শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

সাত

না, বেশিক্ষণ আত্মমগ্ন থাকতে পারেনি কবিতায়। লাইটের আলোয় ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছিল বলে নওরোজ বারবারই পিসপিস করছিল। দু-ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া মারামারি তখন নৈমত্তিক ব্যাপার! যে কোনো মুহূর্তেই ক্ষেপে তেড়ে আসতে পারে আদরে আদরে মাথায় ওঠা ধেড়ে গুণ্ডাটা। বাধ্য হয়েই একসময় লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল। শুয়েছে বটে। ঘুম আর আসে না। আশানিরাশার সে কেমন এক নেশাধরানো দোলদোলানি! এসব কি আসলেই প্রেম? ভালোবাসার প্রকাশ? এই যে সারাদিন রেবা যা করলো! নাকি এমনটাই ওর স্বভাব? ও যাদেরকে বন্ধু মনে করে, তাদের সঙ্গে ঠিক এমনভাবেই মেশে? এরকমই প্রাণোচ্ছল হয়? নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে কথা বলে অসংকোচে? তাহলে তো হলো না গো হলো না সই…প্রেম হলে তো খানিকটা লুকোচুরি থাকতে হবে, বাবা-মায়ের সামনে নিয়ে যেতেও থাকবে আড়ষ্টতা আর কিছুটা আবছা অস্পষ্টতা কিছুটা বা রহস্যময়তা।
সেসব কি আদৌ ছিল? কী ছিল না? তাহলে ও বললো কেন যে তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না? কেন ওর কবিতা পড়ার জন্য অমন আকুলতা দেখালো। তাছাড়া যখন কথা বলছিল, তখন রেবার চোখেমুখের ভাষায় এক্সপ্রেশনে ও একটা আলাদা কিছু দেখেছে! একটু অন্যরকম আবিলতা!
রেবাকে ঘিরে যেমন ওর মুগ্ধতা আছে, ওকে ঘিরেও বোধহয় রেবারও সে-রকম অনুভূতি ছুঁইয়ে থাকবে! মাঝেমধ্যে লজ্জার রক্তিমা আভার উচ্ছ্বাস খেলা করছিল ওর নিটোল গালে, কপোলতলে! আর সেটা এই মাঝ-গভীর রাতে চোখের সামনে জ্বাজল্যমান হতেই ও আর অন্ধকার-ঘরে শুয়ে থাকতে পারলো না। কেননা ওর খুব চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে করছিল সারা গ্রাম মাথায় চড়িয়ে জোরে গান গেয়ে উঠতে। শেষে আর থাকতে না পেরে ভূতপেত্নীর সব উপকথা ভুলে মাঝরাত্রির সকল ভীরুতা কাটিয়ে ছুটে গিয়েছিল বাইরে। বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে খোলা খলায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সত্যি সত্যি ও গান গেয়ে উঠেছিল প্রাণের সব তরঙ্গ ছেড়েছুঁড়ে। এমন গান জীবনে কখনো গায়নি। এমন হৃৎস্পন্দনে নাচেনিও আগে। আর খুব ইচ্ছে করছিল সিগারেট টানতে, খুব ইচ্ছে করছিল- ভী-ষ-ণ, পাগলের মতো।
পরদিনই সাতসকালে কবিতার খাতাটা নিয়ে ছুটে গিয়েছিল রেবাদের বাসায়। রেবা বাইন্ডিং খাতাটা হাত থেকে টেনে নিয়ে বুদ হয়েছিল ওর কবিতায়। একধ্যানে বসে বসে একটু পর পর পাতা উল্টাচ্ছিল। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি হচ্ছিল শুদ্ধর। কী না ছাইপাশ লেখে মাথামুণ্ড! এভাবে সামনাসামনি না পড়লেই কী হতো না! ও বাঁধাও দিয়েছিল, পরে পড়ো পরে পড়ো।
কবিতার খাতা থেকে মুখ ওঠায়নি রেবা। শুধু হাতের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিয়েছে। শেষে কী আর করবে শুদ্ধ! বুকশেলফ থেকে একটা পুরনো ঈদসংখ্যা বের করে পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে সময় পার করেছে। মাঝখানে ঘরের বাইরে এসে স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের কৃষ্ণচুড়া রাধাচূড়ার ছায়ানির্জন পথে অলস পায়চারিও করে এসেছে। একেবারে শেষপ্রান্তে সীমান্ত দেয়ালের গা জুড়ে কে যেন মাধবীলতা বুনেছিল। মাধবীলতার ঝাড় ঝাঁকড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অনেকদূর অবধি! হাস্নাহেনা, বকুলফুলের গাছও ছিল আশপাশ জুড়ে। মাধবীলতার ছোট ছোট বেগুনি ফুল থেকে ছড়াচ্ছিল হালকা মিষ্টি সুগন্ধ। চুপচাপ দুটো ফুল ছিড়ে হাতে নিয়ে ফিরে এসেছিল রুমে। তারপরও দেখো, নিমগ্নতা কী সহজে ভাঙে রেবার! দুপুর যখন ঘনিয়ে এলো, বাইরের রোদের তাপ বেয়াড়া হয়ে ঘরেও জুড়লো আষ্টেপৃষ্ঠে, তখনই কবিতার খাতা থেকে মুখ উঠালো রেবা, গালের টোলে পৃথিবীকে অদ্ভুত দুলিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো, কাকে নিয়ে লিখেছো এমন সুন্দর সুন্দর সব কবিতা?
অই অতটুকু বয়সেও শুদ্ধ বুঝেছিল, সব কথা মুখে বলতে নেই, সব কথা মুখে বললে কিছু কথা আছে, যার রস আর থাকে না, চুইয়ে পড়ে, অন্তসারশূন্য হয়ে যায়। ও শুধু এগিয়ে গিয়ে মাধবীলতা ফুল দুটো রেবার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে! রেবা ফুলদুটোসহ দুহাতের তালুয় চোখমুখ ঢেকে অনেক অনেকক্ষণ কী এক মগ্নতায় বুদ হয়ে বসেছিল!
আজ ভাবে শুদ্ধ, এই নিরেট ঠান্ডার নিস্তরঙ্গ সকালে, চন্দ্রার দিকে স্কুটারে যেতে যেতে আজ ভাবে, সেদিন যদি ও একটু সাহসী হতো পারতো! সাহসী হয়ে রেবার হাতদুটো গাঢ় আবেশে তুলে নিতে পারতো নিজের মুঠোয়, ছড়িয়ে দিতে পারতো উষ্ণতা, রেবার পাশে বসে ওর মাথাটা হেলিয়ে দিতে পারতো নিজের কাঁধে, তাহলে হয়তো… জীবনের গল্পটা অন্যরকমও হতে পারতো! তখন ঘরে কেউ ছিল না। বোধহয় বাসায়ও। এরকম গাঢ় হওয়ার সুযোগ ও অনেকবার পেয়েছে। প্রতিবারই নিজেকে প্রমাণ করেছে অসার অজ্ঞেয়। স্থাণুর মতো কেবল বসে থেকেছে মূঢ় হয়ে। সে-কারণেই কি ধীরে ধীরে ওর জীবন থেকে সরে গেল রেবা? নাকি অন্য কারণে?
সেদিনের সেই পদ্যকোরকে ভাসা পরদিনও চললো। তারও পরদিন। বস্তুত কলেজের ক্লাস শুরু না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিনই ওকে যেতে হয়েছে রেবাদের বাড়ি। শোনাতে হয়েছে এক একটি নতুন কবিতা! একদিন না গেলেই রেবা পরদিন আর কাছে আসতে চায়নি, এলেও গাল ফুলিয়ে রেখেছে, কথা বলতো না। কত কষ্ট করে যে ওর মান ভাঙাতে হতো, তাতে ঢেউয়ের তোড় হয়ে বাজতো ওর কোনো নতুন কবিতা। ওর কবিতার ভেতর দিয়ে যেন রেবা দেখতে চাইতো নিজের রূপ, নিজের ছবি, নিজের সত্তাকে।
তারপর যখন কলেজের ক্লাস শুরু হলো, এক মুহূর্তর জন্যও দুজনকে আলাদা করা যায়নি। অন্তত আলাদা থাকতে পারেনি রেবা। একসঙ্গে কলেজে যাওয়া-আসা করতো, লেকচার শুনতো, পেছনের বিশাল পুকুরটার বটতলায় বসে থাকতো! হ্যাঁ, কে কী ভাবতো তা নিয়ে কোনো পরোয়াই করতো না রেবা। আর সে-কারণেই বুঝি কলেজে ওদের জুটিটা মোটামুটি সবার কাছে মিথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, ওরা একজন আরেকজনকে ছাড়া চলতে পারে না। সবাই ধরেই নিয়েছিল ওরা মানিকজোড়! পৃথিবীতে এসেছেই একসঙ্গে বাঁচতে! একসঙ্গে থাকতে! কেমন স্বপ্নের ঘোরে কেটে গেল ওর কলেজ লাইফটা। সেই অতীতের দিকে তাকিয়ে শুদ্ধ আজ নিজের কাছে নিজেই বিস্ময়াভূত হয়ে স্কুটারের ভেতর বসে থাকে।
তখন রেবা এবং ও একজন আরেকজনের আত্মার স্পন্দন পর্যন্ত টের পেত। ভাবা যায়! কোথায় গেল সেসব দিন। তারপর পরীক্ষা দিল একসঙ্গে, রেজাল্ট বেরুল। কত স্বপ্নের আঁকিজুকিতে ভাসতে ভাসতে দুজন একসঙ্গে অ্যাডমিশন নিতে গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কী সুন্দর! দুই জায়গাতেই টিকে গেল দুজনই- কত স্বচ্ছন্দে, কত আনন্দে। সবদিক ভেবেচিন্তে ওরা বেছে নিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই। শুদ্ধ বাংলা আর রেবা হিস্ট্রি।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা