শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

ছেচল্লিশ.
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো ছেড়ে কবিরাজের ভ্যানটা বাংলাবান্ধা-তেঁতুলিয়া সড়কে যখন নেমে এলো, তখনো দুপুর আসেনি বটে, তবে সকালের সৌম্য কোমলতাও মরে গেছে কখন। ছায়াঢাকা মায়াবী পথটার মতোই যেন শুদ্ধর মনও শান্ত স্থির ধীর। তেঁতুলিয়ায় যে এখনো একটা থাকার ব্যবস্থা হলো না, সে-নিয়ে সামান্যও উদ্বেগ উৎকন্ঠা আপাতত কিছুই ওর মনের ভেতর নেই। একটু আগে কবিরাজের নাচাগানাই বোধহয় ইরেজারের মতো ওর মনের দুশ্চিন্তাকে খানিকটা হলেও মুছে দিয়ে গেছে। কী সুন্দর নাচলো মানুষটা, গাইলো হেড়ে গলায়। একটুও জড়তা ছিল না। বরং প্রাণের উদ্দামতা পুরোই বজায় ছিল।
এখন আবার দেখো কী গভীর ধ্যানে একমনে চালিয়ে যাচ্ছে ভ্যান। মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে ঝাকিয়ে চারদিক পল্লবিত করে। যেন অন্য কোনোদিকে খেয়াল নেই ওর, অন্য কোনোদিকে তাকানোর ফুরসতও নেই। ও জন্মেছেই ভ্যান চালানোর জন্য। যেন ভ্যান চালানোই ওর নিয়তি, কানুন আর অবলম্বন। সত্যি, কতকিছুই যে করতে হয় এই মানুষকে! মানুষের ভেতরে থাকে কতো মানুষ! মানুষ নাচে গান গায় চুমু খায় খুন করে হাসে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয় প্রেমে পড়ে কাঁদে আবার অনুভূতিহীন হয়ে রেপ করে, মানুষ সংবর্ধিত হয় বুক ডন দেয় উঠে দাঁড়ায় অপমানে কান ধরে ওঠবস করে মানুষ পুলিশের লাঠি খায় অনাহুত অপমানে নীল হয় মানুষ হাজার ভালোবেসেও উপেক্ষিত থাকে চরম, গরমে কষ্ট পায় চুপিচুপি একজন আরেকজনের কানে কানে কথা বলে মানুষ চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এর সঙ্গে ওর সঙ্গে লিখিত কিংবা অলিখিত এটা-সেটা কতো বিষয় অভ্যন্তরিণ কিংবা আন্তর্জাতিক মানুষ লীলা করে গান গায় চিত্রনাট্য হয় মানুষ মানুষকে স্যালুট দেয় কলার চেপে ধরে হিসেব চায় মানুষ তদন্ত কমিটি করে গঠন হন্তদন্ত হয় ভ্যাবাচ্যাকা খায় মানুষ মানুষের কাছে দীক্ষা নেয় কবিতা পাঠ করে চিরুনি চালায় চুলে মানুষ দাম্ভিকতায় অশ্বারোহী হয় ঘোড়দৌড়ে এ ওকে ছাড়িয়ে আগে যেতে চায় মানুষ উন্মাদের মতো মত্ত হয় প্রতিযোগিতায় টাকা গুণে মানুষ টাকা গুণতেই থাকে টাকা গুণতে গুণতে মানুষ টাক অর্জন করে আর ওদিকে রিকশার সিট ছোট হয়ে যায় আর বাসের সিটে মানুষ বসতে পারে না ঠাসাঠাসি চাপাচাপি মানুষ প্রেম করে বিবাহিত হয় বাচ্চা প্রসব করে আর লিভিং টুগেদার…মানুষ মানুষকে পণ্য করে আর মানুষ মানুষকে জীবিকা করে আরো কত কিছু যে করে মানুষ কতকিছু যে করতে হয় নিজের কাছে নিজেকে নিষিদ্ধ হতে হয় কখনোসখনো মানুষকে মানুষের কাছ থেকে পালাতেও হয়। মানুষ শুদ্ধর মনের ভেতর মানুষের অবিশ্রান্ত জাল ছড়ানো ছিটানো এলোমেলো, নিজের সঙ্গে নিজের মন নিয়ে খেলতে খেলতে টেরও পায় না কখন কবিরাজ তেঁতুলিয়া বাজার হয়ে ভ্যান চালাতে চালাতে পঞ্চগড়মুখী মেইন রোড ধরেছে।
এই রাস্তা বড়ই সুন্দর, বড় মনোহর মায়াময়। এ রাস্তায় যে শুদ্ধ কতোবার গিয়েছে সালবাহান আর ভোজনপুরের দিকে এ ভ্যানে চেপেই, তার কোনো হিসেব নেই! যেতে যেতে আশপাশের গ্রামের নামগুলো পর্যন্ত সব মুখস্থ! দর্জিগজ, লোহাকাচি. হবরাগজ, বসন্তজোট, কালিতলী, গেদুরগজ, ইসলামবাগ, পদদামপাড়া, আমতলী, কালান্দিগঞ্জ, নয়াপাড়া, মাথাফাটা, মাঝিপাড়া, বোঁচাগঞ্জ! এসব গ্রামগুলোকে এক সূতোয় বেঁধে রাখা এই কুচকুচে কালো পিচের তেঁতুলিয়াÑপঞ্চগড়মুখী রাস্তার তেঁতুলিয়া প্রান্তবর্তী সড়কের সৌন্দর্য সত্যি দেখার মতো, এ পথ সমান্তরাল ঠিকই তবে নারী-দেহের চড়াই উৎরাইয়ের মতোই এর আছে মোহনীয় এক রমণীয়তা! আছে কবিতার ছন্দের মতো জায়গায় জায়গায় সুদৃশ্য বাঁক। সেই সঙ্গে দু-পাশটা বেশ খোলামেলা, উন্মুক্ত, অবারিত! চোখ চলে যায় অনেকদূর অবধি, আর চোখ চলে যায় বলেই মনেরও কোনো বন্ধন থাকে না। তাই এ পথে শুধু যেতেই ইচ্ছে করে অবশ্য অনিচ্ছাও মাঝে মধ্যে বেয়াড়ার মতো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে চায়। মনে হয় একটু দাঁড়াই বিরাম নিই। গাছের ছায়াতলে বসে জোরে জোরে ক্ষণিক শ্বাস ফেলি। পথ থেকে নেমে সমতল চা-বাগানের আলপথ ধরে আস্তে ধীরে উঠে যাই দূরের ওই পাহাড়ি টিলার দুর্বোধ্য জগতে।
তবে, চাইলেই তো আর সবকিছু সম্ভব নয়, সম্ভব হয়ও না। উপচানো সবুজের হাতছানি দেওয়া অনেকগুলো চাবাগানই পড়েছে ভারতীয় সীমান্তে। হ্যাঁ, এখন এখানে এ-পথে মাঝে মধ্যেই ভারতীয় সীমান্তরেখা ছুঁয়ে দিতে চাইছে গাঁ। আর টেনে নিয়ে যেতে চাইছে নিজের সব মোহনীয় বাঁকে। সীমান্ত-লাগোয়া এমন সব প্রান্তে এলে কবিরাজের কথার সীমানাও কেমন বাড়বাড়ন্ত হয়ে ওঠে। গোবরা ব্রিজ পেরিয়ে ভ্যান যখন মাঝিপাড়ায় প্রবেশ করলো, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা ক্ষীণ সড়কটি অতিক্রম করতে করতে কবিরাজ জানায়, ভারতীয়রা নাকি এ জায়গাতে সড়ক কিছুতেই বড় করতে দিচ্ছে না। ওদের সীমানা মাত্র ক’গজ দূরে। এপাশে বিডিআর ক্যাম্প। মাঝে মধ্যেই নাকি ছড়িয়ে পড়ে তীব্র উত্তেজনা। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।
এটাই কি সেই চা-বাগান যা নিয়ে কয়েকদিন আগে বিডিআর আর বিএসএফ মুখোমুখি হয়েছিল পরস্পরের? পত্রপত্রিকাগুলোও সে-ঘটনা নিয়ে হয়ে ওঠেছিল সরগরম। শুদ্ধ জিরো লাইনের গা ঘেঁষে ভারতীয় সীমান্তের চাবাগান দেখাতে দেখাতে জিগ্যেস করলো, এই চা বাগান নিয়েই কি গ্যানজাম হয়েছিল কবিরাজ ভাই?
হ ভাই। উৎসাহিত হয়ে উঠলো ভ্যানচালাতে নিমগ্ন ছ্টোখাটো মানুষটা, অরাতো এই চা-বাগান জোর কইরাই করছে! এইটা তো ভাই বর্ডার এলাকা। এই জায়গায় তো অরা চা-বাগান করতে পারে না ভাই। বিডিআর বাধা দিছিলো। অরা হাজার হাজার চা শ্রমিক আনছে আর বিএসএফরা পাহারা দিছে। এইটা নিয়া কত গোলাগুলি!
হ্যাঁ, গোলাগুলির খবরটা ও-ও পড়েছে পত্রিকায়। মনে আছে তখন উত্তেজনা এতোটাই চরমে ওঠেছিল যে, তেঁতুলিয়ার বর্ডারঘেষা কিছু মানুষকে নিরাপদ জায়গায়ও সরে যেতে হয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। এই এক সীমাহীন উৎকন্ঠার জায়গা সীমান্তবাসীদের, হঠাৎ হঠাৎই কারণে-অকারণে সীমান্তের হাওয়া গরম হয়ে ওঠে। তখন একদিন দুদিন তিনদিন তিন সপ্তাহ কখনো বা মাসজুড়েও ভেতরে ভেতরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে বর্ডারের দুপ্রান্তের মানুষেরই মনে। বিদ্বেষের চরে জমা হয় বালুর নতুন স্তর। বাড়ে সন্দেহ অবিশ্বাসের দোলাচল অনেকখানি। এসব খবর তখন শহরেও পৌঁছায়, চাপা থকে না। খবরের কাগজেও ছড়ায় সেসব উত্তাপ। তখন সীমান্তের উদ্বেগ রূপ লাভ করে জাতীয় উৎকন্ঠার। এইসব ভাবনার এলোমেলোনির ভেতরই ভ্যানটা যখন আরো কিছু দূর এগোয়। খোলামেলা পথের দু-পাশে ইউক্যালিপটাসের ঘনঘটা বেড়ে যায়। রোদের আলোয় সে গাছের ছিপছিপে সাদা শরীর ঘন নীল আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে বিলেতি মেমের মতো ঘাঘরা সরিয়ে যেন হঠাৎই ঝিলিক তুলতে থাকে।(চলবে)

ছবি:ফটোগ্রাফার আক্কাস মাহমুদের রমনার অ্যালবাম থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]