শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

একচল্লিশ.
সত্যি, তারপর থেকে যতোবারই এখানে এসে উঠেছে শুদ্ধ, এই উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয়, কোনো রকমেরই কোনো অসুবিধা বোধ করেনি কখনো। উলটো দিনের পর দিন সম্পর্ক আরো নিবিড় হওয়ায় জায়গাটাকে মনে হয়েছে নিজের মতো। মনে হয়েছে ও এখানে এলে আবদুল মালেক খুশিই হয়, ভালোভাবেই নেয় ব্যাপারটা। এর পরের বারই যখন এলো, স্পষ্ট মনে আছে শুদ্ধর, ওর সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা সারা হওয়ার পর, দুতলার রুমটায় প্রায় ওকে ঢোকাতে গিয়েও আবদুল মালেক অকৃত্রিম কন্ঠে বলে ওঠেছিল, এ রুমটা থাক ভাই! চলেন, আপনাকে ভিআইপি রুমটা দেই, বলে দুতলার বদলে তিনতলার রুমটায় থাকতে দিয়েছিল। তবে রুমে ঢুকানোর আগেই বলে নিয়েছিল, এই রুমে ভাই ভিআইপি থাকে, তাই কাউরে দিই না। পাবলিকরে দেওয়া নিষেধ! হঠাৎ যদি কোনো ভিআইপি চলে আসে আপনাকে কিন্তু রুমটা ছেড়ে দিতে হবে। নাইলে আমি বিপদে পড়ে যাব।
আরে আপনাকে কি আমি বিপদে ফেলব নাকি? শুদ্ধও ওকে আশ্বস্ত করেছিল যে, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে। 
তিনতলার সে-রুমে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গিয়েছিল শুদ্ধর। মনের মতোই জায়গা বটে। বাইরের দিকটায় খোলা বারান্দা। অন্ধকারেও ভেসে ওঠেছিল বাইরের ঝাপড়া গাছপালা মনোরম প্রকৃতি। মনে হয়েছিল জায়গাটা বুঝি ওর চেনা, খুব কাছের। রুমটাও ছিল বেশ পরিচ্ছন্ন, ধোয়ামুছা। নোংরা নেই বললেই চলে। দুদিকে দুটো জানালা। দুটোই খোলা। ফুরফুরে হাওয়া আসছিল বাইরে থেকে। রুমের ভেতর সোফা চেয়ার আলনা। অ্যাটাচ বাথ। তারপর যতোবার এসেছে তেঁতুলিয়া, ও রুমেই থেকেছে। ডাকবাংলো ছেড়ে যাওয়ার সময় শুদ্ধও আবদুল মালেককে খুশি করেছে। এমন খুশি যেন আবদুল মালেক সবসময় উঠতে বসতে মনে করে ওকে, যেন অপেক্ষায় থাকে শুদ্ধ আবার কবে আসবে তেঁতুলিয়া! কবে আবার হাতে তুলে দেবে বখশিস!
এতো আন্তরিকতা দেখানো সেই মানুষটা কিনা পুরাই পাল্টি মারলো? কী রকম অদ্ভুত শীতল আচরণ! যেন আজই প্রথম দেখছে! অথচ এই তুমিই তো পরে আরেকবার যখন এলাম, দুদিন-দু’রাত নিজের বউয়ের হাতের রান্না পর্যন্ত খাইয়েছিলে! কি খাওয়াওনি? শুধু কি রান্না! পিঠা পর্যন্ত দিয়েছিলে খেতে! মনে নাই সেসব কথা তোমার আবদুল মালেক, মনে নাই? ওফ! সেবার যে কী ঝামেলাতেই না পড়তে হয়েছিল! তেঁতুলিয়া এসে দেখে হোটেল-রেস্তোরাঁ সব বন্ধ। যেমন বন্ধ থাকে ঈদের সময় সবকিছু। ব্যাপার কিরে ভাই, কী ব্যাপার? সকালে হোটেলে নাস্তা করতে গিয়ে গোলকধাঁধায় পড়ে জানতে চেয়েছিল সেখানকার এক ভদ্রলোকের কাছে, হোটেল বন্ধ কেন ভাই? লোকটা সকৌতুকেই জানিয়েছিল, সারা বাংলাদেশে ঈদ হয় দুইটা আর তেঁতুলিয়ায় ভাই ঈদ হয় তিনটা।
যেমন? অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল শুদ্ধ। তখনই লোকটা জানাল, শবে বরাতের সময় তেঁতুলিয়ায় থাকে পুরা ঈদের আমেজ। মুখে কেউ বলে না ঠিকই ঈদ, কিন্তু ব্যাপারস্যাপার যা ঘটে, তা ঈদের চেয়ে কম না। বাড়িতে ভালোমন্দ রান্না হবে। স্কুল-কলেজ দোকানপাট সব বন্ধ থাকবে। কেউ কেউ নতুন পোশাকও গায় দেয়। সারারাত জেগে নামাজ পড়ে। তিনচার দিন কেউ কোনো কাজ-কামে বের হয় না।
বলেন কি? তাহলে কি তিনচারদিন হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে? কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিল শুদ্ধ। আরো বেশিও থাকতে পারে। লোকটা দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে দিয়ে বলেছিল। হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল শুদ্ধ লোকটার কথা শুনে। ওতো আরো বেছে বেছে শবে বরাতের সময়ই এসেছে। ভেবেছে অফিস ছুটির সময়টা বেড়িয়ে কাজে লাগিয়ে আসবে! এখানে এসে দেখি আরো উলটো। এখন যাবে কোথায়, খাবে কি? ডাকবাংলোয় ফিরে এসে ওর খাবারদাবারের দুশ্চিন্তার কথাটা কেয়ারটেকার আবদুল মালেকের সঙ্গে শেয়ার করতেই, আবদুল মালেক ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিয়েছিল ওর সব উদ্বেগ উৎকন্ঠা, আরে ভাই! আমি কি মরে গেছে নাকি? এতো চিন্তা করেন ক্যানো? আমার বাসায় তো রান্না হয়ই তাই না। গরিব মানুষ যা খাই একসঙ্গে মিলেমিশে খাব!
কথা শুনে ভারি আশ্বস্ত হয়েছিল শুদ্ধ। তারপর তিনবেলা নিজের হাতে এনে গরমভাত খাইয়েছে। শবে বরাতের রুটিও। একরাতে ঢুকেছিল পিঠা হাতে নিয়ে। তখন গভীর রাত। স্পষ্ট মনে আছে শুদ্ধর। দরজায় টোকা শুনে ও ঘাবড়ে গিয়েছিল। ভয়ে ভয়ে খুলে দেখে পিঠা হাতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবুদল মালেক, অহনও জাইগা আছেন ভাই? নেন পিঠা খান।
সেদিনই যেন মানুষটার সঙ্গে বেড়ে গিয়েছিল হৃদ্যতা। শুদ্ধ এতোরাতেও ঘুমায় না দেখে, কী হলো- দেখি তো একটু খোঁজ নিয়ে, এমনই একটা কৌতূহল ওকে এতো রাতে টেনে এনেছিল সেই তিনতলার রুমটায়। কথায় কথায় বেরিয়ে এসেছিল দুজনের মধ্যে একটা জায়গায় অদ্ভুত মিলের কথাও। হ্যাঁ, সেদিন হাতে পিঠা তুলে দিতে দিতে জানতে চেয়েছিল মানুষটা, ভাই আপনে কি সাংবাদিক?
কেন বলেন তো? শুদ্ধ উলটো জানতে চেয়েছিল।
এই যে এত বইপত্র, খাতা কলম দেখতেছি।
হেসে উঠেছিল শুদ্ধ। এসব কি খালি সাংবাদিকেরই থাকে। বই ছাড়া আমি থাকতে পারি না ভাই। বসেন না! শুদ্ধ আবদুল মালেককে তাড়া দিয়েছিল বসার জন্য।
পড়ালেখাঅলা মানুষ আমার ভালো লাগে। বসতে বসতেই বলেছিল আবদুল মালেক।
কেন?
তখনই জানিয়েছিল মানুষটা, আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, ভাই। খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা!
মনে মনে ভারি চমৎকৃত হয়েছিল শুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে পড়ালেখাঅলা মানুষের একটা সংশ্রব খুঁজে পেয়ে। সত্যিই আলোর সঙ্গে পড়ালেখার সঙ্গে সত্যের সঙ্গে শুদ্ধতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা যেন শক্ত কোনো এক বন্ধনে জড়ানো! মুক্তিযোদ্ধা কখনো অন্ধকারের প্রতীক হতে পারে না! অসম্ভব!
উনি কি আছেন?
নারে ভাই। স্বাধীনের সময়ই মারা গেছে। রাজাকাররা চক্রান্ত করে মেরে ফেলছিল।
এই তেঁতুলিয়াতেই?
না না। আমার বাড়িতো এই জায়গায় না। রংপুর। এই জায়গায় আমি খালি ডিউটি করি। ভাই আরেকটা পিঠা খান। খাইতে খাইতে কথা বলি।
শুদ্ধ খেয়েছিল আরেকটা পিঠা। আবদুল মালেকের অনুরোধ ঠেলতে পারে নি। পিঠাটার কি নাম ও ভুলে গেছে। চালের গুঁড়ি দিয়ে বানানো। ভেতরে হালকা মিষ্টি। পিঠা খেতে খেতে অনেকদিন পর অনুভব করেছিল, বাবার জন্য বুকের ভিতরটায় চিনচিনে একটা ব্যথা হচ্ছে। বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যত বড় না মুক্তিযোদ্ধা, তারচেয়ে বেশি ছিলেন দেশপ্রেমিক। দেশকে নাকি জান দিয়ে ভালবাসতেন। জান দিয়েই সেটা দেখিয়ে গেছেন। দুঃখ শুধু একটাই! স্বাধীনতার যুদ্ধে যাকে বেনিয়াদের হাতে প্রাণ দিতে হয় নি, জান দিতে হয়েছে তাকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। কিন্তু বাবার লাশটা ওরা দেয়নি। কোথায় রেখেছিল বাবার লাশ, কোথায়? দেশের কোন্ প্রান্তে? যেন বাবার লাশটা সারা দেশের মাটির সঙ্গে লুপ্ত হয়ে আছে মিশে আছে। গাছগুলো মাটির সে রসে বেড়ে বেড়ে বাবা হয়ে ওঠে, ছায়া হয়ে ওঠে। মাথার ওপরের গাছের সে-ছায়া আপন সত্তায় ধারণ করে শুদ্ধ হঠাৎ কবিরাজের ভ্যান থেকে উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে এগোয় আবদুল মালেকের দিকে। কাছে গিয়ে মানুষটার কাঁধে হাত রেখে গাঢ় গলায় শুধু বলে, আসি মালেক ভাই। দোয়া কইরেন।
আবদুল মালেক কোনো কথা বলে না। বোবার মতো ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]