সঞ্জীব, কথা বলবেন না?

ইরাজ আহমেদ: সঞ্জীব আর কথা বলবেন না আমার সঙ্গে? কথা তো বলতেই পারেন। সেই যে, তেত্রিশ বছর আগে যেমন হঠাৎ একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বিভাগের সামনে আমাকে পেয়ে একটা বই ‘রাশপ্রিন্ট’ বাড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আপনি তো ইরাজ আহমেদ, আমার কবিতার বই বের হয়েছে। পড়ে দেখবেন।’ সেই ঈর্ষনীয় হাসি লেগেছিলো আপনার ঠোঁটে। সাদা হাসি।যে হাসিমুখটি কোনো ভুলতে পারলাম না।আচ্ছা, কোনো দুপুরবেলা অফিসে পায়চারি করতে করতে কাছে এসে আমাকে শুনিয়ে বলতেও তো পারেন, কেউ চাইলে আমার সঙ্গে সাকুরায় যেতে পারে।’ জানতে চাইতে পারেন, ‘আচ্ছা, আমার বাসাটা ঠিক কোথায় যেন?’ যেমন আমাদের অনেক খেই হারানো, ঘর পালানো রাতে আপনি জানতে চাইতেন।

আচ্ছা, না হয় রাগ করে মাঝে অনেকদিন কথা বলিনি আমি আপনার সঙ্গে। তাই বলে এতোটা নৈঃশব্দের শয্যা পাতলেন! পাথরের বালিশ দিলেন মাথার নিচে, শরীর ঢেকে নিলেন আগুনের চাদরে!মনে আছে আপনার. কতকাল আগে এক সকালবেলা আপনার বাসায় বসে গিটার বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন অ্যাল স্টুয়ার্টের অন দ্য বর্ডার গানটা। যৌবনে খুব শুনতাম গানটা। আপনার গলায় অন্যরকম লেগেছিলো। আরেকদিন টিএসসি‘র বারান্দায় গান শুনিয়েছিলেন ‘আমরা করবো জয়’। আপনি তো জিতলেন সঞ্জীব। আমি? আমি কি জিতলাম?আমাকে তো হারিয়ে দিলেন আপনি। নৈঃশব্দের ছুরি চালিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলেন। আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা মৃত্যু সেই ছুরিতে মৃত্যুদিনের একটা কেকের মতো নিপুন ভঙ্গীতে কেটে একটা নৈঃসঙ্গের, নৈঃশব্দের খণ্ড আমাকে উপহার দিলো। মোমবাতি নিভে গেলো এক ফুঁয়ে,আপনি আর থাকলেন না।

আপনি সাংবাদিক ছিলেন। আপনার হাতে তৈরী সাংবাদিকদের অনেকেই রাজত্ব করছে এই শহরের সাংবাদিকতা জগতে। এক সময়ে গিটার হাতে গান গাইতে শুরু করেছিলেন আপনি। অসাধারণ সব গান। এ দেশের মানুষ এখনো আপনার গান শোনে। কিন্তু জানেন,  আমি আপনার গান শুনি না। বলতে পারেন শুনি না। সুতো কেটে গেলে নাটাই ধরে রেখে কী লাভ সঞ্জীব? এই ভীড়ের শহরে, নির্দয় দিনরাত্রির ভেতরে আপনি আর কোথাও নেই। হারানো সময়ের জন্য কষ্ট হয়। চোখ বন্ধ করলে মাঝে মাঝে আপনাকে দেখতে পাই জানেন?আমি সাকুরা থেকে বের হচ্ছি, আপনি কাউন্টারের কোণায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন। সেই আশির দশক। তখন মোবাইল ফোন ছিলো না। ল্যান্ড ফোনই ছিলো আমাদের রাত করে আকূলতা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম। মুখোমুখি হতে আপনি হাত তুলতেন, সেই সাদা হাসিটা লেগে থাকতো আপনার ঠোঁটে। তখন আমাদের চেয়েও অস্থির ছিলো আমাদের ছায়া।আমাদের অস্থির করে মারতো সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনা, পথঘাট, একটা শহর, গোটা দেশ তখন রাজনীতির অস্থির আগুনে পুড়ছে। সেই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম। কতদিন আমাদের দেখা হয়েছে, কতদিন আমাদের দেখা হয়নি। তবু জানতাম তো আপনি আছেন। কবিতা লিখছেন। আমিও লিখছি। সেই বিপজ্জনক শহরে সন্ধ্যাবেলা ছিটকে পড়া আগুনের ফুলকি এড়িয়ে আমাদের দেখা হয়ে যেতো। আমরা আড্ডা দিতাম। কত রাজ্যের কথায় ভরে থাকতো আমাদের পৃথিবী। আমার জানা থাকতো আপনি আছেন। আজ যখন আচমকা মন সংকেত পাঠায় আপনি নেই, আর কোথাও আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না তখন খুব কষ্ট হয়। ওই যে, আপনার সঙ্গে কথা বলিনি রাগ করে কিছু দিন। আমাদের তো আর কথাই হলো না সঞ্জীব! আমি আপনার সঙ্গে অনন্তকাল বসে থাকতে চাই টিএসসি‘র মাঠে, দাঁড়াতে চাই গ্রন্থাগার বিভাগের সামনে, হাত তুলে আপনাকে সম্ভাষণ জানাতে চাই সাকুরার সেই আলো অন্ধকারে, আমাদের সেইসব খেই হারানো রাতে। মাঝে মাঝে মাঝে ভাবি, এই বদলে যাওয়া শহরে আপনি থাকলে কী কথা হতো আমাদের? হয়তো সেই অভিমানের বরফ গলতো না। আবার আপনার সেই সাদা হাসির দাবির সামনে হয়তো আমার সব অভিমান, রাগ তছনছ হয়ে যেতো। আমরা আবার পুরনো জীবনে ফিরে যেতাম সঞ্জীব। আমরা আবার একসঙ্গে হাঁটতাম, টিএসসি‘র আড্ডায় বসতাম, আপনি আমাকে কবিতার বই দিতেন, আমি আপনাকে জানাতাম আমার কবিতার বই বের হচ্ছে। আমরা অনেক সিগ্রেট খেতাম, আমরা ভালোবাসায় বধির হয়ে থাকতাম। আমরা বন্ধুত্বে অমর হয়ে থাকতাম। আপনি আমার সঙ্গে আর কথা বলবেন না সঞ্জীব?

ছবিঃ সংগ্রহ