শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

বেয়াল্লিশ.
আবদুল মালেককে কোনোভাবেই বোঝাতে না পেরে ভেতরে-ভেতরে চরমভাবে ভেঙে পড়া শুদ্ধ কবিরাজের ভ্যানে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে উদাস গলায় বললো, ‘আমি কিসসু জানি না কবিরাজ ভাই, আপনি কেমনে কী করবেন! তেঁতুলিয়ায় আমাকে দু’টা রাত থাকতেই হবে। এতদূর থেকে এসেছি।’ কবিরাজ ভ্যানের প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে সাহস যোগায়, ‘চিন্তা কইরেন না ছে ভাই। ব্যবস্থা একটা হবেই!’ অতীতে বহুবার কবিরাজের এমন ধরনের সাহস-যোগানো কথায় সত্যি সত্যি শুদ্ধ উজ্জীবিত হতো, কিন্তু আজ কোনো ভরসা খুঁজে পাচ্ছে না। ওর কন্ঠে হাল ছেড়ে দেওয়া সুর, ‘চেনা মানুষই জায়গা দিল না, অচেনা মানুষরা তো কথাই বলতে চাইবে না।’ 
কবিরাজ আইলের পাশ-ঘেঁষা মাঠ দিয়ে চালাচ্ছিল ভ্যান, ও ওঠবে শহীদ আইয়ুব আলী সড়কে; তাই আশেপাশে কোনোদিকে তাকাতে পারছিল না। গভীর মনোযোগ দিয়ে প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে দার্শনিক হয়ে উঠলো, ‘ভাই আপনার চেয়ে পর ভালো আর পরের চেয়ে জগত! দুনিয়ার রীতিই তো তাই। দেখবেন কোন জায়গা থেকে অচিন মানুষ বার হয়ে আসবে, বলবে থাকেন ভাই আমার এখানেই থাকেন যতোদিন মন চায়! উপায় একটা হবেই ভাই! কোনোকিছু থেমে থাকে না!
এই যে কবিরাজ ভাই তার ফর্মে ফিরে আসতে শুরু করেছে। কথায় কথায় গান, দার্শনিকতা ফলানো। টোটকা একেকটা কথা, দাওয়াই, কবিরাজের দাওয়াই। মন ক্ষণকালের জন্য হলেও ভালো হয়ে যায়। সেজন্যই বুঝি প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই মানুষটাকে ওর ভালো লেগে গিয়েছিল! এমন ভালো লাগা, যখনই আসে ও তেঁতুলিয়া, বাস স্টেশন থেকে আগে খুঁজে নেয় ওকে! পরিচয়টাও হয়েছিল এমন সময়ে, যখন ওর দিন রেবা-বিক্ষত। না থাকতে পারে শহরে, না শান্তি পায় এখানে এসেও। তবু ও কোন্ অজ্ঞাতকারণে বুক বোঝাই টন টন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ছুটে আসে তেঁতুলিয়া। এখানে এসে এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়।
একদিন তেমনই সেই মনপোড়া দিনে আনমনে হেঁটে বেড়াচ্ছিল মহানন্দার তীর ঘেষে ঘেষে, পুরান বাজারের দিক থেকে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের দিকটায় যাচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ স্বচ্ছ টলটলে জল দেখে ওর ইচ্ছে করলো মহানন্দার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে! গোসল করে হৃদয়ের সব পাপতাপ ধুয়ে ফেলতে। তখন মনে হতো হিমালয় থেকে নিঃসৃত হয়ে আসা এ-জল পবিত্র- এর ভেতর থাকতে পারে অপার্থিব কিছু। জীবন আবার শুদ্ধাচারে নতুন হয়ে উঠবে। জলে ঝাঁপ দেওয়ার ইচ্ছেটাকে কিছুতেই আর বাগ মানাতে পারলো না। নীল আকাশ সাদা মেঘ নদীর বুকে নেমে এসে ওকে যেন আরো বেশি প্ররোচিত করছিল। ও চারপাশটা ঝটিতি একবার দেখে নিয়ে, গায়ের শার্ট গেঞ্জি খুলে, প্যান্ট খুলে শুধুমাত্র আন্ডারওয়ার পরে নেমে গেল নদীতে। ওর পায়ের সাড়া পেয়ে নীরব নিস্তব্ধ নদী যেন অনেক অনেকদিন পর ঘুমভাঙা চোখ নিয়ে কথা বলে ওঠেছিল। যেন সোনার কাঠির স্পর্শ পেয়ে বন্দী রাজকুমারী ফিরে পেয়েছিল জ্ঞান! শুদ্ধ হাঁটু পানি ভেঙে যেই আরো একটু গভীরে নামতে যাবে, অমনি পেছন থেকে ভেসে ওঠেছিল পৌঢ় কন্ঠ, ভুুলেও এ কাম কইরেন না ভাই। নামলেই গুলি। মহানন্দায় এখন নামা নিষেধ। দেখেন না একটা পিঁপড়াও নাই নদীর মধ্যে।
এতক্ষণ খেয়াল করেনি শুদ্ধ। এবার চোখে পড়লো, এখান থেকে পূবে পশ্চিমে নদীর মধ্যে যতদূর চোখ যায় জনপ্রাণীর অস্তিত্ব নেই কোথাও। নদী খা খা করছে। এমনকি মাছের কোনো ঘাই পর্যন্ত চোখে পড়লো না। ও পেছনে ফিরে দাঁড়িয়েছিল। পারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটখাটো মানুষটা হাতের ইশারায় ওকে টানে ওঠার ইঙ্গিত করতে করতে আবারো বলে ওঠেছিল, মহানন্দার এক ইঞ্চিও কি খালি থাকে কন…মানুষে মানুষে পুরা নদী ভরে যায়। কিলবিল করে মানুষ। সেই ভোর রাইতেরতে শুরু হয় পাথর তোলা, সন্ধ্যার পরও চলে। যত পাথর তত টাকা। সে পাথর উঠানো আজ প্রায় সাতমাস হয়ে গেল বন্ধ। নদীর মইধ্যে বিএসএফরা লাশ ফালাইছে। তারপরেরতে মহানন্দায় কেউ নামার সাহস পায় না। বিএসএফরা বন্দুক লইয়া পজিশন নিয়া থাকে…
তীরে পৌঁছাতে পৌছাতে শুদ্ধ জানতে চেয়েছিল, পজিশন নিয়া থাকে? কই, দেখছি না তো?
কী যে কন ভাই? দেখছেন না?…ঐ যে বিএসএফ… ঐ যে দেখতাছেন… অইখানে অগো ক্যাম্প আছে… মুড়িখাওয়া ক্যাম্প…ঐ যে ঐ যে হাঁটতেছে…
হ্যাঁ, চোখে পড়েছিল বটে শুদ্ধর। অস্পষ্ট আবছায়া। বিএসএফ-এর চলাফেরা। ও আস্তে আস্তে মহানন্দা থেকে উঠে গিয়েছিল ওপরে। মনে পড়ে গিয়েছিল আগেরদিন তীরনইহাটের মানুষগুলোর কথা। পাথর ওঠাতে না পেরে কেমন ছটফট করছিল এক একজন মানুষ। পাথর ওঠানো ছাড়া আর কোনো কাজ জানা নেই কারো। অন্য কোনো কাজ যে করবে, তারো নেই সন্ধান। না খেয়েও থাকতে হয়েছে কাউকে কাউকে। ঈদে নাকি সেমাই পর্যন্ত রাধতে পারেনি কোনো কোনো বাড়ি। নতুন পোশাক কেনা তো দূরের কথা!
পাশেই একটা পাথরের চাইয়ের ওপর বসতে বসতে ও অচেনা মানুষটাকেও বসতে বলেছিল। বসেনি মানুষটা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুরু করেছিল মহানন্দার গুণকীর্তন! ওর কাছে মহানন্দার গল্প শুনে মনে হয়েছিল, মহানন্দার বুকে কত মানুষের যে কত কথা জমা! কত মানুষের হলাহল-ঘাম! সে শুধু জানে মহানন্দা আর মহানন্দার জল। এক সময় এপার-ওপার দুপারের মানুষই নামতো এ-নদীমধ্যে, এক সঙ্গে। গোসলে গোসলে মেতে ওঠতো ওরা একই আনন্দের অংশীদার হয়ে। বিনিময় করতো পরস্পর সুখ-দুঃখ। মহানন্দার জলে ধুয়ে যেতো হিন্দু মুসলিম ভারত বাংলাদেশের আলাদা পরিচয়। মন লেনদেনও যে হতো না তা নয়, মহানন্দায় গোসল করতে এসে তো দু-দেশের দুই তরুণ তরুণীর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। প্রেমের কাছে মিথ্যে হয়ে গেছে বর্ডারের সীমানা। এদেশের এক মুসলিম মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ওদেশের এক হিন্দু ছেলের সঙ্গে। সুখেই আছে ওরা। দু-পরিবারের মধ্যে এখনও যাওয়া-আসা হয়।
মহানন্দার কথা বলতে বলতে নিজের কথাও বলেছিল মানুষটা। জানিয়েছিল ওর নাম কবিরাজ!
না না কবিরাজি ওর পেশা না। তবে ফয়ফকিরান্তির কাজ টুকটাক ও জানে। জানলেও সে-পেশায় ঢুকেনি। বাবাই নাম রেখেছিল কবিরাজ। ও ভ্যান চালায়। সারা তেঁতুলিয়া ভ্যান নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের মালসামানা টানে, মানুষও টানে! নতুন নতুন কতো মানুষের সঙ্গে যে ওর পরিচয় হয়! গল্প আর ফুরাতেই চাইছিল না। এক সময় শুদ্ধর তাড়াতেই গল্প ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধা সড়কের একপাশে রেখে আসা ভ্যানে গিয়ে অপেক্ষা করেছিল শুদ্ধর জন্য। শুভ্যান রেখে নেমে এসেছিল ও নদীপারে। সে ভ্যানেই পরে জুটে গিয়েছিল সারাদিনের জন্য। সারাদিন দুজন ভজনপুরের পথে পথে ঘুরেছে!

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]