শোনো তবে মহানন্দা

হামিদ কায়সার

চার.

এমনই এক দিশেহারা অবস্থায়ও যে কীভাবে প্রায় একটা বছর পার হয়ে গেল, টেরও পেল না! সে-সময়ই ডিপার্টমেন্টের এক বড়ভাইয়ের বদান্যতায় হলে সিট জুটলো; নিজের চেষ্টায় টিউশনিও মিললো দুটো। কিন্তু ততদিনে দেখো শুরু হয়ে গেছে আরেক গ্যাংগ্রিন! হলের সিটে শুয়ে রেবার কথা ভেবে ভেবে আরামে পা দোলাবে কী, বুকের সুগভীরে হাত রেখে টের পায়, বনসুন্দরীর প্রথমযৌবনের উতলা-বাতাসে খুঁজে পাওয়া ওর ভালোবাসার গোপন বুকসিন্দুক রেবা যেন আর ওর নেই। একটু একটু করে সরে গেছে অনেকটাই দূরে! ওকে হলে গিয়ে স্লিপ পাঠালে বলে দেয়, রুমে নেই। ডিপার্টমেন্টেও ওর সামনে ঝটিতি উপস্থিত হলে বাইনমাছের মতো গা মুচড়ে সরে যায় নানা তালবাহানা দেখিয়ে। ও ভেতরে ভেতরে অনুভব করে পায়ের নিচের মাটি যেন ডেবে যাচ্ছে নিচের দিকে!
রেবার এই অ্যাবাউট টার্ন বা উপেক্ষাকে মেনে নিতে পারেনি শুদ্ধ। কীভাবে মানে? তাহলে যে অস্বীকার করতে হয় বনসুন্দরীর অনেক রোদহাওয়ায় ওর কৈশোর থেকে যৌবনের সেই প্রস্ফুটনের দিনমালাকেই! সে-দিনগুলো যেমন বনসুন্দরীর অনাবিল প্রকৃতির হাওয়ার স্পন্দনের দোলায় দোলায় বিকশিত হয়েছে, তেমনি সে-যৌবন রঙিন পাখনা পেয়েছে রেবার প্রেমাস্পর্শে। সেই রংধনু-সময়েই একদিন ওদের বাড়ির সামনের পথ দিয়ে রেবাকে রিকশায় যেতে দেখে বুকের মধ্যে বেজে উঠেছিল দেড়শো কোটি নাকাড়া। কী স্নিগ্ধ চান্দ্রেয় মুখ! চন্দনঢালা মোহনীয়তা! সবাক ঝলমলে ব্যক্তিত্বের সূর্যময় উদ্ভাসন! কোনো এক সহচরীর সঙ্গে হাসতে হাসতে নিজের ভেতরেই বিভোল রসবতী স্লিম মেয়েটা; তারপর থেকে ওকে প্রায় প্রায়ই দেখে রিকশায় যাচ্ছে কখনো বা লাস্যে কখনো বা বিমনা কখনো মা বা বাবার সঙ্গে, কখনো আবার ভাই অথবা বাসার বুয়াকে নিয়ে। প্রতিবারই ওর রূপ আলাদা বৈচিত্র্য ও বিন্যাসে ওর কাছে নতুন নতুনভাবে পাপড়ি মেলে।
তখন পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা শুদ্ধর একরকম অভ্যাসেই পরিণত হয়েছিল। কখন না কখন রেবা যায় ও-পথ দিয়ে, সবসময় জামতলায় চোখ। ওকে একবার দেখলে যে কোটি-নক্ষত্রের আলো জ্বলে উঠে হৃদয়ের গোপন-কুঠুরিতে! রিনরিনে কী বিস্ময়কর স্বর্ণরেণুময় সে-অনূভূতি! শুক্লা-তিথিতে জানালা দিয়ে ঘরে আসা জোছনা নিয়ে কতবার সারারাত খেলেছে! সকালবেলা ঘুম থেকে জেগেই মেতে থেকেছে গুলগুলির ফুটো দিয়ে আসা আলোর বলগুলোকে রেবার কপালের টিপ মনে করে মুঠোবন্দি করতে! পারেনি, একবারও পারেনি ধরতে সে-আলোর ছৌঁ! তবে পরমুহূর্তেই হয়তো এসব অবাস্তব অলীক চিন্তাভাবনার জন্য নিজেই নিজেকে বকতো, মারতো! হ্যাঁ, মারতোই তো! নিজেকে নিজে ঠকানো, সবখান থেকে উইড্রো করে নেওয়া- সে তো একধরনের মারই! রেবার বাবা কত বড় অফিসার! কাশিমপুর এবং কোনাবাড়ি দু-দুটো সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, তার মেয়েকে নিয়েই কিনা ও ডুবে আছে ভাবসাগরে!
এই সাগরের কি কোনো কুল আছে, কোনোদিন কি ও খুঁজে পাবে তীর ? আজন্মকাল শুধু ভাসতেই হবে অথই জলের গভীরে। কোনোদিনও ওর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। কোনোদিনও না। ও যে দূর আকাশের চাঁদ। যত না প্রেমবোধের দোলদোলানো, তারচেয়ে ওর কাছে না পৌঁছাতে পারার এই আত্মগ্লানিবোধ ওকে পীড়া দিতো বেশি।
এভাবেই দিন যেতে যেতে একদিন যে কা-টি ঘটে যায়, তার জন্য ও যেমন প্রস্তুত ছিল না, এখনো ভাবতে গেলে সে-ঘটনা বা সে-সূচনাকে ওর শুধু বিস্ময়করই মনে হয় না, মনে হয় অলৌকিকও। সেটা এসএসসি রেজাল্টের পরের কথা। ও একদিন কোনাবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল কদম গাছটার নিচে। ভাওয়াল কলেজে যাবে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার জন্য। তখন বাস ধরতে সবাই ও গাছটার নিচে এসেই দাঁড়াতো বা জড়ো হতো। সেখানেই এসে থামতো বাস। তো, সেদিন কদম ফোটার দিন না হলে কী হবে, হঠাৎই কদম ফুলের রেণু যেন ঝরতে শুরু করলো গাছ থেকে সমানে, ও পুবে তাকিয়ে বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে দেখলো কদমগাছের দিকেই হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে রেবা। সঙ্গে ওর ছোটভাই। রেবা আসছে ভালো কথা, আসতেই পারে, কিন্তু ওদিকে দেখো তার জন্য যেন মরণদশা এসে উপস্থিত হলো শুদ্ধর। ওর বুকের ভেতরে শুরু হলো চরম ধড়ফড়ানো। তিনচার বছর ধরে যাকে শুধু রিকশায় দেখেছে, দেখেছে চলমান, যার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তো জুটেইনি, চোখে চোখ রাখারও মেলেনি অবকাশ- অথচ সেই পরম আরাধ্য পরম কাঙ্খিত, যে সর্বক্ষণই জিইয়ে থাকে মনে ভাবনার প্রতিটি স্পন্দনে! সেই দূর আকাশের নীলিমাই কিনা নেমে এলো নিচে, শুধু কি নেমে এলো, একেবারে পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল আর ওকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে চোখে চোখ রেখে অসংকোচেই জানতে চাইলো, অ্যাই! তোমার নাম শুদ্ধ না? তুমি কোথায় অ্যাডমিশন নিয়েছো?
তখনো ওর বিস্ময় কিছুতেই কাটছিল না। নিজের চোখকেও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, রেবা ওর সামনে সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে আছে, ওর সঙ্গে কথা বলছে, এমনকি ওর নাম ধরে সম্বোধন করছে- এ কি সত্য? নাকি স্বপ্ন? এমনভাবে যে দুজনের দেখা হয়ে যাবে, কথা হয়ে যাবে- ও তো কখনো কল্পনায়ও ভাবেনি। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে উলটো কৌতূহলে জানতে চেয়েছিল, আপনি আমাকে চেনেন?
বারে চিনবো না কেনো? বলেই রেবা কেমন রহস্যময় হেসেছিল। আর তখনই এই প্রথম অতি কাছ থেকে দেখায়ই কিনা, ও দেখলো রেবার দু-গালে কী সুন্দর টোল পড়ে! মুগ্ধ করা, পাগলপারা সে-টোল আর লম্বা, রেবা বেশ লম্বা, ওর চেয়েও আর হাসলে মুক্তো ঝরে, সেই মুক্তো ঝরা হাসি হাসতে হাসতেই রেবা রহস্য চাড়িয়ে দেয়, কেনো তোমাকে আমি চিনতে পারি না?
শুদ্ধ আরো কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল, কীভাবে? আমাকে তো আপনার চেনার কথা নয়।
তুমি আমাকে আপনি আপনি করছো কেন? আমরা কিন্তু সেম ইয়ার, বুঝেছো?
তা তো বুঝলাম, কিন্তু তুমি আমাকে চেনো কীভাবে?
চিনব না! তুমি যে কতো বিখ্যাত লোক, তুমি সেটা জানো?
আমি বিখ্যাত? আমি? কীভাবে?
শুদ্ধর দুরাবস্থা দেখে বুঝি ততক্ষণে মায়া হচ্ছিল রেবার। ও ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো রহস্যের জটাঝট, তুমি আমাদের স্কুলে প্রাইভেট পড়তে আসতে না বিকেলবেলা?
হ্যা হ্যা, আসতাম তো! শুদ্ধ হেসে ফেলেছিল, যতীন স্যারের কাছে। (চলবে)

ছবিঃ প্রাণের বাংলা

পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ১ 

> পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ২

> পড়ুন শুনো তবে মহানন্দা ৩