শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

আট

তারপর কে জানতো যে, সম্পূর্ণ বিপরীত এক দুনিয়া অপেক্ষা করছে ওদের জন্য! বিপরীত মানে পুরোই বিরূপ এক বিশ্ব। প্রথম প্রথম ক্যাম্পাসে ওদের প্রেম গাঢ়ই হয়েছিল। তখন নিজের থাকা-খাওয়ার ঠিকানা না থাকলেও শুদ্ধ প্রায় প্রতিদিন বিকেল হলেই ছুটে যেত শামসুন্নাহার হলের গেটে। রেবা কোনোদিন মাথার চুল ছেড়েছুড়ে ক্যাজুয়েলি হয়ে, আবার কোনোদিন বেশ সেজেগুজে হাজির হতো ওর সামনে। তারপর দুজন হয়তো ফুটপাতে বসেই পার করে দিতো কত সন্ধ্যা! কোনোদিন-বা চষে বেড়াতো পুরো ক্যাম্পাস। কোনোদিন আবার কার্জন হলের পুকুরপারে তো সোহরাওয়ার্দির খোলা উদ্যানে মুখোমুখি বসে মেতে থাকতো অহৈতকী গল্পে। রমনা পার্কের প্রতিটি সবুজ ঘাস জানতো ওদের ঘটনা। লেকের জল ওদের দিকে টলটল করে তাকিয়ে থাকতো।
সেই ওদের নিবিড় সম্পর্কের বন্ধনটা যে কীভাবে ধীরে ধীরে শিথিল হলো, আলগা হলো খুঁটি, পরে নিশ্চিতভাবেই গেল ভেঙে; তার হিসেবটা আজো মেলাতে পারে না শুদ্ধ। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটানিকে তুড়ি মেরে সরিয়ে চলতি স্কুটারেই ও সিগারেট ধরায়। সিগারেটে টান দিয়ে উঁকি মেরে বাইরে তাকিয়েই টের পায় আর খুব বেশি দূরে নয় চন্দ্রা!
রেবার সঙ্গে ব্রেকিংয়ের জন্য প্রথম প্রথম নিজেকেই দায়ী মনে হতো। মনে হতো যে ওরই কোনো আচরণ বা ভুলে হয়তো রেবা কষ্ট পেয়েছে, কষ্ট পেয়ে অভিমানে ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ। বিশেষ করে তখন ও ক্লাসমেট কেয়ার সঙ্গে লাইব্রেরি ওয়ার্কে ভীষণ মেতেছিল। সেটা যে কেয়ার প্রতি ভালোবাসা বা মুগ্ধতা ছিল তা নয়, আসলে কেয়ার পাল্লায় পড়ে হঠাৎ লেখাপড়ায় সিরিয়াস হয়ে ভালো রেজাল্ট করার একটা আকাঙ্ক্ষা বড় তীব্র হয়ে উঠেছিল। ক্লাস শেষ করেই দু’জন ছুটত লাইব্রেরিতে! পুরনো-নতুন বই-পত্রপত্রিকা ঘেটে এটা সেটা নোট করতো! ফাঁক-ফোকরে বেরিয়ে খেয়ে নিত ক্যান্টিনে! তারপর আবারো লাইব্রেরি! কী যে তীব্র নেশায় পেয়েছিল কটা দিন! সে-নেশার তোড়েই হবে, তখন রেবার খোঁজখবর ভালোমতো নিতে পারেনি! আগের মতো যেমন রোজ রোজ হল গেটে ধরণা দেয়নি, ডিপার্টমেন্টে গিয়েও দাঁড়িয়ে থাকেনি! ভেবেছে লেখাপড়াটা তো গুছিয়ে নিই, সপ্তাহে দু-একদিন রেবার সঙ্গে হলে গিয়ে দেখা করলেই হলো! কিন্তু সেই দু-একদিন পরই ধীরে ধীরে হয়ে উঠতো লাগলো দুঃসহ কাল! রেবা আর হল থেকে বেরিয়ে আসে না। কোনোদিন শরীর খারাপের অজুহাত দেখায়, কোনোদিন হলে গিয়ে শুনে যে ও সকাল থেকেই নেই, এটা সেটা, দুর্গমতা! রহস্য! পুরোপুরি রুদ্ধদ্বার!
শুদ্ধ প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে তেমন আমলে নেয়নি, ভেবেছে রেবা বুঝি সত্যি ব্যস্ত, পরে ভেবেছে হয়তো রেবা অভিমান করে আছে! অভিমান ভাঙলেই বুঝি ফিরে আসবে আবার। না, রেবা আর ফিরে আসেনি। আসেনি তো আসেনি, কোনো রকমেরই আর যোগাযোগটুকুও রাখলো না। বরং চরম নির্দয়তা দেখালো, নিষ্ঠুরতা দেখালো! ওর পৃথিবীটাকে করে দিল বিষাদগ্রস্ত!
দাঁড় করালো ভয়াল এক সময়ের সামনে! রেবা কি সত্যি সত্যি ওকে ভালোবাসতো? সত্যি যদি ওকে ভালোবাসতো রেবা, একবার হলেও তো অন্তত ওর কাছে আসতো, অনুযোগ জানাতো যে, তুমি কেন কেয়ার সঙ্গে অতো ঘন ঘন মেশো? আসলে কেয়া যে কোনো ফ্যাক্টর নয়, তখন কি আর সেটা বুঝেছিল? বুঝেছিল অনেক পরের। অথচ তখন কেয়ার কথা ভেবে ভেবে নিজেই নিজের ভেতরে কেন্নো হয়ে থাকতো।
উফ! কী যে চরম নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছিল তখন রেবা। পুরো পৃথিবীটাই ভারী দুর্বোধ্য ঠেকেছিল। রেবা কোনোভাবেই নিজেকে ধরা দেবে নাতো দেবে না, চোখের সামনেও পড়বে না! দিন দিন ওর নেগলেজেন্সি চরম পর্যায়ে পৌঁছালো। শেষে আর না পেরে তিতিবিরক্ত হয়ে শুদ্ধও একদিন সিদ্ধান্ত নিল, ও-ও ঘুরে দাঁড়াবে! রেবার দিক থেকে ফিরিয়ে নেবে মুখ! দেখি না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়! তুমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারলে আমি কেন পারব না?
তাছাড়া তখন ওভাবে সরে না দাঁড়ানো ছাড়াও কোনো উপায় ছিল না। শুরু হয়ে গেছে ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার ঢামাডোল। সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট দুটো তো ধরাই হয়নি। তাই তিনচার মাস রেবা আর ও দুজনই প্রায় দুই গ্রহে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু একদিন যখন সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস মাত্র শুরু হয়েছে, রুমমেট কাঁকন জানাল যে, রেবা আজ হলে এসেছিল। এক ক্যাডারের রুম থেকে ওকে বেরুতে দেখেছে। তখনই মাথাটা ওর পুরো ফরটিনাইন হয়ে যায়। বলে কি কাঁকন? রেবাও কি তাহলে ওই ক্যাডারের খপ্পরে পড়লো?
সেদিন বিকেলেই ও ছুটে গিয়েছিল শামসুন্নাহার হলে। যথারীতি নোটিশ এলো, রেবা অসুস্থ, দেখা করতে পারবে না। ও আবারো সমস্ত কাতরতা ঢেলে একটা চিঠিসহ স্লিপ পাঠিয়েছিল রেবার কাছে। বোবা এক আর্তনাদ ছাড়া কোনো উত্তরই এলো না। একরাশ বিষন্নতা নিয়ে নিজের কাছে ফিরে এসেছিল শুদ্ধ। সেদিন সন্ধ্যাটা যে কী এক গহন যন্ত্রণার সমুদ্র হয়ে আছড়ে পড়েছিল ওর বুকে! সারারাত সেই সুনামিতে দু-চোখের পাতা আর এক করতে পারেনি। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই কোনোমতো গোসল-নাস্তা সেরে হাজির হয়েছিল কলাভবনে রেবাদের হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। তিনঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে পেয়েছিল রেবার দেখা। কেমন হুড়মুড়িয়েই প্রবেশ করেছিল ডিপার্টমেন্টের বারান্দায়। তারপর দেখো শুদ্ধর মুখোমুখি হতেই সে কি চোখেমুখে ওর তড়পানি জ্বালা! কোথায় ছুটে যাবে কোন তমিস্রাতে নানান তোড়জোড়! ওর মনের ভেতরে যে বয়ে চলেছে প্রলয় কাণ্ড মুখের অভিব্যক্তি থেকে কিছুতেই বুঝি লুকোতে পারছিল না। অস্থির হয়ে শুধু বলছিল, আমার এখন ক্লাস। আমার এখন ক্লাস।
ওর কথাকে পাত্তা দেয়নি শুদ্ধ, বনসুন্দরীর সব অধিকার নিয়ে অস্থির কন্ঠে জানতে চাইলো, আমার কি অপরাধ জানতে পারি?
কিসের অপরাধ?
এই যে তুমি এড়িয়ে চলছো?
এড়িয়ে চলবো কেনো? এড়িয়ে চলার কি আছে?
এড়িয়ে চলার কী আছে মানে, তুমি কিছু বুঝতে পারছো না!
রেবা চুপ করে থাকে।
তবে কি আমাদের বনসুন্দরীর সব মুহূর্তগুলো মিথ্যা?
রেবা নিরুত্তর।
শুদ্ধ চেঁচিয়ে ওঠলো, জবাব দাও রেবা, জবাব দাও।
জবাব দেয় না রেবা। আবার ভেসে ওঠে ওর অস্থিরতা, আমার এখন ক্লাস!
আমি উত্তর না পেলে তোমাকে আজ ছাড়ব না!
রেবাও কঠিন হয়ে উঠেছিল, এখানে উত্তর দেওয়ার কী আছে?
আছে, রেবা আছে, নিজেকে অর ধামাচাপা দিতে পারল না শুদ্ধ, তুমি নাকি মহসিন হলে যাও? কেনো জানতে পারি?
ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেনি রেবা, শুদ্ধকে বিমূঢ় করে দিয়ে গোখরোর মতো ফুঁসে উঠেছিল, আমার পারসোনাল ব্যাপার। তোমাকে বলতে হবে?
ওর হাতটা ঝাংটা মেরে সরিয়ে দিয়ে তরতর করে মিলিয়ে গিয়েছিল কলাভবনের কোন সাপ-প্যাঁচানো করিডোরে!

ছবিঃ গুগল।