সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ

সত্যজিৎ রায় ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রটি। শান্তিনিকেতনে ছবি আঁকা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। মনের মধ্যে ভীষণ এক অবেগ নিয়েই কাজটা করতে শুরু করেছিলেন।

পরিকল্পনা করেছিলেন তথ্যচিত্রে বাংলার ছয় ঋতুর কথা বলা হবে এবং তার মধ্যে বর্ষা কালই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয়, ধারাভাষ্যে এমন একটা লাইন রাখা হবে। আবহ তৈরি করতে ব্যবহার করা হবে বর্ষা বিষয়ক কোনও একটি বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত। তারপর এক ঘোর বর্ষায় শুটিং শুরু হয় পদ্মার তীরে। সকাল থেকেই বৃষ্টি হয়ে চলছে অবিরাম। আর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কাজ চলছে তখন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বের শুটিং-এ। সত্যজিৎ রায়ের তখনকার সিনেমাটোগ্রাফার সৌমেন্দু রায় তাঁর একটি লেখায় সেদিনের ঘটনাটা উল্লেখ করেছেন এভাবে, শুটিং চলার সময়  মানিকদা হঠাৎ ভরাট কণ্ঠে আমাকে বললেন, ‘‌‌তোমার ক্যামেরাটা দাও তো।’‌ তাঁর হাতে ক্যামেরা দেওয়ার এক মুহূর্ত আগেও টের পাইনি যে মানিকদা উত্তাল নদীতে নেমে যাবেন। প্রথমে তিনি হাঁটু–‌জল অবধি নেমে দাঁড়ালেন। তারপর সোজা বুক‌–‌জলে চলে গেলেন ক্যামেরা নিয়ে। এমন সময় আমাদের ইউনিটের কেউ একজন বলে উঠল, ‘মানিকদা আপনার ঘড়িটা?’ স্পষ্ট মনে আছে, মানিকদা জল ঠেলতে–‌ঠেলতে পিছন না ফিরে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ওয়াটারপ্রুফ’। বৃষ্টি গায়ে ফুটছে তীরের ফলার মতো এসে। মানিকদা তার মধ্যে ওই ভারী, পেল্লাই ক্যামেরায় চোখ রেখে শট নিচ্ছেন। আমিও অতি কষ্টে জলের উল্টো স্রোত ঠেলে মানিকদার পাশে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মানিকদার বুক–‌জল মানে আমার তো গলা–‌জল । প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম। নদীর জলে বৃষ্টির বড়–‌বড় ফোঁটা এসে পড়ছে। মানিকদা সেই দৃশ্যকে ধরবার চেষ্টা করছিলেন। আকাশে মেঘ ডাকছিল ক্রমাগত।’‌

সৌমেন্দু রায়ের লেখায় ফুটে উঠেছে এক অন্য সত্যজিৎ রায়ের ছবি। নিখুঁত কাজের জন্য সারাটা জীবন সাধনা করে গেছেন এই অমর চলচ্চিত্রকার। সৌমেন্দু রায় লিখেছেন, ‘‌আমি জানি না, অন্য কোনও পরিচালক এমন রিস্ক নিতে পারতেন কি না। বর্ষায় পদ্মা খুব বিপজ্জনক। যে কোনও মুহূর্তে মাটিতে ভাঙন ধরতে পারে। মানিকদা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে এমন‌ই ইনভল্‌বড ছিলেন। সামনে কোনও রকম বাধাকে তোয়াক্কা করেননি সেদিন। মানিকদা সেই উত্তাল পদ্মায় শুধুমাত্র ভাল শট পাওয়ার জন্য মৃত্যুভয়কে জয় করতে পেরেছিলেন।’‌

প্রাণের বাংলা ডেস্কতথ্য
সূত্রঃ আজকাল, কলকাতা
ছবিঃ গুগল