সকালবেলার গুলজার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সন্দীপন চক্রবর্তী

কবি তিনি। কবিতায় আচ্ছন্ন এক মানুষ। তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম পাকিস্তানে, রাখির জন্ম বাংলাদেশে, আর আমার মেয়ে মেঘনার জন্ম ভারতে…ফলে এই পুরো উপমহাদেশই তো আমাদের ঘর’ তখন দেশকালের সীমানা ছাপিয়ে অন্য এক মানুষের দেখা মেলে। গুলজার আসলে এমনই এক মানুষ। যার শায়রী আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে বহুকাল ধরেই। চলচ্চিত্রে গান লিখে, চিত্রনাট্য সাজিয়ে যিনি মোহমুগ্ধ করে রেখেছেন এই উপমহাদেশের মানুষকে। সেই অসাধারণ মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়েছিলো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সন্দীপন চক্রবর্তীর। তার কাছেই লেখাটা চেয়ে মিলেও গেলো। আর তাতেই প্রাণের বাংলায় গুলজার দ্বিতীয়বার এলেন অতিথি হয়ে।এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদে রইলো গুলজারকে নিয়ে আয়োজন ‘সকালবেলার গুলজার’।

কলকাতায় গুলজার।বন্ধু অপু যাবে দেখা করতে। সঙ্গে যাওয়ার কথা। মুশকিল! অপু ফেঁসে গেছে ট্র্যাফিক জ্যামে। কিন্তু একা একা যে চলে যাবো, সেই সাহসও নেই। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়েই ফোনে তাড়া লাগাচ্ছি। অপু অবশ্য আগেই বলেছে যে উনি লাউঞ্জে আছেন, আমি যেন সেখানে চলে যাই। একা একা? মাথাখারাপ! আবার ফোনে তাড়া। কিন্তু অপুর গাড়ি এগোয়নি এক ইঞ্চিও। দুপুর পৌনে এগারোটা পেরিয়ে গেছে। এদিকে সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছনোর কথা। এবার অন্তত একজন হাজির না হলে অভদ্রতা হয়ে যায়। অগত্যা ঢুকতে হলো একা-একাই। ঢুকে একটু ডানদিকে এগোতেই থমকে যাই। দেখি, বসে আছেন। কথা বলছেন আরেকজনের সঙ্গে। এগিয়ে গিয়ে, পরিচয় দিয়ে প্রণাম করতেই সেই বিখ্যাত কণ্ঠ … ‘জিতে রহো বেটা’। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল অপু। উঠে পড়লেন আরেকজনও।
গুলজারের সাম্প্রতিকতম কবিতার বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশের ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছে অপু। সলজ্জ মুখে সেই চুরাশি-উত্তীর্ণ তরুণ বলে চলেছেন … ‘আগেরবারের মতো অত বড় ব্যাপার কোরো না…কেমন অস্বস্তি হয়…কবিতার বইয়ের প্রকাশ নিয়ে অতটা বাড়াবাড়ি কেমন যেন লাগে!’ উল্টে যদি তাঁকে বলা হয় … কিন্তু আগেরবার তো কত লোক এসেছিলো, অত বড় নন্দন ১-এর হল উপচে গিয়েও দাঁড়িয়ে ছিলো লোকে আপনার বইয়ের প্রকাশ দেখবে বলে…তাদের যদি এবার জায়গা না হয়, তাহলে তারা কি আশাহত হবে না? খানিক হেসে জানান … ‘তারা গুলজারের কবিতার জন্য এসেছিলো কি? তারা হয়তো এসেছিলো চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্ব গুলজারকে দেখতে।’ এই সচেতনতা প্রায় চমকে দেয়।
কথা গড়িয়ে আসে তাঁর কবিতার প্রসঙ্গে। দেশভাগ কি তাঁর জীবনে একটা চিরস্থায়ী ক্ষতরেখা তৈরি করে দিয়ে গেছে, যা হয়ে উঠেছে তাঁর লেখকজীবনের নিয়ন্তা? এই যে আমি যার কাছে থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারলাম না, আমায় সরে আসতে হলো বাধ্য হয়ে, এই সামাজিক বা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বেদনাবোধই কি বারবার ডিসপ্লেসড হয়ে ধরা পড়ে না, এমনকি ব্যক্তি-সম্পর্ক বা প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও … তাঁর কবিতা আর গানের কথায়? এর জবাবে তিনি বলে চলেন অনেক কথা। বলেন, এর জন্য একধরণের বঞ্চনার বোধ আছে। সে-বঞ্চনা শুধু দেশভাগজনিত নয়, বাবা-মা-ভাই-বোনের পরিবার থেকেও কীভাবে বঞ্চনার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু সবকিছু মিলিয়েও সে-শুধুই বঞ্চনার বোধ। কাঁদুনি গাওয়া কোনো কষ্টের বোধ না। জীবন যেমন অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে বঞ্চনা করেছে, তেমনই আরেকদিকে দিয়েছেও অনেক কিছু, দু’হাত ভরে। হয়তো এতটা পাওয়ারও কথা ছিলো না তাঁর। কাজেই শুধু বঞ্চনা দিয়ে তাঁকে বিচার করা যাবে না। বলেন, শিল্প কীভাবে ক্ষুদ্র ‘পার্সোনাল’-এর গণ্ডীকে অতিক্রম করে আরও বড় পটে তুলে ধরে শিল্পীর সমগ্র ‘পার্সোনা’-কে।
কথায় কথায় গড়িয়ে যায় বেলা। কথার ফাঁকফোকর বেয়ে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রসঙ্গে তাঁর সশ্রদ্ধ নানা মন্তব্য। উঠে আসে তাঁর ফিল্মজগতে আসার দিনগুলোয় বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দুনিয়ায় বাঙালিদের কেমন রমরমা ছিলো, সেসব কথা। ধর্মশালায় বাস করা বৌদ্ধদের মধ্যে যাঁরা তৃতীয় প্রজন্ম, যাঁরা কখনো তিব্বতে যাননি, শুধু শুনেছেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষ চলে এসেছিলেন দলাই লামার সঙ্গে, তাঁদের লেখা কবিতার প্রসঙ্গ। দেশ নিয়ে কথা বলতে বলতে খানিক মজার ছলেই বলে ওঠেন যে … ‘আমার জন্ম পাকিস্তানে, রাখির জন্ম বাংলাদেশে, আর আমার মেয়ে মেঘনার জন্ম ভারতে…ফলে এই পুরো উপমহাদেশই তো আমাদের ঘর…এই যে জামা দেখছো, এর কাপড় আসে পাকিস্তান থেকে। এখনও প্রতি বছর পাকিস্তান থেকে আমার জন্য জামার কাপড় আর গুড় নিয়ে আসে বন্ধুরা।’ আর এসব কথাবার্তার ফাঁকে অপু তাঁরই বেশ কিছু বইতে তাঁর স্বাক্ষর নিতে চায়। একের পর এক বইতে স্বাক্ষর করতে করতে যখন আবছাভাবে বলে ওঠেন তিনি … ‘কিতনা বুক হ্যায়…’, আর তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে কেউ মিচকে টিপ্পনী কাটে … ‘It just sounds like কিতনে আদমি থে…’, দমকা হাসিতে ফেটে পড়েন তিনি।
আমরা নিশ্চয়ই অনেক সময় নষ্ট করে দিচ্ছি তাঁর। যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াই। তিনি অলস চোখে তাকিয়ে বলেন … ‘আরেকবার করে কফি খেলে হতো না? এখানকার কফিটা বেশ ভালো!’ ফলে বসে পড়ি আবার। চলতে থাকে কথা। বলে চলেন … ‘সেই আট বছর বয়সে পাকিস্তান ছেড়ে চলে এসেছি। অথচ এখনও হুবহু মনে আছে সেখানকার নানা স্মৃতি। একবার অনেক পরে যখন পাকিস্তান গেছি … আমাদের মহল্লায় … দেখা হলো ছোটবেলায় চিনতাম, এমন এক দোকানদারের সঙ্গে। বুড়ো হয়ে গেছে। অথচ স্মৃতি পুরো ঝকঝকে। আমার মা-বোন-মামাদের নাম পর্যন্ত সব মনে আছে তার। আমার পরিচয় পেয়ে, এক মামার নাম করে জিজ্ঞাসা করলো যে, তিনি কেমন আছেন? আমি জানালাম যে, তিনি আর নেই। মারা গেছেন। তারপর সে বুড়ো আমার হাতে একটা পাঁচ টাকার নোট ধরিয়ে বললো .. লে যা! ইয়ে লে যা! আমি হাতজোড় করে বললাম যে .. ক্ষমা করবেন, আমি নিতে পারবো না। কিন্তু আপনি আমাকে দিচ্ছেন কেন টাকাটা? সে বুড়ো জানালো যে, ওই দোকানটা নাকি সে আমাদের থেকে পাঁচ টাকায় ভাড়া নিয়েছিলো। এতদিন আমরা না থাকায় আর ভাড়া দিতে পারেনি। আমাকে দেখে, তাই সে ওই ভাড়ার টাকা দিতে এসেছে। কী বলবো, চোখে জল চলে এসেছিলো আমার! …তাহলে বলো, এ-ও কি বিরাট এক পাওয়া নয়? শুধু বঞ্চনাটাই সত্যি?’
লাউঞ্জ। কাছে-দূরের টেবিলে জটলা চলছে। কিন্তু নির্দিষ্ট টেবিলটাতে থমকে গেল সব। বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে আসি। বাইরে এসেও কানে বাজতে থাকে সেই ব্যারিটোন ভয়েস…মুখোমুখি বসে, তাঁর সাম্প্রতিকতম কবিতার বই থেকে তিনি পড়ে শোনাচ্ছেন — ‘আঁখো কো ভিসা নহি লাগতা / সপনো কি সরহদ হোতি নহি / বন্ধ আঁখো সে রোজ ম্যায় সরহদ পার চলা যাতা হুঁ / মিলনে মেহদী হাসান সে’। আর বলছেন — ‘বলো, এখানে কি তুমি দেখতে পাচ্ছো কোনো কষ্ট? নাকি সে কষ্ট পেরিয়ে যেতে পারছি আমি?’

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]