শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

পঁয়তাল্লিশ.
ডাকবাংলোর পাশ ঘেঁষেই উঁচু বেদীমূলে খাড়া হয়ে আছে স্বাধীনতার সেই স্মারক স্তম্ভ। যাক আছে ওটা, এখনো আছে, লেখাটাও স্পষ্ট। তবে কতদিন থাকবে সেটাই প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব-চিহ্নকে মুছে ফেলার যে চক্রান্ত শুরু হয়েছে, ওরা তো কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট রাখবে না। যেভাবে সারা বাংলাদেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানো হলো, ওরা তো মনে হচ্ছে এ-দেশটিকে পঙ্গুই বানিয়ে ছাড়বে! বাংলাভাইয়ের নাম শুনলে আজ দেশসুদ্ধু মানুষ থরথরিয়ে কাঁপে! যেন সে বিশালকায় এক দৈত্য, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সব বাসিন্দাকেই দেখতে পায়। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই, গলা টিপে ধরবে!
ছি: ওয়াক থু! শুদ্ধ ঘেন্নায় থুথু ফেললো! নিজেরা যুদ্ধ করে দেশটাকে যারা স্বাধীন করে আনলো, তারা সব জুজুর ভয়ে অস্থির। তা না হলে ও আজ কেন তেঁতুলিয়ায় এসে থাকার জায়গা পাচ্ছে না! ঘুরতে হচ্ছে দ্বারে দ্বারে! কে জানে এখানে এই ডাকবাংলোয়ও ঠাঁই মিলবে কীনা! ওই তো কবিরাজ আসছে। কেমন শ্লথ পায়ে। ওর মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝে নিল শুদ্ধ। ও স্মারক-স্তম্ভের সামনে থেকে বেরিয়ে এসে মহানন্দার তীরের দিকে হেঁটে যায়। বাঁকের চূঁড়ো পাড়ের মধ্যে গিয়ে বসে। একটু পর কবিরাজও পাশে এসে দাঁড়ায়, ‘ভাই। অনেক করে বুঝাইলাম। কাজ হলো না। এইখানে আরো বেশি কড়াকড়ি। বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও তো এইখানে থাকতে পারমিশন লাগে।’
কী স্বচ্ছ নির্মল নিষ্কলুষ জল। নদীটাকে এখানে অন্তত এ-জায়গায় একটুও মরা মনে হচ্ছে না। শুদ্ধ অদূরেই থির বয়ে যাওয়া মহানন্দার জলে থই খোঁজে।
ভাই শুনছেন?
মহানন্দা যৌবন হারিয়েছে ঠিকই। তবে এখানে ওর নদীত্ব এখনো মরে নি। অবশিষ্ট আছে, ও এখনো বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত ধারায়।
ভাই, কি করবেন ভাই?
এই জল পূণ্যবতী হিমালয়ের জল। এই জল স্পর্শ করে এসেছে কত পাহাড়, হিমবাহ, কত দেশগ্রামের মাটি। ধারণ করে আছে বুকের মধ্যে ভাঙাগড়ার কত স্মৃতি ইতিহাস। একসময় মহানন্দা সেই উনবিংশ শতকে আইয়রগঞ্জের নিকটে মিলিত হতো পুনর্ভবার সঙ্গে, সেখান থেকে রামপুর-বোয়ালিয়ার নিকটে এসে মিলিত হতো পদ্মার সঙ্গে। তারও আগে নিজ প্রবাহের জল নিষ্কাশিত করতো লক্ষণাবতী গৌড়ের ভিতর দিয়ে এসে করতোয়ায়। পরে আরও পরে মহানন্দার গতি পাল্টিয়েছে, নদীর গতি পাল্টায় যুগে যুগ।
ভাই! আপনার কী হইছে ভাই? ভাই, ডাকবাংলায় তো হইলো না ভাই।
আত্রাই-তিস্তা থেকে নির্গত হয়ে এক সময় মহানন্দা সোজা দক্ষিণবাহী হয়ে চলনবিলের ভিতর দিয়ে করতোয়ার সঙ্গে মিলিত হতো জাফরগঞ্জের কাছে। কতো মিলনে মিলনে কতো বন্ধনে বন্ধনে বাঁধা মহানন্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুদ্ধর ইচ্ছে করলো পূণ্য জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে। গোসল করে সব পাপতাপ ধুয়ে ফেলতে। কিন্তু সম্ভব না, এখন কিছুতেই সম্ভব না, লাফিয়ে পড়েও সম্ভব না, অতোটুকু কাছে নেই মহানন্দা। নেমে যাওয়া তো আরো অসম্ভব। সোজা কোনো পথ নেই এখান দিয়ে। অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে। সেÑঘুরে যাওয়ার ধৈর্যটুকু ওর আপাতত নেই। ও যেভাবে বসেছিল, সেভাবেই নিথর নিস্পন্দ বসে থাকে। কবিরাজও ওর পাশ ঘেঁষে বসে। বসেই শুদ্ধকে ঝাঁকিয়ে ধরে প্রায় চিৎকার করে উঠলো, ভাই, এই ডাকবাংলায়ও তো না করে দিছে। ভাই শুনছেন? শুনছেন ভাই?
শুদ্ধর এখন খুউব খুউব ইচ্ছে করছে দার্জিলিংয়ের সেই পাহাড় দেখতে। সেবার পাহাড়গুলো এখান থেকে স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। কোনো পাহাড় জলপাই। কোনো পাহাড় কালো আবলুশ। শুভ্র স্ফটিক স্বচ্ছ সাদা পাহাড়ও চোখে পড়েছিল আরো পেছনে, জলপাই, কালো আবলুশ পাহাড়গুলোর পেছনে। আজ কুয়াশায় সব ঢাকা। আকাশটাই ঝাপসা, অস্পষ্ট।
মহানন্দা এতো প্রাণহীন কেন? কেন এতো নিথর? প্রাণের কোনো অস্তিত্ব নেই সাড়া নেই। অথচ পাথর-কুড়ানো মানুষের পদচারণায় এই মহানন্দা সব সময়ই কী সুন্দর জেগে থাকতো। ঢেউয়ের নিপ্পন তুলে গান গাইতো। বালুর সেই চড়াটা খাঁ খাঁ করছে। কতবার ওখানে বসে থেকেছে, এই কবিরাজ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। হেঁটেছে খালি পায়। এখন ওখানে গিয়ে গা মেলে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে উপুড় হয়ে পুরো বুকটাকে বালিয়াড়ির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে কুষ্ডুলি পাকিয়ে জড়োসড়ো, হাতপা গুটিয়ে জবুথবু থাকতে! কবিরাজের কন্ঠ ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে, নিনাদের মতো, ‘ভাই, ও ভাই! কি হইছে আপনার? ভাই জ্যামকনে যাইবেন? আপনে না একবার জ্যামকনে থাকতে চাইছিলেন। ভাই, যাইবেন জ্যামকন? ভাই? ও ভাই!’
শুদ্ধ এবার কবিরাজের দিকে তাকায়। এই এতোক্ষণে অনেক অনেকক্ষণ পর কবিরাজের দিকে স্থির চোখে ও তাকিয়ে থাকে। ওর চোখে চোখ পড়তেই কী হয়, কবিরাজ হঠাৎই উঠে দাঁড়ায়। তারপর ভাবগম্ভীর মুখেই গীত ধরে,
গাও তোল গাও তোল কইন্যা
গানের লাইনটা আবারো গায় কবিরাজ, আবারো। বারবার গাইতে গাইতে পরের লাইনে আসে-
কইন্যা পেন্দো বিহার শাড়ি
কবিরাজ ওর কাঁধের গামছাটা মাথায় পেঁচিয়ে শাড়ি পরার ঢঙে ঘোমটা দেওয়ার ভান করে একটা নৃত্যভঙ্গি আনতে আনতে আবারো গেয়ে ওঠে-
কইন্যা পেন্দো বিহার শাড়ি
কবিরাজ এবার আরো উচ্ছল হয়ে ওঠে। গামছাটাকে চারপাশে ওড়াতে ওড়াতে নিজেও ঘুরতে ঘুরতে ও নাচের তুফান তুলতে চায় আর সেই সঙ্গে গাইতে থাকে-
সেই শাড়ি পিন্ধিয়া যাইবেন
তোমার শশুর বাড়ি।
তোমার শশুর বাড়ি লাইনটা বলার সময় কবিরাজ শুদ্ধর দিকে হাত উঁচিয়ে দেখায়, ইশারায় যেন শ্বশুর বাড়ি দখাতে থাকে। শুদ্ধর মুখে এই এতক্ষণে হাসি ফুটে ওঠে, ওর সকল স্থবিরতা যেন কেটে যায় এক লহমায়। ও-ও কবিরাজের গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলায়Ñ
গাও তোল গাও তোল কইন্যা
কইন্যা পেন্দো নাকের ফুল
পাতা বাহার কাকই দিয়া
কইন্যা তুলিয়া বান্দো চুল
পাতা বাহার কাকই দিয়া
কইন্যা তুলিয়া বান্দো চুল
নাচা-গানা শেষ হতেই কবিরাজ ছেলেমানুষের মতো হো হো করে হেসে উঠলো। সে-হাসির সঙ্গে শুদ্ধও হাসে, তাল মেলায়। কবিরাজ যেন প্রাণ ফিরে পায়, ভাই! কি করবেন এখন?
শুদ্ধ যেন খুড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় বলে ওঠলো, জ্যামকন তো কবিরাজ ভাই এখান থেকে অনেক দূর, তাই না?
হ। দুই তিনঘণ্টা তো লাগবই। সালবাহানই তো লাগে দুই ঘণ্টা। তারপর না রওশনপুর! বেলা নামাইয়া দিবো ভাই।
কী করবেন?
আপনে বোঝেন, আমার তো ভাই মন টানতেছে না। মনে হয় না রুম পাইবেন!
কবিরাজের কথা শুনে শুদ্ধ কতক্ষণ ঝিম মেরে থাকে। তারপর যেন নিজের অজান্তেই ও ডাকবাংলোর বাইরের গেটের দিকে হেঁটে যেতে থাকে। চলেন যাই। গিয়ে দেখি। আর তো কিছু করার নাই।
কবিরাজ জোরে জোরে পা চালায়। শুদ্ধকে পেছনে ফেলে প্রায় দৌড়ানোর ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকে। আর যেতে যেতে আবারো গীত ধরে,
গাও তোল গাও তোল কইন্যা
কইন্যা পেন্দো বিহার শাড়ি
সেই শাড়ি পিন্ধিয়া যাইবেন
তোমার শশুর বাড়ি।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]