শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

চুয়াল্লিশ.
‘ভাই গো ভাই, বিশ্বাস তো করবেন না, আমারে যে কী জ্বালানটাই না জ্বালাইছে দিলবানু! অর যন্ত্রণায় তো হেষে আমারে ঠাকুরগাঁই ছাড়তে হইছিলো।’ মনের দরজা খুলে দিয়েছিল কবিরাজ, আজো স্পষ্ট মনে আছে শুদ্ধর, বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে কত কথা যে বলছিল, ‘তখন ভাই থাকতাম ঠাঁকুরগায়। চাকরি করতাম শামসুল ইসলাম সাবের কোম্পানিতে। নানান রকম ব্যবসা ছিল মানুষটার। ইটাখোলা, লোহা-লক্কড়, ট্রাক বাস কতো কিছুর। টাকা-পয়সার কোনো অভাব ছিল না। আমি এমনেই মনে করেন ফুটফরমাস খাঁটতাম, দেইখা শুইনা রাখতাম অফিসটা। ম্যানেজার আবার ম্যানেজারও না। আমারে খুবই বিশ্বাস করতো! টাকা-পয়সা দামি দামি জিনিসপত্র সব আমার কাছে ছাইড়া দিছে। মনে করেন সেই অফিসের পাশেই একলা একলা একটা ঘরে থাকতাম। সেই ঘরেত্তেই ফুলবানু আমারে বাইর কইরা নিয়া যাইত। কইত্তে যে কই নিত তার কোনো খবর নাই। সারা রাইত আমারে অর কাছে শোয়াইয়া রাখতো। এইটা ওইটা খাওয়াইতো। অগো দ্যাশে পর্যন্ত নিছে।
অগো দেশ! অগো আবার দেশ আছে নাকি?
অরে সব্বোনাশ! কী যে বলেন ভাই! দ্যাশ আছে মাইনে! আমগোর চেয়েও মনে করেন দশ হাত বড়ো।
কেমন দেশ সেটা?
আমি তো আর বলতে পারবো না। নিতো তো ভাই অজ্ঞেন কইরা। মনে করেন ঘুমের মধ্যে। তারপরও স্মরণ হয়, একবার নিয়া গেল পুকুরের তলে…কী সুন্দর ঘরবাড়ি। কয়দিন যে রাখতো তার হিসাব নাই। ঠাকুরগাওয়ের এক রাইত মনে করেন অগো দেশের একশো রাইতের সমান। আমারে তো মাঝে মধ্যে কেউ খুঁইজাই পাইতো না। পাগলের মত হইয়া গেছিলাম। হেষে তো ঠাঁকুরগাওয়েরতে বাড়িতেই আইনা ফালাইল। আইনা জোর কইরা দিল বিয়া করাইয়া। মনে করেন ও আমারে বিয়া করতে নিষেধ করছিল। বলছিল, তুই যদি বিয়া না করস সারা জীবন আমারে পাশে পাবি। গেছে গা। বিয়ার পরই রাগ কইরা চইলা গেল। ভাইরে এমন রাগ! আর কি ভাঙে! অগো রাগ সহজে ভাঙে না।
কথার মাঝখানেই শুদ্ধ জানতে চেয়েছিল, আচ্ছা কবিরাজ ভাই, আপনে যে আমারে পড়া সরিষার তেল দিছেন, এটা কীভাবে দিলেন, দিলবানু তো আপনার কাছে নাই।
ভাই, সব গোমরই কি ভাঙন যায়, বলেন? অসুবিধা আছে। আর তেমন কিছু জানি না ভাই। টুকটাক ঝাঁড়ফুক। আল্লাহর রহমতে মানুষ আসে, উপকার পায়, এই সামান্য!
কি কি রোগের চিকিৎসা করেন?
রোগের কি ঠিক আছে- পেট ব্যথা, ব্যথা-বেদনা কত রকমের সমইস্যা। তারপর যেন প্রসঙ্গটা এড়াতে চাইছিল, চলেন ভাই উঠি। খিদায় পেটটা ধমকাইতেছে।
ভ্যান চালাতে চালাতে অবশ্য কবিরাজ ওর গোমর আর ধরে রাখতে পারেনি। ফাঁস করে দিয়েছিল নিজেই, মনে করেন, ও-ই যাইবার সময় আমারে কিছু দিয়া গেছে। কিন্তু এগুলা ভাইঙা খাইতে নিষেধ আছে। মাইনষের উপকার করতে দিছে। একটা পয়সাও নেয়ার হুকুম নাই। কেউ যদি খুৃশি হইয়া দেয়, সেইটা অন্য কথা। আমি তো কোনো সময়ই টাকা পয়সা নেই না। এই যে ভ্যান চালাই খাইটা খাই। আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি। মাঝে মধ্যে খালি দিলবানুর কথা মনে পড়ে। অরে আমি ধইরা রাখতে পারি নাই। কাউরে ধইরা রাখাটা ভাই খু-উব কঠিন।
সেইসব কথাগুলো মনে পড়ে যাওয়ায় শুদ্ধ ভেতরে ভেতরে বেশ পুলক অনুভব করে। কবিরাজকে খোঁচাতেই যেন আবারো তুললো দিলবানুর প্রসঙ্গ, যাক! দিলবানু আপনারে ভুলে নাই। এটা কিন্তু একটা বিশাল ব্যাপার কবিরাজ ভাই!
কবিরাজ ভ্যান চালাতে চালাতেই মুখটা পেছন ফিরিয়ে ঝংকার তোলে, আমারে ভোলনটা ভাই এতো সহজ না!
শুদ্ধর খুব ইচ্ছে করলো ভ্যান থেকে নেমে কবিরাজকে এক নজর ভালো করে দেখে নেয়।  কোন শক্তির জোরে বলছে ও এমন-কথা? ওর চেহারার মধ্যে কী এমন আছে যে, একজন সুন্দরী পরী ওকে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল, এখনো ছাড়তে পারছে না! শুদ্ধ কবিরাজের চেহারাটা মনে করতে গিয়ে শুধু খেই হারিয়ে ফেলে- ছোটখাটো সাইজের সেই মানুষটার মুখের অজস্র বলিরেখায়। বয়স হয়তো চল্লিশের ওপর। বয়সের তুলনায় একটু ভারীই হয়ে গেছে চেহারা-শরীর। তবে চোখের মধ্যে অদ্ভুত এক সারল্যমাখানো। শার্টটা পরে বেজায় লম্বা।
বাংলাবান্ধামুখী রাস্তা থেকে বাঁয়ে নেমে সবুজ ছায়াশীতল শাখা সড়ক দিয়ে যখন ওরা দুজন ভ্যান নিয়ে মহানন্দার বাঁকের সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলোয় পৌঁছাল, তখন রোদ আকাশের মেঘলা ভাব কাটিয়ে একটু যেন ঝলমলিয়ে উঠতে চাইছে। শুদ্ধর মনেও একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে যে, এখানে অন্তত থাকার জায়গা মিলে যাবে, যাবেই। প্রত্যয় হয় ওর। কারণ, এছাড়া তো আর ওর সামনে কোনো পথ খোলা নেই, আঁকড়ে ধরার মতো নেই খড়কুটো। ডাকবাংলোর গেটের কাছে ভ্যান থামিয়ে রেখে কবিরাজ আস্তে ধীরে নেমে পড়লো, ‘ভাই। আপনে বসেন। আমি কথা বলে আসি।’ তারপর শুদ্ধকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও ডাকবাংলোর ভেতরের দিকে মিলিয়ে যায়।
মূল পথটা ডাকবাংলোর দিকে মিলিয়ে গেলেও, আরেকটি সরু পথ বাউন্ডারির পাশ ঘেঁষে চলে গেছে মহানন্দার তীরের দিকে। শুদ্ধ হাঁটতে হাঁটতে সেখানেই সেই তীরে গিয়ে দাঁড়ায়।
এখানে এই বিশাল উঁচু বাঁকটায় ও যতবারই এসে দাঁড়িয়েছে মন অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছে। দক্ষিণ দিক থেকে এসে নদীটা একটু ভিতরের দিকে বাঁক নিয়ে ডাকবাংলোর তীরের এ-প্রান্ত ছুঁয়ে চলে গেছে উত্তর দিকে। এ-বাঁকের মাথায় বড় বড় গাছের ছায়াতলে গড়ে উঠেছে একতলার এই ডাকবাংলো। একটা স্মারক স্তম্ভ না ছিল? কোথায় সেটা? যাতে লেখা আছে ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ আরেকটু ভেতরের দিকে মনে হয়। শুদ্ধ ধীর পায়ে তীরের দিক থেকে সরে এসে ডাকবাংলোর এ-পাশের গেটের দিকে এগোয়।(চলবে)

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]