সত্যজিতের যা চাই খাইতে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে বসতো খামখেয়ালি সভা। এই সব সভায় নানা ধরণের মুখরোচক খাবার পরিবেশিত হতো। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর হাতে তৈরি দইয়ের মালপোয়া, মানকচুর জিলাপির মতো অদ্ভূত খাবারের আত্মপ্রকাশও নাকি এ সব আসরেই। আর প্রখ্যাত বাঙালি লেখক শিবরাম চক্রবর্তী তো বলেই গেছেন, তাঁর জীবনের লক্ষ্য দুটো-‘খাই আর শুই’।কিন্তু আর এক বিখ্যাত বাঙালি সত্যজিৎ রায় কিন্তু দইয়ের মালপোয়া আর মানকচুর জিলাপি বিষয়ে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না।‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় যতোই তিনি আকাশ থেকে মাংস, লুচি, কোর্মা, পোলাও আর মিষ্টি ঝরে পড়ার দৃশ্য দেখান না কেনো সিনেমা, শুটিং, চিত্রনাট্য আর গল্প লেখা, ইলাসস্ট্রেশনের কাজের ভিড়ে খাবারের মেন্যুতে ছিলো তাঁর খুব কড়াকড়ি। খেতেন কিন্তু খাবারের মাত্রাবজায় রাখতেন। লুচির সঙ্গে অড়হড়ের ডাল ছিলো প্রিয়। পছন্দ করতেন ভাত, ডাল আর ইলিশ মাছ।পছন্দের তালিকায় ছিলো, আলু আর ফুলকপির তরকারিও।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে সত্যজিৎ রায়ের পছন্দের খাবার নিয়ে রইলো ‘সত্যজিতের যা চাই খাইতে’।

সত্যজিৎ রায়ের অনন্য গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা খেতে পছন্দ করতো চা আর চানাচুর। একদিন নাকি সত্যজিৎ রায় শুটিংয়ের সেটে শিল্পী অনুপ ঘোষালকে বলেছিলেন, `মুড়ি তেল দিয়ে খায় এটা তো দেখেছ, তবে মুড়ি যে ঘি আর বেশ দানা দানা চিনি দিয়েও খায় সেটা জানো?’ ফেলুদার গোয়েন্দা কাহিনিতে সত্যজিৎ রায় বিচিত্র ধরণের খাবারের কথা উল্লেখ করেছেন। সে তালিকায় ওমলেট, মাছ ভাজা,পাঠার মাংসের ঝোল, লুচি, আলুর তরকারি, চিকেন কাটলেট, বেকড বিনস, রুটি মাখন মারমালেড, কমলালেবু, স্যুপ, মাছ, মাংস, তরকা, মিহিদানা, নতুন গুড়ের সন্দেশ, ওয়ার্ডলফের চীনা খাবার, খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা, ডিমের বড়া, বেগুনি, ডাল ইত্যাদি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু কেমন ছিলো তার খাবারের তালিকা? ব্রেকফাস্টে তাঁর প্রিয় ছিলো, সেদ্ধ ডিমের সাদা অংশ দিয়ে স্ক্র্যাম্বল, টোস্ট আর কর্নফ্লেক্স। তবে ব্রেকফাস্টের শেষে এক কাপ দার্জিলিং চা ছিলো তার মেন্যুতে বাঁধা। সারাদিনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে সত্যজিৎ রায় এই চা বেশ কয়েকবার খেতেন। দুপুরে ভাত খেতেন। সঙ্গে মসুর ডাল আর যে কোনো মাছ। সব বাঙালির মতো মাছ নিয়ে তিনি কাতর না-হলেও ইলিশ মাছ ছিলো প্রিয়। তবে একসঙ্গে কখনোই তাকে দু‘টুকরোর বেশি মাছ খেতে দেখা যায়নি।

সত্যজিৎ রায় নিজে পরিমিত আহার করতেন বলেই হয়তো তার সিনেমায় খাবার অথবা খাওয়ার দৃশ্য খুব একটা জায়গা জুড়ে থাকেনি। অবশ্য তাঁর ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমা এর ব্যতিক্রম। সেখানে রাশি রাশি খাবার আকাশ থেকে ঝরে পড়েছিলো ভূতের রাজার বরের ম্যাজিকের জোরে। গুপী আর বাঘার খাওয়ার দৃশ্যে সত্যজিৎ রায় গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে অভূক্ত মানুষের ভালো খাবার আর পেট ভরে খাওয়ার স্বপ্নকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

‘নায়ক’ সিনেমায় উত্তমকুমারকে মদ্যপান করতে দেখা যায়। ‘জনারণ্য’ ছবিতে উৎপল দত্তকে কলা খেতে দেখা যায়। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে লালমোহন বাবু মগনলাল মেঘরাজের দেয়া লস্যি খেয়েছিলেন। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে চার তরুণকে দেখা যায় মুরিগীর ঝোল আর ভাতের জন্য অস্থির হতে। প্রকৃতপক্ষে সত্যজিৎ রায়ের লেখার পাশাপাশি সিনেমাতেও খাবার এসেছে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে। হয়তো খাদ্য এবং খাদক এই দুই বিষয়ে স্বল্পাহারি সত্যজিৎ রায়ের একান্ত মানসিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিলো সেগুলো।

সত্যজিৎ পাঁঠার মাংস খেতে পছন্দ করতেন। বলতেন, ‘মুরগীর মাংসের আবার কোনো স্বাদ আছে নাকি!’ তবে স্টুডিওতে কাজের ফাঁকে স্যান্ডউইচ, আর একটু দই হলেই তাঁর হয়ে যেত। দই খেতে খুব পছন্দ করলেও মিষ্টির মধ্যে রসগোল্লা ছিলো তাঁর পছন্দের শীর্ষে। তবে নিজে ব্যস্ততার দিনগুলোতে খুব সামান্য আহার করলেও ইউনিটের অন্যদের দুপুরের ভাত খাওয়া থেকে বঞ্চিত করতেন না কখনও। সবার জন্য এক ধরণের পিকনিক করে খাওয়ার ব্যবস্থা হতো। সেখানে খাবারের মান নিয়ে অসম্ভব খুঁতখুঁতানি ছিলো সত্যজিৎ রায়ের। তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় থাকতেন খাওয়া-দাওয়ার দিকটা সামলানোর দায়িত্বে। প্রত্যেকে যেন ভালো মাছ পায়। তরকারি ঠিকঠাক হয়েছে কিনা এসব নিয়ে সত্যজিৎ রায় নিজে খোঁজ নিতেন। অভিনেতা সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের খাওয়া বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কলকাতার ফেমিনা পত্রিকায় বলেছেন, ‘মনে আছে, ‘সোনার কেল্লা’র শ্যুটিংয়ে আমরা যখন জয়সলমিরে গিয়েছিলাম, তখন তো ওখানে ধু-ধু বালির প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই ছিলো না, যোধপুর থেকে চাল-ডাল-আলু-ডিম কিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। রান্না হতো সার্কিট হাউসে। মেন্যু বলতে ছিলো সেদ্ধ ভাত আর খিচুড়ি। কিন্তু সেই সামান্য খাবারটাই এত যত্ন নিয়ে প্রস্তুত করা হতো যে খেলে মন ভরে যেতো!’

একটা সময়ে সত্যজিৎ রায়ের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট দেখতে না-পাওয়াটাই ছিলো বিষ্ময়। কখনো কখনো ঠোঁটে ঝুলতো পাইপ। প্রচুর ধূমপান করলেও তিনি মদ্যপান তেমন একটা করতেন না। কাজের বেলায় ভীষণ নিয়মানুবর্তী সত্যজিৎ রায় শুটিংয়ের দিনগুলো ছাড়া সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করতেন। মাঝে মদ্যাহ্নভোজনের পর এক ঘন্টা বিশ্রাম নিতেন। নিজের সিনেমার শুটিং চলার সময় এই মধ্যাহ্নভোজনে সব সময় বেশ ভারী খাবারের আয়োজন রাখতেন। সবার জন্য ভাত এবং রুটির ব্যবস্থা থাকতো। দুই পদের তরকারি মধ্যে একটি হতো আমিষ। খাবার শেষে মিষ্টি, চা অথবা কফি। সত্যজিৎ রায় কিন্তু শুটিং চলার সময় বাড়ি থেকে ব্রেকফাস্ট করে সেটে আসতেন। অন্যদের জন্য খাবারের মেন্যুর সঙ্গে তাঁর মেন্যু কখনোই মিলতো না। শুটিংয়ের সময় তিনি দুপুরে খেতেন স্যান্ডউইচ, মিষ্টি। চা ও সিগারেট থাকতো প্রায় ছায়াসঙ্গী হয়ে। তবে সত্যজিৎ রায়ের খাবারে ফল থাকতো অনুপস্থিত। ফল খেতে তিনি খুব একটা পছন করতেন না।

সত্যজিৎ রায় হোটেল বা রেস্তোরাঁয় খেতে যেতেন কম। তবে কলকাতা শহরের বিখ্যাত ‘ফ্লুরিজ’ রেস্তোরাঁয়  প্রায় রবিবারই সপরিবারে সত্যজিৎ রায়ের আগমন ঘটতো ইংলিশ ব্রেকফাস্ট খাওয়ার জন্য। কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর ঘনিষ্ট মানুষদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, নিজের বাড়ির খাবারটাই  সত্যজিৎ রায়ের পছন্দ ছিলো বেশি। জন্মদিনে বাড়িতে তাঁর পছন্দের খাবার রান্না হতো। তবে সেই আয়োজনে বাইরের মানুষের প্রবেশাধিকার ছিলো না। জন্মদিনে তিনি নিজের মতো করে পছন্দের খাবার খেয়ে সময় কাটাতেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ প্রথমা, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ফেমিনা, আজকের পত্রিকা, ডিইলি
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box