানুষ হয়েও কেমন অচেনা ভাব। শুদ্ধর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নেয়। আক্ষেপের সুরে বলে, ‘রাতে কী যে কষ্ট পেয়েছি মালেক ভাই। আপনে আমাকে থাকতে দিলেন না!’
আবদুল মালেকও সেই আগের কেয়ারটেকারের সুরে সুর মিলায়, ‘আপনে আর বেড়ানোর টাইম পাইলেন না? তেঁতুলিয়ার যে কী অবস্থা জানেন না। বোমায় পুরা ছ্যারাব্যারা হয়ে গেছে। ডাহুক নদীর ব্রিজে কম পাওয়ারের বোমা ফাটছে? প্রশাসন থেকে আমাদেরকে নিষেধ করে দিয়েছে বাইরের লোকদেরকে না রাখতে। আপনাকে রাখলেই ভাই আমার চাকরি যাবে।’
‘কে জানবে বলেন? ওরা কি সব সময় চেক করতে আসে নাকি?’
‘কী যে বলেন! বাতাসের আগে খবর যাবে। এমনেই আমার চাকরির পিছনে লোক লাগছে।’
শুদ্ধ তবু হাল ছাড়লো না, ‘মালেক ভাই আপনে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? আপনার এখানে আমি ক’বার এসে থেকেছি, বলেন?’
আবদুল মালেক ততই কঠিন দেয়াল,‘ভাই! আপনাকে তো অবিশ্বাস করছি না। কিন্তু প্রশাসন থেকে আমাদেরকে কড়াভাবে নিষেধ করে দিছে ডাকবাংলোয় কাউকে জায়গা না দিতে! বুঝতে পারছেন? মনে করেন আপনারও যদি কিছু একটা হয়ে যায়! জিএমবিরে তো বিশ্বাস নাই!’
কোনোভাবেই শুদ্ধ আবদুল মালেককে বোঝাতে না পেরে হতাশ বিক্ষুদ্ধ হয়ে কবিরাজের ভ্যানের ওপর শুয়ে পড়লো। ভাগ্যিস জায়গাটাতে কাঁঠাল গাছের ঘন ছায়া ছিল। ও সেই গাছের পাতার হিজিবিজিতে দৃষ্টি হারিয়ে আবদুল মালেককে ঘিরে অতীত স্মৃতিতে মাথা চাপড়ায়। ওর স্পষ্ট মনে আছে প্রথম যেদিন উঠেছিল এখানে এই উপজেলা ডাকবাংলোয়, প্রথম দিনের রাতের বেলায়ই নিজে থেকে খাওয়ার পানি রুমে এনে দিয়েছিল আবদুল মালেক। পানির জগ আর গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে দক্ষিণ দিকের জানালার দিকে তাকিয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল, জানালাটা খুইললেন না। চুরিটুরি হয়। শুদ্ধর আতংকিত মুখ দেখে আশ্বস্ত করেছিল, আমি জাইগাই থাকি। কোনো অসুবিধা নাই। আহা! প্রথম সাক্ষাতেই কতো আপন মনে হয়েছিল! অথচ!(চলবে)

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]