সত্তর মিলিয়ন পাউন্ডের যান্ত্রিক বিনোদন

স্বরূপ সোহান

আর মাত্র পনেরো মিনিট । সিটবেল্টটা টেনে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বিলেতের আকাশে চক্কর খাচ্ছে আমাদের প্লেন। হয়তো কন্ট্রোল টাওয়ার এর অনুমতির অপেক্ষায়। ঘড়ি জানান দিচ্ছে রাত আটটা বেজে দশ। অথচ বাইরে চকচকে রোদ। লন্ডনে সামারের এটাই মজা। রাত দশটাতেও নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াও। রাত, সে তো বহু দেরী। জানলা দিয়ে তাই সোনা রোদ মাখানো লন্ডন দেখছিলাম। গ্রীষ্মকালে ইউরোপের আকাশ কী যে নীল! যেনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে ভেসে বেড়াচ্ছি। আর তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, লন্ডন আইয়ে চড়ে নীল আকাশ দেখবো। বললেই তো আর হলো না। হ্যাপা আছে। সামারের লন্ডন আই মানে একেবারে মৌচাকে ঢিল। পর্যটকদের ভীড়ে ঠাঁই পাওয়াই মুশকিল। গুগল বলে দিল, টিকেট আগে কাটা না থাকলে খবর আছে। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটতে হবে। তারপর কখন আবার ভীড় ঠেলে কাঙ্ক্ষিত সেই নাগরদোলায় চড়া যাবে তা কেউ বলতে পারেনা। তাতে কি? দমে গেলে চলবে না। আর তাই ওয়েষ্টমিন্সটার রুটের টিউবে চেপে এক বিকেলে টেমস নদীর পাড়ে পৌঁছলাম ।

বিশ্বখ্যাত ঘড়ি বিগ বেন কে পাশে রেখে লন্ডন ব্রীজে সবে উঠেছি, আর তখনই চোখে পড়ল ধবধবে সাদা এক বিশাল চাকা। শেষ বিকেলের আলোয় টেমস নদীর জলে প্রতিফলিত হচ্ছে তার অপরূপ স্থাপত্য সৌন্দর্য । বিশ্বের সবচাইতে আকর্ষনীয় ফেইরিজ হুইল, ‘দ্য লন্ডন আই’। যদি ভাবেন কি আর এমন হবে লন্ডন আইতে না চড়লে? আপনি কিন্তু বিলেত ভ্রমনের বড় কিছু একটা মিস করে গেলেন। হিসাবটা দিলেই বুঝতে পারবেন। প্রতিবছর ৩.৫ মিলিয়ন পর্যটক এই স্বপ্নের নাগরদোলায় না চড়ে বিলেত ছাড়েন না। ভাবা যায়। যান্ত্রিকতা দিয়েও যে পর্যটকদের সম্মোহিত করা যেতে পারে, এই অভিনব ভাবনাটা এসেছিল স্থপতি দম্পতি ডেভিড মার্কস আর জুলিয়া বারফিল্ডের মাথা থেকে। নতুন শতকের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে এই দম্পতি ভাবলেন এমন একটা কিছু তারা নকশা করবেন যেটা লন্ডন শহরকে নতুন শতকে উন্মোচন করবে। সাল ১৯৯৮। তারা নকশা করলেন এক বিশাল চাকা। তাদের চোখে এই চাকা হচ্ছে সময়ের চাকা। এই চাকা ঘুরিয়েই নতুন শতকে প্রবেশ করবে লন্ডন! আর এই চাকাই হয়ে উঠবে পর্যটকদের বিনোদনের কেন্দ্র ।

শুরু হল নির্মান কাজ। লন্ডনের টেমস নদীর সাউথব্যাংকে যখন নির্মান কাজ শুরু হয় তখন এটির নাম ছিল মিলিনিয়াম হুইল।১৯৯৯-এর অক্টোবরে চাকা বানানোর কাজ শেষ হয় এবং ২০০০-এর মার্চে প্রথম এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তখন থেকেই এর নাম লন্ডন আই। যা হওয়ার তাই হলো। টিকিটের লম্বা লাইন ধরতে হলো। প্রায় একঘন্টা পেরুনোর পর কাউন্টারে এক লাস্যময়ীর দেখা পেলাম। জানা গেল, মার্লিন এন্টারটেইনমেন্ট এই লন্ডন আইর ব্যবসাটা অফিসিয়ালি ম্যানেজ করে।যেহেতু পুরোদস্তুর ব্যবসা তাই টিকেটের দাম, বিভিন্ন অফার, পার্শ্ববিনোদনেরও রকমফের আছে। আছে রাইডে চডার আগে থ্রিডি শো। চোখে চশমা পড়ে ঢুকে পড়লাম থ্রিডি দেখতে। সে এক দারুন অভিজ্ঞতা। বিশাল চাকার ঘুর্নি মনে হয় মাথার উপর দিয়ে ঘুরছে। মনে হচ্ছিল হাত বাডিয়ে দেই ঘুর্নি বন্ধ করে। কিছু পর্যটককে দেখলাম সত্যি সত্যি অন্ধকারে হাত নাড়ছে। আজব বিনোদন।

অবশেষে ১৩৫ মিটার উঁচু বিশাল চাকা লন্ডন আইয়ের নীচে চলে এলাম লাইন ধরে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বর্নের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই চাকার চুড়ায় উঠবে বলে।এই চাকায় মোট ৩২টি ক্যাপসুল আছে।যাত্রী বহনকারী ক্যাপসুলগুলোর নকশা করা হয়েছে এমনভাবে যেনো পর্যটকরা থুব সহজে অনেক উঁচু থেকে লন্ডন শহরটিকে দেখতে পারেন। ক্যাপসুলগুলোকে চাকার বাইরের দিকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের চোখের সামনে কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসে। ফলে যখন একটি ক্যাপসুল চাকার সবচেয়ে উঁচুতে পৌঁছে যায় তখন ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা পর্যবেক্ষকরা ৩৬০ ডিগ্রিতে প্যানারমিক ভিউতে পুরো লন্ডন শহর উপভোগ করতে পারেন। সত্যি তাই।

ক্যাপসুলে চড়ে যখন ধীরে ধীরে উপরে উঠছিলাম, মনে হচ্ছিল গভীর নীল আকাশে ভেসে ভেসে পুরো লন্ডন শহরের সৌন্দর্য দেখছি। সে এক অপার্থিব অনুভুতি। আর তাই হয়তো অনেকেই জীবনের সবচাইতে মুল্যবান মুহুর্তটির জন্যে এই ক্যাপসুল ভাড়া করেন। প্রোপোজ থেকে বিয়ে, যাই হোক না কেনো ক্যাপসুল পুরো মুহুর্তটি বন্দী করে ভেসে বেড়াবে আকাশে।

৭০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে বানানো লন্ডন আই আদতে এক পুরোদস্তুর যান্ত্রিক বিনোদন। প্রতিদিন বিশ সহস্রাধিক মানুষ এই বিশাল ষন্ত্রটি থেকে বিনোদিত হন। আর এভাবেই অনেক সময় প্রকৃতিকে ঠেলে দিয়ে যান্ত্রিকতায় সুখ খুঁজে ফেরে মানুষ।

ছবিঃ লেখক