শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

সাতচল্লিশ.
ভ্যানটা এখন নিচু ঢাল থেকে উৎরাইয়ের দিকে ওঠছে। ঝিরিঝিরি হাওয়ার যেন নতুন পরশ পাচ্ছে শুদ্ধ। মন চলকে ওঠলো ওর। এ জায়গাটায় যতবারই আসে ভালো লাগে, বড় বেশি ভালো লাগে এখানে দুদ- দাঁড়িয়ে থাকতে, পথের এ-প্রান্ত সে-প্রান্ত জুড়ে এলোমেলো অন্যমনস্ক হাঁটতে! যেন এখানে জীবনের অন্য কোনো স্বাদ আছে অন্য কোনো মানে! কী সেই স্বাদ তার স্বরূপ অবশ্য অজানা, তবে ও যতোবারই এখানে এসেছে নিসর্গের এ প্রাণ কোণেÑ হেঁটেছে হৃদয় ভরে ইচ্ছেমতো, আগে তো ততটা গাড়ির দৌরাত্ম্য ছিল না, একটা দুটো বাস আসতো অনেক অনেকক্ষণ পর, লোক চলাচলও ছিল কম, সেই অনাস্বাদিত নির্জনতায় যত খুশি হাঁটো, তারপর ক্লান্ত হয়ে বসে থাকো ডাহুক ব্রিজের পাশে ঘাসের শয্যায়, কেউ নেই দেখার! হ্যাঁ, এ-ডাহুক ব্রিজের পাশে এসে দাঁড়ালেই মন আপনাআপনি ভালো হয়ে যেত।
আগে অবশ্য রড-সিমেন্ট বাঁধানো শক্তপোক্ত এ-চওড়া ব্রিজটা ছিল না, এটা নতুন হয়েছে, খুব বেশিদিন হয়নি, চার কি পাঁচ বছর হবে। তার আগে এখানে নিচের ওই পরিত্যক্ত বেইলি ব্রিজ দিয়েই চলাফেরা করতো গাড়ি, যা এখনো দেখা যাচ্ছে নিচের সেই অব্যবহৃত রাস্তায়। নতুন ব্রিজ করার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাস্তাও করা হয়েছে বেশ উঁচু আর বড় করে। নতুন-পুৃরনো দু-ব্রিজের প্রান্তেই মিলতো প্রাণের সাড়া! জায়গাটার প্রতি শুদ্ধর সেই মায়ামুগ্ধতার কথা জানা থাকাতেই কিনা কবিরাজ ব্রিজটা পার হয়েই থামালো ভ্যান। পথের বামপাশে জানের যানটাকে সাইড করে রেখে পেছনে ফেলে আসা ব্রিজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুদ্ধকেও ওর সঙ্গে যাওয়ার ইশারা করলো।
শুদ্ধ মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল আজ এখানে নামবে না, থামবে না কোথাওÑ কীভাবে থামে? মাথা ঠিক আছে ওর? এখনো একটা থাকার জায়গা হলো না! তার মধ্যে হয়নি দুপুরের খাওয়া, ক্ষুধায় পেট টনটনানি শুরু করেছে। তবুও ও ভ্যান থেকে নামে। মনের অনিচ্ছা-সত্ত্বেও নামে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ব্রিজটার দিকে। ডানপ্রান্তের রেলিংয়ের সামনে থমকে দাঁড়ানো কবিরাজের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
গামছায় কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কবিরাজ ডান হাতের ইশারায় রেলিংটা দেখাতে দেখাতে বললো, ‘এই জায়গাতেই ভাই সেদিন বোমা ফাটাইছেলো। এতো জোরে আওয়াজ হইছেলো ভাই, কী বলব আপনারে, আমগো কারো জানে পানি ছেলো না। পুরা তেঁতুলিয়াই কাঁইপা ওঠছিল। গুজব ছড়াইছিল, পুরা দেশে বলে মেলা মানুষ মরছে। সেইদিনের পর থেকেই ভাই কী যে হইছে, সন্ধ্যা হইলেই মানুষ আর ঘর থেকে বাহির হয় না। বাহিরের লোকজনও আসে না। ঢাকা থেকে মনে হয় সেই ঘটনার পর আপনেই প্রথম আসলেন।’
কবিরাজের কথা শুনতে শুনতে রেলিংয়ের দিকে আরো একটু এগোয় শুদ্ধ, রেলিংয়ের একেবারে পাশ ঘেষে দাঁড়ায়, জায়গাটা দেখে, নিবিড়ভাবে দেখে। বেশ বড় একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে, বেশ বড়। ধাক্কাটা যে কম লাগেনি, বোঝাই যাচ্ছে। ধাক্কা শুদ্ধরও লাগছে। হঠাৎ কেমন এক ধরনের শৈথিল্য বোধ যেন ওর গলা চেপে ধরতে চায়! ক্ষত কি শুধু তৈরি হয়েছে এই ব্রিজের রেলিংয়ের শরীরে? ক্ষত কি তৈরি হয়নি সারা দেশটার বুকের গহীন গভীর তলেও? সারা দেশটাই তো সেদিন কেঁপে ওঠেছিল। সত্যি সত্যি কেঁপে ওঠেছিল। মনে হয়েছিল এ-দেশের স্বাধীনতাটুকুই বুঝি আর থাকছে না! আবার বন্য-বরাহদের হাতে চলে যাবে ক্ষমতা। যাদের হাত থেকে বাবা এ দেশটাকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে, জীবনের মায়া ত্যাগ করে! বাবার জন্য হঠাৎ আবারো অনেক অনেকদিন পর ওর বুকের ভেতরটা ডুকরে ওঠলো। কেন বাবা যুদ্ধে গিয়েছিল, কেন? কেন বাবা এ-দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছিল মৃত্যুর কাছে? কি লাভ হলো তার? উলটো দেশ স্বাধীন করে আসার পর সেই মুক্ত মাটিতেই কিনা প্রাণ দিতে হলো একাত্তরের পরাজিত প্রেতাত্মার কাছে! আজ তো ওরাই আবার প্রকাশ্য হয়ে ওঠেছে! শুধু কি প্রকাশ্য? আকার ধারণ করেছে ভয়াল দানবের! বাংলাভাই কী দোর্দ- প্রতাপ নিয়ে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা উত্তরবঙ্গ জুড়ে! কেউ তাকে আটকানোর সাহস পাচ্ছে না। সরকার বাহাদুর নাকি তাকে খুঁজেই পাচ্ছে না। আসলে যেন দেখেও দেখছে না। আরো যেন তাজা রক্ত চাই মানুষের! বড় অসহায় বোধ করে শুদ্ধ, বড় বিপন্ন লাগে। ও শ্লথ পায়ে আবার এগোয় ভ্যানের দিকে। ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়েও ভ্যানে ওঠে না, অপ্রাসঙ্গিকভাবেই হঠাৎ অভিমানক্ষুদ্ধ স্বরে বলে ওঠলো, ‘তাই বলে থাকার জায়গাগুলো সব বন্ধ করে দিতে হবে?’
কবিরাজ যেন নিজের ওপরই বর্তে নিল শুদ্ধর সব অভিযোগ। ওর কন্ঠে জবাবদিহিতার সুর, ‘ভাই, মনে করেন বাইরের মানুষ এসেই তো সব করে! গ্রামের মানুষ কী আর গ্রামের অনিষ্ট করার সাহস পায়? সেই জন্যই মনে করেন এত কড়াকড়ি!’
শুদ্ধর বলতে ইচ্ছে করলো, বাইরের মানুষের কি দোষ, আপনি তো কাল রাতে নিজেই বললেন শাহাব্দির কথা, বললেন যে জিএমবির সাথে অর লাইন আছে। সে তো এই তেঁতুলিয়ারই লোক! স্থানীয় লোকজন যদি কিছু করার সাহস না পায়, বাইরের লোক এসে কি করবে? বলতে গিয়েও ও চুপ করে রইলো। বলে কী লাভ! লাভ নেই। বেচারা নিজের মতো না হয় একটা কথা বলেই ফেলেছে। ও পথ ছেড়ে আবার ব্রিজে এসে দাঁড়ায়। উত্তরের দিকে তাকায়। একধ্যানে তাকিয়েই থাকে, যেদিক থেকে এসেছে ডাহুক নদী সেদিকে, যতদূর চোখ যায়।
শুকিয়ে গেছে মেয়ে। বুকে বুকে জমেছে পলির বিপুল স্তর। সে স্তর বুকে নিয়ে ক্ষীণ থেকে আরো ক্ষীণতর হয়ে বয়ে চলেছে শ্লথ। ওর এই সর্পিল চলা যেন কোনোদিনই থামবে না কোনো কালে। ধুঁকে ধুঁকেই চলবে ও, ওকে যেন চলতেই হবে! নইলে এই মাটি এই প্রকৃতির রস আর রইবে না! মাঝে মধ্যেই বাঁক। গর্বিত আস্ফালন।
কার মেয়ে তুমি ডাহুক? কোথা থেকে এসেছো? যমুনা? ব্রম্মপুত্র নাকি করতোয়া? যেই হোক তোমার মাÑ তুমি বাংলাদেশে ঢুকেছো ভারত হয়ে। সম্ভবত তিস্তা কিংবা ব্রম্মপুত্রের শাখা নদী তুমি। শুদ্ধ এবার সোজা নিচের দিকে তাকায়। কী স্বচ্ছ নিটোল কাচের মত স্বচ্ছ জল। ডাহুকের বুকে পলি জমেছে ঠিকই, শরীরে জীর্ণতারও ছাপ আছে; কিন্তু এর জলে স্বচ্ছতার সেই গরিমা যেন আজও বইছে। খুব ইচ্ছে করে হাঁটতে হাঁটতে ঢালু বেয়ে নিচে নেমে যায়। ডাহুকের শরীরে পা ছুঁয়ে বসে, আজলায় তুলে নেয় পানি! কিন্তু সময় কোথায়? জ্যামকন যে অনেক দূর!

ছবি: ফটোশিল্পী আক্কাস মাহমুদ

+

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]