সত্যজিতের কমলবাবু

সত্যজিৎ রায় এবং কমলকুমার মজুমদার বন্ধু ছিলেন। একজন সেলুলয়েডের জাদুকর অন্যজন বাংলা সাহিত্যের ভিন্নমাত্রার পদাতিক।কেমন ছিলো সে বন্ধুত্ব? সত্যজিৎ রায় ছিলেন বেশ অনেকটাই গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। উল্টোদিকে কমলকুমার মজুমদার ইংরেজিতে যাকে বলে সিনিক। প্রায় বিপরীত মেরুর দুজন মানুষ।কিন্তু বন্ধুত্বের সংযোগ সেতু ছিলো তাদের মাঝে। দু’জনে সিনেমা দেখতেন একসঙ্গে, কমলকুমার মজুমদার রায় বাড়িতে গিয়ে আড্ডাও দিতেন।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে একদা সিনেমা দেখার নিয়মিত সঙ্গী ছিলেন কমলকুমার। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, ‘ছবি সম্বন্ধে কমলবাবুর মতামত ছিলো গতানুগতিকতার বাইরে। ‘ব্রীফ এনকাউন্টার’ দেখে প্রশংশা করেই বললেন, ‘ঠিক যেন অরপেনের ছবি’। ‘রাশো-মন’ দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ; কমলবাবুকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘যেখানে পুলিশটা ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে নদীর পাশ দিয়ে যচ্ছে, সেই জায়গাটা ভালো’।একদিন কমলবাবুর সঙ্গে মেট্রোতে ঢুকছি, এয়ার কন্ডিশন-এর হিমেল দমকার সঙ্গে সঙ্গে একটা গন্ধ এলো নাকে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার থলেতে কী?’ কমলবাবু চটের থলে ফাঁক করে দেখালেন -মাংস। গরুর মাংস। সেই প্রথম জানলাম যে তিনি নাকি সম্প্রতি একটি অ্যালসেশিয়ানের মালিক হয়েছেন ‘

কিন্তু এহেন কমলকুমার মজুমদার ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ মুক্তি পাবার পর সেটা দেখতে যাননি। সত্যজিৎ রায়ের জবানীতে, ‘অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও কমলবাবুর মনে ছবিটা দেখা সম্বন্ধে কোনো উৎসাহ সঞ্চার করতে পারিনি। আমি অবশ্যি নিরুদ্যম হইনি। শেষে একদিন যখন সত্যই দেখলেন, তখন হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। আমারই এক পরিচিতের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় রাস্তায়, তাকে বললেন, ছবিতে মাত্র একটি দৃশ্য ভালো লেগেছে-যেখানে অপু-দুর্গা চিনিবাস ময়রার  পিছন ধাওয়া করে। খবরটা শুনে কিঞ্চিৎ অভিমান হয়েছিলো। রাশো-মন-কে-ও যে এককথায় বাতিল করেছিলেন সেটা ভেবে কোনো সান্ত্বনা পাইনি।এর বেশ কিছুদিন পরে যখন ভদ্রলোকের সঙ্গে আবার দেখা হয়, তখন ছবিটির প্রসঙ্গ আর তুলিনি, আর মনেও সেই সম্পর্কে আর কোনো উষ্মার ভাব ছিলো না; কারণ ততদিনে হৃদয়ঙ্গম করেছি, পল্লীগ্রামের জীবন নিয়ে ছবি করে কমলবাবুকে খুশি করার ক্ষমতা আমার নেই।’

অদ্ভুত ধরণের মানুষ ছিলেন কমলকুমার মজুমদার। কথা থেকে শুরু করে জীবনযাপন সবকিছুতেই ছিলো এক ধরণের খামখেয়ালীপনা। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘কমলবাবু’ লেখায় এই অদ্ভুত মানুষটির বাড়ি বদলের বাতিকের কথাও উল্লেখ করেছেন।তিনি নাকি কাউকে না জানিয়ে হুট করেই বাড়ি বদল করতেন। কমলকুমার মজুমদারের এই স্বভাবের কথাটা প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন। একবার কোনো এক বাড়িতে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা হয় কমলকুমারের। সত্যজিৎ রায়ের লেখায় আছে, ‘বছর পাঁচেক আগে কোন এক শ্রাদ্ধবাসরে কমলবাবুর সঙ্গে দেখা। আগে প্রায় সাক্ষাৎ হতো; কোনো একটা বিশেষ কারণে দীর্ঘকাল ছেদ পড়ে। ভদ্রলোককে দেখে অসুস্থ মনে হওয়াতে জিগ্যেস করলাম কী হয়েছে। বললেন হাঁপানি। তার জন্য কী করেন জিগ্যেস করতে বললেন, ‘রাত্তিরে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।’ প্রশ্ন করলাম, ‘চিকিৎসা করান না?’ কমলবাবু বললেন, ‘ না। সাফারিং-এর মধ্যে একটা গ্র্যাঞ্জার আছে।’

‘কথাটা অন্য কেউ বললে আদিখ্যেতা মনে বলে মনে হতো; কিন্তু কমলবাবুকে যারা চিনতেন তারা বুঝবেন এ ধরণের কথা তাঁর মুখে মানিয়ে যেত। তিনি মানুষটা ছিলেন একটা বিশেষ ছাঁচে গড়া; আর পাঁচ জনের সঙ্গে সে গড়নে বিশেষ মিল নেই। আপাতবিরোধী এতগুলো দিক তাঁর চরিত্রের মধ্যে ছিলো যেমন আর কোনো মানুষের মধ্যে দেখিনি। নানান অসামান্য গুণের অধিকারী হয়েও সেই সব গুণের বর্ণনা দিয়ে সমগ্র মানুষটাকে ফুটিয়ে তোলা যায় না। তিনি যেন অত্যন্ত সাধারণ ভাবেই একটি রুক্ষ্ন, অমার্জিত, আটপৌরে চেহারায় নজেকে সবার সামনে হাজির করতেন।

কমলকুমার মজুমদারের আঁকা ছবি

তাঁর কথার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যেত ঠিকই-সত্যি বলতে কি বাকপটুতায় তাঁর সমকক্ষ কাউকে দেখিনি।’

কমলকুমার মজুমদার ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় ও সকুমার রায়ের ভীষণ ভক্ত। আর এই ভক্তি তাকে আকর্ষিত করেছিলো সত্যজিৎ রায়ের প্রতি। এমন ধারণাটা ছিলো একান্তই সত্যজিৎ রায়ের। তখন প্রায় সন্ধ্যায় কমলকুমার যেতেন রায় পরিবারের বাড়িতে আড্ডা দিতে। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, ‘একপেশে আড্ডা, কমলবাবু বক্তা, আমি শ্রোতা। লক্ষ করতাম কথার মধ্যে ফরাসি শব্দ এনে সেটা ফরাসি কায়দায় উচ্চারণ করতে পছন্দ করতেন। একবার জিগ্যেস করলেন,‘তুর দ্যেইফেলে’র কাছে একটা শিল্পসংগ্রহশালা আছে সেটা সম্বন্ধে জানি কিনা। তখন তাঁকে চেপে ধরতে বললেন বাড়ির গুরুজনদের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি নাকি বাড়িতেই খাটের তলায় ঢুকে ফরাসি শিক্ষা করেছেন। তাঁর চটের থলিতে যে একটা-না-একটা ফরাসি বই সবসময় থাকে সেটা লক্ষ করেছিলাম।

সত্যজিৎ রায়ের এই লেখা থেকে জানা যায় কমলকুমার মজুমদারের ফিল্ম করার ইচ্ছা ছিলো। দু’টি কাহিনিকে আশ্রয় করে কিছু সময় ও চিন্তা তিনি ব্যয় করেছিলেন। সে দুটি কাহিনি ছিলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অভাগীর স্বর্গ’ রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’। দু’টি কাহিনির জন্য তিনি দু’হাজারের বেশি ফ্রেম স্কেচ করেছিলেন বলে জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে। এর মধ্যে মাত্র পঞ্চাশটি স্কেচ তিনি বন্ধুকে দেখিয়েছিলেন।

কমলকুমার মজুমদারের কথা ছিলো ভীষণ ধারালো। সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘জনৈক বামপন্থী কবি সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য হলো-‘ভদ্রলোক সোশ্যল কনটেন্ট না থাকলে নস্যি নেন না।’ চাষি-মজুরদের হাল সম্পর্কে শহরের মার্কসিস্ট বাবুরা উৎকন্ঠিত সে কথা চাষি-মজুররা জানে কি? কমলবাবুর ভাষায়, ‘ব্যাঙের লাতিন নাম আছে ব্যাঙ তা জানে কি?’

আরেকবার কফি হাউসে এক বন্ধুর নিয়মিত ডবল ডিমের অমলেট খাওয়া নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ডিমের অতখানি করে খেলে পাঁচটা মেয়েমানুষ রাখতে হয় গো!’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ কমলকুমার মজুমদারের চিঠি গ্রন্থ থেকে।
ছবিঃ গুগল