শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

তেতাল্লিশ.
শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক দিয়ে ভ্যানটা তেঁতুলিয়া বাস-স্টেশনের মোড়ে পৌঁছাতেই, ভ্যান থামিয়ে কবিরাজ পিছন ফিরে শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বুজবুজি হেসে বললো, ‘শুদ্ধভাই মির্জাবাড়ি যাইবেন না?’ এই গুরুতর দু:শ্চিন্তার মুহূর্তেও, যখন থাকার জায়গা এখনো থির হলো না, মির্জাবাড়ির কথা শুনে শুদ্ধর মনে চনমনে রোমাঞ্চের হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। আফরিনের কথাটা দেখছি মনে আছে কবিরাজের। মনে না থেকে পারে, শুদ্ধর জীবনে যেন একজন মনের মানুষ আসে, তার জন্য কতো আকুলতা-ব্যাকুলতা ওর, কতো চেষ্টা-চরিত্র! সে বোধ হয় তেঁতুলিয়ার তৃতীয় না চতুর্থ যাত্রার ঘটনা, ততোদিনে কবিরাজের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই গাঢ় হয়েছে, সুখদুঃখের অনেক কথাই জেনে গেছে দুজন দুজনার, তেঁতুলিয়া থেকে যখন ঢাকায় ফিরে যাবে শুদ্ধ, বাসে ওঠার আগে ওর হাতে একটা পত্রিকার কাগজ-মোড়ানো তেলের শিশি ধরিয়ে দিল কবিরাজ।
‘কি’ কৌতূহলী হয়ে ও জানতে চাইতেই কবিরাজ আশপাশটা দেখে নিয়ে ফিসফিস করে ওঠেছিল, খাঁটি সইষার তেল ভাই, পড়া। যে মাইয়াটা আপনারে ছেড়ে গেছে ভাই, তার নাম নিতে নিতে মুখে মেখে ঘর থেকে বার হবেন। তারপর তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন। দেখবেন খালি কী হয়!
কী হবে কবিরাজ ভাই? ও তখন ভেতরে-ভেতরে বেশ কৌতুক বোধ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করা ছেলে বলে কথা! সেই মাইয়া আপনার দিক থেকে ভাই মুখ ফিরাইতে পারবো না। ওর ক্ষমতাই হইব না মুখ ফিরাইয়া নেওয়ার! এতো কড়া জিনিস! খালি তামশা দেখবেন!
হো হো করে হেসে ওঠেছিল শুদ্ধ। কবিরাজ বিব্রত হয়ে বলে উঠেছিল, হেলা কইরেন না ভাই, হেলা করলে কিন্তু কাজ হবে না। বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস অবশ্য করেছিল শুদ্ধ, অন্তত বিশ্বাস করার একটা ভঙ্গিমা ছড়িয়ে দিয়েছিল চোখেমুখে। কবিরাজকে খুশি করার জন্য। তবে এক ফোটাও ব্যবহার করেনি সে তেল, ফেলেও দেয়নি। ঘরের ভেতর অনেকদিন রাখা ছিল। কেন রেখেছিল সে-কারণও নিজের কাছে অজানা। ওকে চুপ থাকতে দেখে আবারো তাড়া দিয়ে উঠলো কবিরাজ, কি ভাই, যাব নাকি মির্জাবাড়ির দিকে, কইলেন না তো?
‘আরে না! এখনো একটা থাকার জায়গাই পেলাম না আপনাদের তেঁতুলিয়ায়। কীভাবে যাবো মির্জাবাড়ি! দেখি সন্ধ্যার সময় যদি সুযোগ হয়!’ কবিরাজের মুখে খুশির ভাব উপচে পড়লো,‘ওহ হো। মনেই ছেলো না, আপনার তো আবার এইটা সন্ধ্যাবেলার কেস!’ শুদ্ধর কন্ঠে আক্ষেপ, ‘সন্ধ্যা এইবার আসলেই হয়! চোখেমুখে তো খালি অন্ধকার দেখতেছি!’
তাইলে এখন কোনদিকে যাব, ভাই? জানতে চায় কবিরাজ।
কোনদিকে আবার। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের ডাকবাংলোটা ছাড়া আর তো কোথাও কিছু দেখছি না। ওখানে কিন্তু রুম না পেলে মুশকিলে পড়ে যাবো কবিরাজ ভাই।
কবিরাজ প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে আবারো অভয় দেয়, হয়ে যাবে ভাই, চিন্তা কইরেন না!
ভ্যানটা চলছে বাংলাবান্ধামুখী সড়কের দিকে। পথের এ-প্রান্তটা বড়ো ভালো লাগে শুদ্ধর। বিশেষ করে শরতে। নীল আকাশে, গাঢ় নীলের ভেতর যখন শুভ্রসাদা মেঘ খেলা করে, সে ব্যাকগ্রাউন্ডে রাস্তার দুপাশের ছিপছিপে শরীরের ইউক্যালিপটাস গাছগুলো ঝলমলিয়ে উঠে। তখন মনেও কেমন রেশম কোমল ঝিলিক খেলে যায়। আজ অবশ্য আকাশ ঘোলা ঘোলা। কুয়াশামগ্ন। তবু মনের ভেতর আশার রোদ যেন কোথা থেকে আলো ছড়ায়। কোথাও না কোথাও থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়ে যাবে, যাবেই। কোনোকিছু ঠ্যাকে থাকে না। এ বিশ্বাস গমক মেরে উঠে। ও সেই চনমনে বোধ থেকেই যেন হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জানতে চায়, দিলবানুর সঙ্গে আজকাল দেখা-সাক্ষাৎ হয় না কবিরাজ ভাই?
ভ্যানের প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে কবিরাজ বললো, মাঝে মাঝে যে দেখাসাক্ষাৎ হয় না ভাই বুঝি কেমনে? এই তো কয়দিন আগে ভ্যান নিয়া দাওয়াত খেতে গেছিলাম শারিয়ালজোত। মনে করেন ক্ষেরের পালার কাছে ভ্যান রেখে খেতে বসছি। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ভ্যানের কাছে আইসাই শুনলাম ফোঁস ফোঁস আওয়াজ। কিরে আওয়াজ আসে কোথ থেকে। শেষে দেখি কি ভ্যানের সিটের নিচে একটা সাপ আরেকটারে প্যাঁচ দিয়া রাখছে। কালা কুচকুচা। আমি তো ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না। দৌড়াইয়া আইলাম পাঁচ হাত দূরে। মনে করেন দুইট্টা চাইট্টা মানুষ নিয়া যেই আওগাইয়া গেলাম, গিয়া দেখি কিয়ের সাপ কিয়ের কি? সিটের নিচে একটা পিপড়াও নাই।
কই গেল?
আল্লায় জানে!
সাপটা তাইলে কি?
বুঝলেন না?
না, কী বুঝবো!
আমারে ভয় দেখায়।
কেন, ভয় দেখাবে কেন?
অই যে বিয়া করি নাই।
কবিরাজের কথা শুনে আবারো ভেতর থেকে হাসি উপচে আসতে চায়। কিন্তু হাসে না শুদ্ধ, হাসলে কবিরাজ বিব্রত বোধ করবে। ও চুপ করে থাকে। অই যে ওকে পড়া তেল দিয়েছিল কবিরাজ, সে-সূত্র ধরেই বেরিয়ে এসেছিল দিলবানু। পরেরবার ও যখন আবারো আসলো তেঁতুলিয়ায় কবিরাজই জানতে চেয়েছিল, ভাই, তেলটা কি আপনে ব্যবহার করেছেন?
শুদ্ধ বানিয়ে বানিয়েই বলেছিল, হ্যাঁ, ভাই করছি।
কিছু টের পান নাই?
পাব না আবার! তেলটা মেখে বাইরে গেলেই দেখছি মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসে, কাছে আসতে চায়।
খুশি হয়ে ওঠেছিল কবিরাজ, খুব কড়া জিনিস ভাই। যে মাইয়া নাম নিয়া তেল মাখবেন, সে আপনার চুমা না খাইয়া কিছুতেই ছাড়ব না। তখনই শুদ্ধ জানতে চেয়েছিল, এই কড়া জিনিসটা কবিরাজ কোথা থেকে পেল, কীভাবে?
তাইলে তো ভাই বসতে হয়। বেরংয়ের পাশেই সেটা, বড় কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসতে বসতে কোরছার ভেতর থেক বিড়ির প্যাকটা বের করেছিল কবিরাজ, আর শুনিয়েছিল দিলবানুর কাহিনি।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]