শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

নয়

সেই যে গেল রেবা। গেল তো গেলই। আর কখনো দেখা মেলেনি ওর। না না, মেলেছে দেখা, তবে মুখোমুখি পড়েনি। সেও এক অগ্নিশরনিক্ষেপ! তিনচার সপ্তাহ পরই হবে, এক দুপুরবেলার নির্জনতায়, হলের করিডোরে ও নিজের চোখেই দেখলো, ক্যাডার স্বপনের রুমে গটগট করে ঢুকে পড়ছে রেবা। বুক চিতিয়েই ঢুকছে। মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল শুদ্ধর। বুঝি খুনও। কী করবে ও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছিল স্বপনের রুমের বাইরে। সেখান থেকে পা আর কিছুতেই সরলো না। সরলো না তো সরলোই না, গাঁট মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। জানে না ও, রেবা রুম থেকে বেরিয়ে এলে কী করতো! তবে খুব বেশিক্ষণ থাকার সুযোগও ঘটেনি। স্বপনেরই দুই ক্যাডার হবে, কোথা থেকে ঝড়ের বেগে এসে হাজির হলো সেখানে। এসেই শুরু করলো চার্জ। চার্জ তো চার্জ, ওর গালে ঠাস করে চড় লাগিয়ে দিয়েছিল একটা সোয়া সের ওজনের, তারপর লাথি উঠিয়ে গাল পেড়েছিল, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন শুয়ারের বাচ্চা। ফুট! জলদি ফুট!
মাথা নিচু করে রুমে ফিরে এসেছিল শুদ্ধ। মেনে নিয়েছিল রেবা আমার কেউ না। কেউ না রুবা। কিন্তু তেষ্টাতে পারেনি, রুমের ভেতর এই হলের ভেতর দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল ওর। মনে হয়েছিল এ শহরটা ওর না। এই শহরে থাকলে ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ও মরে যাবে! ব্যাগে হাতের কাছে যা পেল কাপড়চোপড়, হুটহাট ভরে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল হল থেকে। শুধু মনে হয়েছিল, যেতে হবে দূরে কোথাও, অনেক দূরে, সেটা যে তেঁতুলিয়া হবে, তখনো জানা ছিল না!

চন্দ্রার যে-প্রান্তে উত্তরবঙ্গমুখী বাস থামে, সেখানেই- স্কুটার থেকে নামতেই কেমন খটকা লাগলো শুদ্ধর। কী যেন নেই, কী যেন নেই! কী? ও ভেবে পায় না। স্কুটারের ভাড়া মিটিয়ে বাসের খোঁজে পথের দিকে তাকাতেই দেখে, সারি বেঁধে তিনচারটে বাস একটার পিছনে আরেকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাঁড়িয়ে রয়েছে তো রয়েছেই, নড়ছে না। সাড়াশব্দও যেন নেই। কেমন গুমোট একটা স্তব্ধতা!
প্রথম বাসটা বগুড়ার, আরেকটু সরে দেখে পেছনের দুটো বাস রাজশাহীর। না এসবের কোনোটাতেই নয়, ও যাবে তেঁতুলিয়া বা পঞ্চগড়ের বাসে। দিনাজপুরের হলেও ক্ষতি নেই। বাস তিনটার আশা ছেড়ে ও পাকা সড়কের দিক থেকে নেমে খোলা জায়গার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আর যেতে যেতেই টের পায়, যেন ওর ষষ্ঠন্দ্রিয় বলছে, কী যেন নেই, কী যেন একটা অনুপস্থিত। কী সেটা? ও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শুধু বুঝে একটা যেন কী মিসিং রয়েছে।
আচ্ছা, বাসগুলো নড়ছে না কেন? একটার পেছনে আরেকটা দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। শুধু কি বাস? ও এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলো, বাসের পেছনে যে দু-তিনটে ট্রাক, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সি ওসবও থেমে আছো! কেন? জ্যাম? ও আবারো আরো একটু পিছিয়ে আসে। পিছিয়ে গিয়ে প্রথম বাসটার সামনের দিকে তাকায়। না, জ্যাম নেই। একদমই নেই জ্যাম। উত্তরবঙ্গমুখী পুরো রাস্তাটাই ফাঁকা। শুধু বিপরীতমূখী থেমে আছে কটা গাড়ি। এবং এসব গাড়ির থেমে থাকাটাও অস্বাভাবিক লাগছে। এবং ও বিস্ময়-বিহ্বল চোখে লক্ষ্য করে যে, শুধু উত্তরবঙ্গমুখী নয়; ঢাকামুখী সাভারমুখী সব প্রান্তের গাড়িগুলো- বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ট্যাক্সি এমনকি হোন্ডাও থেমে আছে, বিদঘুটে বিষাদের মতো থেমে আছে।
পুরো চন্দ্রাই কি থামা? স্তম্ভিত? নিজের অলক্ষ্যেই শুদ্ধ কান পাতে। আশ্চর্য! কোনো শব্দ নেই। গাড়ির হর্ণ… গাড়িচলার কর্কশ আওয়াজ… ফেরিওয়ালার হাকডাক… বাস হেলপারের কোনো একটা জায়গার নাম ধরে চিৎকার চেঁচামেচি… কিচ্ছু নেই। এমনকি ঝিঁঝিঁ পোকার গানের মতো নীরবে বয়ে চলা কোনো সুক্ষাতিসূক্ষ্ণ শব্দের নীরব ঢেউও নেই! পুরো পৃথিবীটাই যেন স্থির, মৌন, ঝিমধরা! অন্ধকার রাতের মতো থম মেরে আছে।
তবে কি আবারো ঘটে গেছে মহা-বিস্ফোরণ কোনো! নাপাম বোমার মতো অথবা হিরোশিমা নাগাসাকি? শুদ্ধ চারদিকে তাকায়। না, আকাশের কোনো প্রান্তেই বা কোনোদিকে দৃশ্যমান হয় না বীভৎস কালো ধোঁয়া, আগুনের অথই তা-ব, তার আগ্রাসী লিকলিকে শিখা! আকাশ সেই আকাশের মতোই আছে। মৌন-সাদা নীল-বিষাদ স্থির-ধামাধরা। কোনো দালানকোঠাও নেতিয়ে পড়েনি। গাছবৃক্ষ, বিদ্যুতের খাম্বা কোনোকিছু ছাইভস্মও হয়নি পুড়ে পুড়ে। মাটিও ঢেবে যায়নি একতিলও। ধরেনি কোথাও ফাটল বড়সড়! তারপরও যে পৃথিবীটা শান্ত নেই, তা তো শুদ্ধ কালরাতের টিভি-খবরেই দেখেছে।
সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার বড়াই করে যে-শহর, তার শিল্প-কবিতা-চলচ্চিত্র-দার্শনিকতা- আর সাহিত্যের বিন্যস্ত গরিমায়, সেই প্যারিস ক-দিন ধরেই জ্বলছে বিক্ষুদ্ধ দাঙ্গায়। হ্যাঁ, আজ দশদিন হলো প্যারিস দাঙ্গাবিধ্বস্ত। প্যারিসের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও। আশংকা করা যাচ্ছে যে, ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে দাঙ্গার এই ভয়াবহ দাবানল! বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে ফ্রান্সে আসা উত্তর আমেরিকার মুসলমান অভিবাসীরা অভিযোগ তুলেছে সামাজিক অসাম্যের। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবহেলা করা হচ্ছে! ফরাসি সৌরভ জাতিবিদ্বেষের দগদগের ক্ষতের দুর্গন্ধকে কিছুতেই ধামাচাপা দিতে পারছে না!
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ আজ! রুশ-আমেরিকা ঠাণ্ডা যুদ্ধ অবসানের পর ভাবা হয়েছিল, পৃথিবীতে বুঝি শান্তির নতুন সূর্য উঠলো। আর কোনো হানাহানি হবে না। যুদ্ধ হবে না। বিদ্বেষ ছড়াবে না। সারা পৃথিবীটা হবে সুখের এক ঘর। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো এর ঠিক উল্টোটুকুই। সামরিক আক্রমণ আর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলো একে একে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলো, কোটি মানুষের জীবনে নেমে এলো বিপর্যয় অনিশ্চয়তা, মৃত্যু হলো লক্ষ লক্ষ নিষ্পাপ শিশু ও নারীর। যার দায় এড়াতে পারবে না কবিতা ও শিল্পের দেশ ফ্রান্সও! হায় পৃথিবী! তোমাকে স্বস্তি কে দেবে আনি?
নাকি এই স্থবিরতা শুধু বাংলাদেশেই? আবারো কি সিরিজ বোমা-বিস্ফোরণের মতো নতুন কোনো ভয়াবহ তা-বে স্তব্ধ হয়ে পড়লো সারা দেশ! ঝলসে গেল বাংলামায়ের পুরো শরীর? সম্ভবত তাই। সে আশংকা কিছুতেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত আগস্টে সিরিজ বোমার যে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে গেছে, তা যে আবারো ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কি? এক মুহূর্তের জন্যও কি থেমে আছে জঙ্গী-তৎপরতা?

ছবিঃ প্রাণের বাংলা