শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার (লেখক)

দশ

না। থেমে নেই সে-শনির প্রভাব। শুদ্ধর মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে উঠে। ঘাড় শিরদাঁড়া উঁচু করে ও সোজা হয়ে দাঁড়াতে চায়। তিনচারদিন আগেই তো খবরের কাগজে পড়লো, ঈদের চারদিন আগে হবে- রাজশাহী আর চট্টগ্রামে উদ্ধার হয়েছে বোমা বানানোর বিপুল রসদ। রাজশাহীতে যা পাওয়া গেছে তা দিয়ে নাকি পুরো শহরটাই উড়িয়ে দেওয়া যাবে এক নিমিষে! আর যেভাবে মিলেছে মারণাস্ত্র, সেও এক ঘটনা বটে! অ্যালার্মিং! ভয়াবহ অ্যালামিং! শহরের কুমারপাড়ার এক কুরিয়র কোম্পানির অফিসে খেলনা অটোরিকশার মধ্যে নাকি নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল বোমা-বানানোর এসব দ্রব্যসামগ্রী। উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন আরডিএক্স, এক কেজি সাদা পাউডার, আধা কেজি ডেটোনেটর তৈরির গান পাউডার, বোমা তৈরির মূল উপকরণ আধা কেজি সালফার।
একই সময়ে বান্দরবানের লামা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া থেকেও গভীর রাতে উদ্ধার হয়েছে ছয়টি শক্তিশালী বোমা, সালফার, গান পাউডার, পেরেক, ব্যাটারিসহ বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম। সন্দেহ করা হচ্ছে এসবও জঙ্গীদের কাজ।
সেই প্রেক্ষাপট থেকে আজ ঘটতেই তো পারে মর্মন্তুদ কোনো ঘটনা। কিন্তু বোমাবিধ্বস্ত হলে যা ঘটে, তার নমুনা কোথায়? বারুদের গন্ধ তো থাকবে, অন্তত ধ্বংস চিহ্ন! বোমাহতের আহাজারি! মানুষগুলোর তো এভাবে স্থির দাঁড়িয়ে থাকবার কথা নয়! মনে হচ্ছে যেন সবাই মূর্তিরূপ লাভ করেছে! হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে। ’শ’শ হাজার হাজার মানুষ মূর্তির মতো থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মূর্তির মতো কী, ও এবার হতবিহ্বল দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে, ওর সামনে-পিছনে ডানে-বাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কারোরই হাত নড়ছে না, পা নড়ছে না, কোনোই মুভমেন্ট নেই। কেউ আগাচ্ছে না সামনের দিকে, কথাও বলছে না। কথা বলতে বলতে কারো হাত উঠছে না উপর থেকে নিচে, নিচ থেকে উপরে, ঘুরছে না ডান থেকে বাঁয়ে, বাঁ থেকে ডানে। সবাই যেন চলৎশক্তিহীন। জড়বস্তুর মতো পি-। অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্যি যে, ও নিজের ভেতর নিশ্চিত হয়, মানুষগুলো পথের ওই সব গাড়ির মতোই স্থির হয়ে আছে, পাথর হয়ে আছে। এবং এটা সত্যি, জ্বাজল্যমান সত্যি! সময় এখন থমকে আছে একটা স্থির বিন্দুর ওপর!
বড় বিপন্নতা বোধ করে শুদ্ধ। নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে। ও বিমর্ষ দৃষ্টিতে চন্দ্রাকে দেখে। চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে চন্দ্রাকে! কেমন হতশ্রী, বিবর্ণ, প্রাণহীন, পান্ডুর ওর মুখ! চৈত্র্যের পাতাঝরা বৃক্ষের মতো অবয়ব। যেন হাওয়া বইছে না। চলছে না আকাশের সূর্যটা নিজ গ্রহপথে! 
পাকা সড়কের দিক থেকে শুদ্ধ, মানুষের ভেতর দিয়ে দিয়ে, মানুষের পাশ ঘেঁষে, পথের পাশের শেষ সীমানায় যেখানে সারিবাঁধা দোকানগুলো রয়েছে, সেদিকে যেতে যেতে আরো কাছ থেকে দেখে- কেউ ডানপা সামনের দিকে এগিয়ে কেউবা বাঁ পা, কারো-বা দৌড়ের ভঙ্গি, কেউ যেন সটান দাঁড়ানো- এইমাত্র আড়মোড়া ভাঙছিল। নারী-শিশু-বৃদ্ধ-যুবক-যুবতী, পৌঢ় নানাবয়সী মানুষ, সবাই স্থবির নিশ্চল! আহা! একটা বুড়ো! কোন বাড়ির বুড়ো কে জানে? মাথার চুল সব শাদা। দাঁড়িও। যাকে বলে খুনখুনে। এমন মানুষকে কেউ একা ছাড়ে? হ্যাঁ, একাই তো। ধারেকাছে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যাকে মনে হতে পারে বুড়োর স্বজন বা সঙ্গী। বুড়োর ডানহাতে ঢাউস সাইজের একটা ব্যাগ! ভারি চামড়ার ব্যাগ! ভারির কারণেই বোধহয় বুড়োর শরীর নুইয়ে পড়েছে সামনের দিকে। বুড়োর প্রতি অপার মমতায় শুদ্ধ ব্যাগটা নিজের কাছে নিতে চায়। আমিই না হয় বহন করি। কিন্তু ব্যাগটা আসে না। বুড়োর চামড়া কুঁচকানো হাত থেকে টেনে কিছুতেই নিজের কাছে আনতে সমর্থ হয় না ব্যাগটাকে। শুদ্ধ জোর খাঁটায়। গায়ের সমস্ত জোর জড়ো করে ও বুড়োর ব্যাগটা টেনে টেনে নিজের কাছে আনতে চায়। পারে না। কিছুতেই পারে না ও। অশরীরী কোন শক্তি যেন ভর করে আছে বুড়োর অসাড় হাতে। একটা পাথরমূর্তির কাছ থেকে ব্যাগটা টেনে নিতে না পারার ব্যর্থতায় যতটুকু, তার চেয়ে এই যে ঘটে চলেছে এইসব অদ্ভুত আশ্চর্য সব কাণ্ড-কীর্তি তারই প্রাবাল্যে কিনা ও প্রবল অস্থিরতা অনুভব করে। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় হাঁফায়, হাত পা শরীর চেতনাসুদ্ধু যেন শিথিল হয়ে আসতে থাকে! মনে হয় ও নিজেও রূপ লাভ করতে চলেছে পাথরে।
কিন্তু না। বেশ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর, অনুভব করে যে, ওর চেতনা একটু একটু করে ফিরে আসতে শুরু করেছে, সজীব হচ্ছে চিন্তা, স্বচ্ছ হচ্ছে দৃষ্টি। নিজের অজান্তেই ও সামনের দিকে এগোতে এগোতে আবিষ্কার করে যে, এক মাকে ঘিরে দুই শিশু বিপন্ন পাথরমূর্তি রূপ ধারণ করে আছে। সামনের দিকে এগোনোর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের বামহাতে এক তিনচার বছরের শিশু শক্ত করে ধরা আর ডানহাতে একটা পাতলা প্লাস্টিকের ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড়। গায়ে বোরকা থাকলেও মুখ খোলা। চেহারায় যেন উদ্বেগের কালো ছায়া আলগা লেপে রয়েছে। তার মানে কি? ভয়ানক একটা কিছু যে ঘটতে যাচ্ছে, আগেই কি টের পাচ্ছিলেন মা? আরেকটু এগোতেই চোখে পড়লো পেছন থেকে সেই মাকে আঁকড়ে ধরে আছে এক পাঁচ-ছ বছরের শিশু। শিশুটার চোখেমুখের আকুতি দেখে থমকে দাঁড়াল শুদ্ধ। আহা রে পরনের শার্টটার উপরদিকের বোতামগুলো নেই। হঠাৎ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো রামকিংকর বেইজের সাঁওতাল পরিবার! হ্যাঁ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় ও একবার শান্তিনিকেতন গিয়েছিল। ক্লাসমেটদের সঙ্গে এসকার্সনে। হিল্লিদিল্লি জয়পুর আজমির অনেক ঘুরেটুরে ফেরার সময় কলকাতা থেকে একরাতের জন্য গিয়েছিল শান্তিনিকেতন। কলাভবনের সামনে গাছের আলোছায়ার চক্করে দাঁড়িয়ে ছিল সাঁওতাল পরিবারের সেই ভাস্কর্য, যেমন এখন স্তম্ভিত হয়ে আছে ওরা মৌন তিনজন। শিশুদুটোর জন্য বড় মায়া লাগে শুদ্ধর। ভীষণ কষ্ট হয়। এ কোন হেঁয়ালিপনা? কার মত্ত অভিশাপে এতগুলো লোক পাথর হয়ে গেল? স্তব্ধ হয়ে গেল চন্দ্রা? ওর মাথায় কিছুই ঢুকতে চায় না। ও হাঁটু মুড়ে বসে শিশুটির মাথায় হাত বোলায়। ডানহাত ধরে ওকে কাছে টানে। ছেলেটির হাত ওর হাতে আসে বটে কিন্তু স্পন্দনহীন অনুভূতিহীন, যেমন ছিল তেমনি থাকে, নড়ে না সরেও না। কেন? ওর কি হয়েছে? কোন যাদুর ছোঁয়ায় হলো এমন কা-? এটা কি কোনো রূপকথার সিনেমার দৃশ্য নাকি স্বপ্নের বিভ্রম? ওর কৌতূহল ওর বিস্ময় প্রচন্ড থেকে প্রচন্ডতর হয়ে উঠে।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা