শোনো তবে মহানন্দা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হামিদ কায়সার (লেখক)

আটচল্লিশ.

অনেক দীর্ঘ পথ, ঘোরা রাস্তা, চা বাগান আর ঔষধী গাছগাছড়ার সারি পেরিয়ে ওরা যখন জ্যামকন বাগানবাড়ির গেটের সামনে এসে থামলো, তখন ভাটি বেলা। সূর্যের তেজ মরে গেছে। শুদ্ধ কোথায় ভেবে রেখেছিল আজ পড়তি বিকেল থেকে সন্ধ্যাবেলাটা কাটিয়ে দেবে কবিরদের বাড়ির সে-পথটা ধরে হেঁটে হেঁটে, গোধুলি আলোয় খুঁজে নেবে আফরিনের সে-ই অপার্থিব মুখ! তা না, এখনো দেখো পথে পথেই ঘুরছে, নিজের একটা ঠিকানা হলো না। আর যে হবে তার নিশ্চয়তা কি? হলেই বা কখন? কোনোকিছুই তো আর নিজের হাতে নেই। এখানেও যদি বিড়ম্বিত হতে হয়? মুখের ওপর যদি বলে দেয়, না! তবে? শুদ্ধ আর ভাবতে পারে না, হাত-পা শিথিল হয়ে আসতে চায়।
অকুল পাথারে ভাসতে হবে! সত্যি সত্যি আর কোনো উপায় নেই। এখানে আর চকের মধ্যে কে ওকে জায়গা দেবে থাকার! জ্যামকনই যদি না দেয়? তখন তেঁতুলিয়ায়ও তো ফেরা যাবে না! ঘুটঘুটে অন্ধকার এসে ভাসিয়ে নেবে চরাচর-পথ-আকাশ! দুশ্চিন্তায় আর কিছু ভাবার সাহস হয় না শুদ্ধর। তবু ঠেলে ঠুলে ভেতর থেকে ভাবনাগুলো উগরে আসতে চায়! একটু পরই তো নেমে আসবে রাত, গহীন কুচকুচে কালো রাত। তখন তুমি কোথায় কাটাবে? ঘুম তো দূরে থাক, কোন ঠিকানায় রাখবে নিজের ঠাঁই? সেটা কি একবার ভেবে দেখেছো? ভেবো দেখেছো একবার?
না না, আমি ভাবতে চাই না। ভাবতে চাইলেই তো মহাবিপদ! মহা কল্লোল উতরোল। বুকের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। যেমতো জন্মেছো তুমি বাংলায় আজ সে বাংলায়ই তোমার ঠাঁই হতে চাইছে না, মায়ের কোলে পাচ্ছো না নিবিড় আশ্রয়। শুদ্ধর বুকের ভেতরটা জ্বালা করে, বড় তীব্রভাবে জ্বালা করে। তোমার যেখানে সাধ তুমি চলে যাও, আমি রয়ে যাবো এই বাংলায়, সেই বাংলাতেই তোমার এখনো এক টুকরো থাকার জায়গা হলো না- হায়! সেলুকাস! কী বিচিত্র! ওর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে আসতে চায়। নিজেকে কোনোমতো সামলায়, সামাল দেয়, সংযত করে। হাঁটে কবিরাজের পিঁছু পিঁছু বাগানবাড়ির ম্যানেজারের খোঁজে; আর নিজেকে প্রবোধ দেয়, এতো দুশ্চিন্তার কি আছে? হয়তো এখানেই মিলে যেতে পারে থাকার জায়গা। আর যদি না মেলে তো নাই-ই মিললো! কী আর হবে! কবিরাজ ভাইয়ের বাড়ি তো রয়েছেই! কোনোমতো রাতটা পার করা যাবেই যাবে!
জ্যামকনের বাগানবাড়িতে থাকবে কী, বাইরের মেইন গেইট দিয়ে ঢোকারই সুযোগ পেল না। কেউ এসে খুলে দিল না গেট। গেটের দারোয়ান নিরস ভঙ্গিতে জানাল, ‘বাইরের লোকের থাকার ব্যবস্থা নাই।’
কথা শোনেই শুদ্ধর বুকের খাঁচা যেন ভেঙে যেতে চাইলো। পড়ে যাওয়া তারার মতো ঝুলতে ঝুলতে বললো, ‘আমি তো দু-বছর আগে একবার এসেছিলাম। তখন কিন্তু বলেছিলেন থাকা যাবে।’
‘দু-বছর আগের কথা বাদ দেন। এরমধ্যে দেশে অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। এখন মালিকের অনুমতি ছাড়া কাউকে থাকতে দেয়া হয় না। থানারও নিষেধ আছে।’
‘ভাই আমি একজন মানুষ থাকলে কারো কী কোনো অসুবিধা হবে!’
লোকটা বিরক্ত হয়ে উঠলো, ‘এতো কথা আমরা বলতে পারবো না ভাই। আপনে মাথা ঠুকে
রক্ত বের করলেও আমাদের কিছু করার নাই। আপনে এখন আসতে পারেন!’ মানে লোকটা ওকে ভদ্রভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছে! শুদ্ধ অপমানটুকু হজম করে, করতেই হয় উপায় নেই, অপমান বোধে ন্যূব্জ হয়ে শান্ত পদে হেঁটে ভ্যানে চাপে।
সূর্য এখনো ডুবেনি। দেখাও যাচ্ছে না। গাছপালার আড়ালে। কবিরাজের মুখে কথা নাই। যেন সব দোষ ওর একার। এমন একটা দায়দায়িত্ব নিজে থেকেই কাঁধে বয়ে চুপচাপ অলসভঙ্গিতে চালাতে লাগলো ভ্যান। কী আর করবে বেচারা! সেই সকাল দশটা থেকে একটানা দৌড়ের ওপর ছুটছে তো ছুটছেই। এক ফোঁটাও বিশ্রাম পায়নি। এখন সন্ধ্যার ছায়াশীতলতা। একটু পরই ঘনিয়ে আসবে সন্ধ্যা। ক্ষুধায় দুশ্চিন্তায় শরীর মন ছেড়ে দেয় শুদ্ধর। দুপুরে খাওয়া হয়নি ঠিকমতো। ঠিকমতো কি, খেতেই তো পারলো না। যা কা- করলো ম্যাসিয়ারটা! মেজাজ তখন আর কিছুতেই ঠিক রাখতে পারেনি ছোঁড়াটার উদ্ভট কান্ডে। ধুন্ধুমার সেই খলপার বেড়ার হোটেল থেকে না খেয়েই বেরিয়ে এসেছিল! এখন মনে হচ্ছে মেজাজটা তখন সামলে রাখা উচিত ছিল। অতো চড়া না করলেও পারতো! আসলে হোটেলে ঢোকার আগে থেকেই মেজাজ তাতিয়ে ছিল। ক্ষুধা বেশি পেলেই ওর মেজাজ এমন বিগড়ে যায়। ইচ্ছে তো ছিল শালবাহানের হাটের হোটেলে খাবে। প্রচন্ড ক্ষুধায় তিষ্টাতে না পেরেই না শেষে ভজনপুরের রাস্তার মোড়ের ওই অমন সস্তা ভাঙাচোরা হোটেলটায় ঢুকলো। হোটলে কি বলা চলে? এ ধরনের দোকানগুলোতে সাধারণত চা-বিস্কুট খাওয়া হয়। চারদিকটায় কোমড় পর্যন্ত বাঁশ খলপার বেড়া। ভেতরে দুতিনটা কাঠের সরু টেবিল আর বেঞ্চ আড়াআড়িভাবে বিছানো। সৌভাগ্যবশত সেখানে ভাতও মিললো। দুপুরে নাকি বিশ-পঁচিশজন মানুষের ভাতের আয়োজন হয়। তা পরিবেশটা যেমনই হোক, ভাত পেয়ে ভালোই লেগেছিল। রুইমাছের ঝোলটার স্বাদও খারাপ ছিল না। বেশ রসিয়ে রসিয়েই খাওয়া শুরু করেছিল। দু-তিন লোকমা মাত্র খেয়েছে, হঠাৎ শুদ্ধর মনে হলো, ডালের অর্ডারটাও দিয়ে রাখে। ফিনিশিংটা যেন চমৎকার হয়। ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে ও হাঁক দিয়েছিল, ভাই ডাল আছে নাকি? সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাসিয়ারের উদ্দেশে লোকটির হুকুম, অই ডাল দিয়া আয়। তখন তখনই বিশাল ঝাঁকড়া চুলওয়ালা ম্যাসিয়ার এসে শুদ্ধ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর পাতে ঢেলে দিল ডাল। একথালা ডাল। তার বন্যায় রুইমাছ তো রুইমাছ ভাত পর্যন্ত ডুবে হারিয়ে গেছে কোন তলানিতে। হতভম্ব শুদ্ধ চেঁচিয়ে উঠলো, আরে আরে! করেন কি? করেন কি?
ম্যাসিয়ার হতভম্ব ওর চিৎকার শুনে কেন, কি অইছে? আপনেই তো ডাইল চাইলেন।
চাইছিই তো। তাই বলে প্লেটে ঢেলে দিবেন?
কি কয়রে? বলতে বলতে যেন কোনো আজব পাবলিক দেখছে এমন ভঙ্গিতে ম্যানেজারের দিকে ছুটলো। ম্যানেজারও ওর চিৎকার শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। শুদ্ধ তার কাছে ডাল প্লেটে ঢেলে দেওয়ার জন্য কমপ্লেইন দিতেই উলটো তার নসিহত শুনতে হলো, ডাইল পরে চাইলেই পারতেন। আম্গো এইখানে এই রকমই নিয়ম। চাইলেই ডাইল ভাতের মইধ্যে ঢাইলা দেই। ডাইলের জইন্য আলাদা বাটি নাই।
শিখলাম বলে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুদ্ধ ভাত রেখেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। জগটা বাইরে এনে হাত ধুয়ে ম্যানেজারের কাছে বিল মিটিয়ে বাইরে এসে সিগারেট ফুঁকেছে। কবিরাজ অবশ্য খাওয়ার পুরো কোর্স কমপ্লিট করেই এসেছিল। খুব তো মেজাজ দেখিয়ে না খেয়ে আছো, এখন সামলাও ক্ষুধার যন্ত্রণা!
আবার যখন ভজনপুর মেইন রোডের বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল ওদের ভ্যান, সন্ধ্যা তখন গাঢ় হয়ে উঠেছে। কবিরাজ ভ্যান থামিয়ে জানতে চাইলো, ‘ভাই কী করবেন, ভাই? থাকার জায়গাতো মিললো না।’
শুদ্ধ নিরুদ্বেগ গলায় জানালো, ‘আপনার বাড়িতে থাকবো।’
কবিরাজের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ও বোকার মতো হে হে হাসতে লাগলো।
‘কি রাখবেন না?’ সরস কন্ঠে চাইলো শুদ্ধ। কবিরাজের গলাটা কেঁপে কেঁপে বাজে, ‘ভাই থানা থেকে তো বারবার মাইকিং করছে বাইরের মানুষকে আশ্রয় দিলে থানায় ধরে নিয়ে যাবে!’
‘তাই নাকি?’
‘হ!’ কবিরাজ আরো কী বলতে চাইলো। শুদ্ধ নিজের অভিমান আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না, ‘হ্যা আমিতো বাইরের মানুষ। আমিতো বাইরেরই মানুষ।’ এরপর ও আরো বেশি স্তম্ভিত হয়ে গেল, যখন কবিরাজ তেঁতুলিয়ার দিক থেকে আসা একটা বাস দেখিয়ে পরামর্শ দিল, ‘ভাই আপনে এক কাম করেন। বাসে পঞ্চগড় চলে যান। ওখানে অনেক হোটেল পাবেন। এছাড়া কোনো উপায় নাই।’
ওকে তবু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কবিরাজ তাড়া দিয়ে উঠে, ‘এটাই মনে হয় পঞ্চগড়ের শেষ বাস। ভাই দেরি কইরেন না। উঠে পড়েন।’ ও রীতিমত অস্থির হয়ে উঠেছে। অভিমানে নাকি অপমানে শুদ্ধ আর কথা বলতে পারলো না। চুপ করে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে পড়লো বাসে। সিটও পেল একটা জানালার পাশে।
কবিরাজ বাইরে থেকে কী কী সব বলছে, কানে আসছে না শুদ্ধর অথবা ও শুনতে চাচ্ছে না। বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে স্প্রিড বেড়ে যাচ্ছে। শুদ্ধ লম্বা হয়ে সামনে সিটের দেয়ালটায় মাথা গুঁজলো।

ছবি: ফটোশিল্পী আক্কাস মাহমুদের মুঠোফোনোগ্রাফি থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]