সত্যজিৎ, বার্গম্যান ও দ্য সাইলেন্স

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘দ্য সাইলেন্স’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালে। ততোদিনে ইঙ্গমার বার্গম্যান পৃথিবীজুড়ে কিংবদন্তীসম পরিচালক। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,‘‘এমনকি নিজের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বেশ্যার কাজও করতে পারি। প্রয়োজন পড়লে চুরি করব, শিল্পের কারণে নিজের বন্ধুকেও খুন করতেও রাজি আছি।’’ ‘দ্য সাইলেন্স’ ছবিটি মুক্তি পাবার পর বার্গম্যানের বিরুদ্ধে সিনেমায় যৌনতা ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হলো। কয়েক বছর আগে তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরেও সমালোচিত হলেন এই পরিচালক। অবশ্য এ ধরণের সমালোচনার ঢিল পাটকেল ছুটে আসার বিষয়ে বার্গম্যান অভ্যস্তই ছিলেন। ১৯৬৩ সালে সুইডেনে বসে ‘প্লেবয়’ পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। চার্চ এবং রক্ষণশীল গণমাধ্যম অস্ত্র ধারণ করেছিলো এই চলচ্চিত্রকারের বিরুদ্ধে। তারা বলেছিলো, জনগণকে স্থুল ভাবে আঘাত করার জন্যই বার্গম্যান তার ছবিতে যৌনদৃশ্যগুলো ব্যবহার করেছেন।

কী ছিলো সেই যৌনদৃশ্যে? ছবির রোগগ্রস্থ নায়িকা এস্থার বিছানায় শুয়ে পাজামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে স্বমেহন করছে। এই দৃশ্যটিকে ঘিরেই বিতর্কের ঝড় ওঠে। অভিযোগের আঙুল তোলা হয় বার্গম্যানের দিকে। ষাটের দশকের সিনেমায় এই দৃশ্য দেখে দর্শকরা নড়েচড়ে বসে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সত্তরের দশকে ‘কলকাতা’ নামে একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বার্গম্যানকে সমর্থন করেন। ‘অনেক ছবিতেই দেখি পরিচালক যৌনতাকে বাজার-চাহিদার কথা ভেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু ‘দ্য সাইলেন্সে’ যেভাবে দেখানো হয়েছে ওভাবে ছাড়া ছবিটা হতোই না।’

বার্গম্যানের সিনেমা, বিশেষ করে এই ছবিটি নিয়ে সত্যজিৎ রায় বরাবরই আচ্ছন্ন ছিলেন। তিনি ১০৮০ সালে ‘পিকু’ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। গল্পে খুব বেশি নৈকট্য না থাকলেও ‘পিকু’ ছবির বহু জায়গায় সত্যজিৎ রায় েএই অগ্রজ সুইডিস নির্মাতার ফ্রেম অনুসরণ করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটু লক্ষ্য করে দেখলে বোঝা যাবে পিকু‘র নির্মাণে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে বার্গম্যানের ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে। ‘সাইলেন্সে’-এ বিছানায় শুয়ে থাকতো অসুস্থ এস্থার। আর পিকু ছবিতে পিকুর দাদুকে আমরা দেখতে পাই মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে। ‘পিকু’ ছবিতে পিকুর মায়ের তার প্রেমিকের সঙ্গে বেডরুমে সঙ্গম দৃশ্যটিও কিন্তু যোহানের মায়ের এক অর্ধপরিচিত পুরুষের সঙ্গে শারীরিক মিলনদৃশ্যের থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

বার্গম্যানের যোহান চরিত্রটি এক নিষ্পাপ সত্তা। বয়স্ক মানুষদের দুর্দশা আর চরিত্রের কদর্যতার নীরব দর্শক সে। চমকে উঠতে হয় যখন দেখা যায় ‘পিকু’ ছবিতে দেখা যায় পিকু তার দাদুর মৃতদেহ যখন আবিষ্কার করে বাবা কাজের জায়গায় আর বন্ধ শোবার ঘরে মা আর হিতেশ কাকু সঙ্গমরত। অসহায় পিকু কী করবে বুঝতে না পেরে বারান্দায় বসে ছবি আঁকতে শুরু করে।

বার্গম্যান ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’।‘উইন্টার লাইট’ আর ‘দ্য সাইলেন্স’ মুক্তি পায় ১৯৬৩ তে। এই তিনটি সিনেমাতেই চরিত্রের  মনস্তাত্বিক টানাপোড়েনই বড় হয়ে উঠেছে। সত্যজিৎ রায়ও তাঁর জীবনের শেষের দিকে এ ধরণের সিনেমার দিকে বেশি ঝুঁকেছিলেন। তিনিও হয়তো প্রিয় পরিচালক বার্গম্যানের মতোই কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন নিজ হাতে এবং নিজস্ব ভাষায়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ ফিচার

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]