ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে মানব জীবন অচল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ‘অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে মানব জীবন অচল’। অনেকে বলেন বইয়ের নেশার মতো এমন নেশা নাকি আর নেই পৃথিবীতে। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় হিসাব বের হয়েছে প্রতি সপ্তাহে জনপ্রতি বই পড়ার মোট সময় বিচারে পৃথিবীর মধ্যে ভারতীয়রা ১০:৪২ ঘণ্টা বই পড়ায় ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় স্থানে থাইল্যান্ড ৯:২৪ ঘণ্টা, এবং তৃতীয় চীন, ঘণ্টার হিসেবে  ৮:০০।

রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শিলাইদহ থাকার সময় লেখা  ‘পূর্ণিমা’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘পড়িতেছিলাম গ্রন্থ বসিয়া একেলা সঙ্গীহীন প্রবাসের শূন্য সন্ধ্যাবেলা.‌.‌.‌’‌। এটাই বোধ হয় একজন পাঠকের ছবি, যে পাঠক নিজের নিঃসঙ্গতাকে ভরিয়ে তুলতে কাছে টেনে নিচ্ছেন শুধু বই, অন্যকিছু নয়।কথায় বলে বইপোকা। এই বইপোকা কিন্তু লেখকরাও। পাঠককে বইয়ে মগ্ন করার পাশাপাশি তারাও মগ্ন হয়ে থাকেন বইয়ের রাজ্যে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ওই সময়ে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ এডওয়ার্ড ডাউডেনের লেখা ‘নিউ স্টাডিস ইন লিটারেচার’ বইটি পড়ছিলেন। সৌন্দর্যের তত্ত্ব জানার আগ্রহেই চৌত্রিশ বছরের কবির হাতে এই বইটি তুলে নেওয়া। বই লিখিয়ে রবীন্দ্রনাথ বই পড়ুয়া হিসেবে কেমন ছিলেন, এ প্রশ্নের উত্তরে কবিকে দীর্ঘ তিরিশ বছর কাছ থেকে দেখার এবং শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারে থাকার সুবাদে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপ্যাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি বড় পড়ুয়া ছিলেন। যখন যেখানে যেতেন তাঁর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের বই। ছিন্নপত্রাবলীতে এই বই পড়া প্রসঙ্গে অসংখ্য মন্তব্য দেখা যায়। বাংলা ছাড়া সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষার বই–সহ হিন্দি, মৈথিলি, অসমিয়া ভাষায় তাঁর বই পড়ার কথা জানা যায়। রবীন্দ্রনাথের পাঠের জগৎটি এতই বিস্তৃত যে, সাহিত্য থেকে ইতিহাস, দর্শন, জীবনী, ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, চিকিৎসাশাস্ত্র, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাষাতত্ত্ব, সমবায় তত্ত্ব, আহার— সবেতেই তিনি স্বচ্ছন্দ পাঠক ছিলেন। তিনি বই পড়ার সময় পেনসিল এবং কখনও কখনও কলম রাখতেন। পাতার মার্জিনে নোটও রাখতেন। ছেলেবেলায় বই পড়ার অভ্যাসের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন,
‘ছেলেবেলায় একধার হইতে বই পড়িয়া যাইতাম, যাহা বুঝিতাম এবং যাহা বুঝিতাম না, দুই–ই আমাদের মনের উপর কাজ করিয়া যাইত।’

জীবনের শেষ চোদ্দোটি বছর কলকাতার বাদুড়বাগানে নিজের বাড়িতে বিদ্যাসাগর কাটিয়েছিলেন শুধুমাত্র গ্রন্থপাঠ, গ্রন্থসংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য। শোনা যায়, তাঁর সংগ্রহে ষোলো হাজারেরও বেশি বই ছিলো, যা কিনা ভাড়াবাড়িতে রাখা সম্ভব ছিলো না। বাড়িটির দোতলার পশ্চিমের ঘরে বিদ্যাসাগর একটি আরামকেদারায় বসে বই পড়তেন। বইগুলি সুন্দর করে চামড়া দিয়ে বাঁধানো ছিলো। বইয়ের আলমারির প্রতিটি তাক ভেলভেট কাপড় দিয়ে মোড়া থাকতো। বইয়ের প্রতি তাঁর অসম্ভব ভালবাসা ছিলো। তাই তিনি শেষ জীবনে নিজে বাড়ি বানিয়েছিলেন বইয়ের যত্ন নেবেন বলে।

আব্রাহাম লিঙ্কনের পড়ার নেশা ছিল সাঙ্ঘাতিক। যখন যেখানে সুযোগ পেতেন, বই পড়তে লেগে যেতেন। তাঁর প্রিয় বইগুলির মধ্যে উল্লেখ করা যায় রবিনসন ক্রুশো, পিলগ্রিম’স প্রোগ্রেস, ইশপ’‌স ফেব্‌ল–এর নাম। ঐতিহাসিকদের মতে, রুজভেল্টও একজন পাক্কা পড়ুয়া ছিলেন। অমন মেলা ভার। রাজনীতির পাশাপাশি বই ছিলো তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ১৯১৬ সালে নিজেই এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ লিখেছিলেন, বুক লাভার’স হলিডেস ইন দ্য ওপেন‌। বইয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং বই পড়ে তিনি কেমন উপকৃত হয়েছিলেন সবই বিধৃত আছে এই বইয়ে। অবসর পেলেই ম্যাকবেথ থেকে টুয়েলফথ নাইট যেমন পড়তেন, তেমনই টম স্যায়ের থেকে দ্য পিকউইক পেপারস -ও তিনি গোগ্রাসে গিলতেন।

এমনই আরেক বইপড়ুয়া রাজনীতিক ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। নিজেই বলেছেন, বিশ্ব সাহিত্য পাঠ করে তাঁর রাজনীতির বোধ যেমন ক্ষুরধার হয়েছিলো, তেমনই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বই তাঁকে সহায়তা করেছিলো। নিজে লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, মত বিনিময় করতেন। তাঁর প্রিয় গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ করা যায় ‘দ্য টাইম মেশিন’, ‘এক্সোডাস’, ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’, ‘নাইন্টিন এইট্টি-ফোর’ প্রভৃতি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আজকাল পত্রিকা
ছবিঃ গুগল  

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]