সত্যজিৎ রায়ের সেই খাতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘চারুলতা’ সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি করার আগে ‘নষ্টনীড়’-এর পুরো কাহিনিটি সত্যজিৎ রায় চারবার লিখেছিলেন। এই চারটি খসড়া থেকেই তৈরি হয়েছিলো তাঁর সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ বিষয়ক খেরো খাতায় তাই ছিলো না কোনো সংলাপ, চিত্রনাট্যের দৃশ্য-বিবরণ। এই চারবার লেখার মধ্যে দেখা যায়,  প্রথমবার তিনি যখন গল্পটা লিখেছেন তখন তাঁর পাশে আছে রবীন্দ্রনাথের গল্পটি। তারপরে তিনি সেই গল্পটিকে সাজিয়েছেন ছবির মতো করে। তৃতীয় বার মোট ৯টি  সিকোয়েন্সে সংক্ষেপে ঢেলে সাজান গল্প আর চতুর্থবার ওই ৯টি সিকোয়েন্সকেই গল্পের ধাঁচে বিস্তৃত করেছেন। তখনো ‘চারুলতা’ নামকরণের কথা ভাবেননি তিনি।

রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে ১৯৬১ সালে ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ভূপতি চরিত্রে ভেবেছিলেন অভিনেতা কালী ব্যানার্জির কথা। চারুলতা চরিত্রের জন্য তাঁর মাথায় ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। ‘নষ্টনীড়’-এর  চিত্রনাট্য লেখা আর তা নিয়ে ভাবনার শুরুটা ছিলো ১৯৫৯ সালের জানুয়ারী মাসে। তখন তিনি ‘অপুর সংসার’ ছবির শুটিং করছিলেন। একই বছরের ২২ মে তারিখে সত্যজিৎ রায় লিখতে শুরু করেন ‘নষ্টনীড়’।চিত্রনাট্যের প্রথম পাতাতেই লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড়’। গুরুদেবের সইয়ের ধাঁচে ‘রবীন্দ্রনাথের’ শব্দটি লেখা। তার নীচে একটু বড়ো হরফে লেখা ‘নষ্টনীড়’।

‘চারুলতা’ ছবি মুক্তি পাবার পর ৫৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘প্রহর’ পত্রিকায় শুভেন্দু দাশমুন্সীর লেখা ‘চারুলতার খেরোর খাতা’ লেখা অবলম্বনে ‘সত্যজিৎ রায়ের সেই খাতা’।

সত্যজিৎ রায় তাঁর চিত্রনাট্য লেখার জন্য খেরো খাতা ব্যবহার করতেন। সেখানে তাঁর বিভিন্ন গল্প ভাবনার পাশাপাশি আঁকা আছে নানান ধরণের নকশা, ক্যালিগ্রাফি। সেরকম একটি খাতায় শুরু হয়েছিলো ‘চারুলতা’ ছবির গল্পসূত্র লেখা। কেমন করে শুরু হয়েছিলো সেই কাজ? ১৯৫৯ সালে শর্মিলা ঠাকুর প্রথম অভিনয় করেন ‘অপুর সংসার’-এ, পয়লা মে ১৯৫৯-এ মুক্তি পেল সেই ছবি আর বাইশে মে সত্যজিৎ তাঁর পরের ছবি ‘নষ্টনীড়’ বা ‘চারুলতা’-র জন্য চূড়ান্ত করে ফেলেন শর্মিলা ঠাকুরের নাম। সেই খাতায় প্রথমেই লেখা রয়েছে ‘ভূপতি-চারু। ভূপতি শ্যালক উমাপদর সঙ্গে ইংরিজি কাগজ চালায়। চারুর boredom— ভূপতির realization— ‘তোমার একজন সঙ্গী চাই’ উমাপদ’র স্ত্রী মন্দাকিনী এসে চারুদের বাড়ি থাকে।’ এরপরের অংশের শুরুতেই লেখা ‘অমল- চারু’। তারপরে ‘অমল থার্ড ইয়ারে পড়ে। চারুর  লেখাপড়ার শখ— অমল মাস্টারি করে। চারু-অমলের companionship। মন্দা গৃহকর্ম নিয়ে থাকে— সে অমলের উপর অপ্রসন্ন। বাগান করার plan। বাগানে চারু-অমল। মন্দা— ‘তোরা কী করছিস?’— ‘আমড়া খুঁজছি।’’ এর পাশাপাশি খাতায় একদিকে আড়াআড়ি করে লেখা, ‘অমল ভূপতির ইংরিজি প্রুফ সংশোধনের কাজে সাহায্য করত।’

এই পুরো বিবরণ মূল গল্প থেকে তুলে এনে আরেকবার লিখছেন সত্যজিৎ, তাঁর খেরোর খাতায়। ঠিক এইভাবে পুরো গল্পটাকেই আরেকবার নিজের মতো প্লট-অনুসারে একটার পর একটা ঘটনা পরম্পরায় বসানোর কাজটি তিনি করেছিলেন পুরো চিত্রনাট্য তৈরি করার সময়ে। আবার অমলের বিলেত যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন: ‘বিলেতের চিঠি। চারুর উদ্বেগ। টেলিগ্রাফের কথা ভূপতি জানতে পারল চারু টেলিগ্রাম করেছে। ভূপতির realization…. Crisis’।

চারুলতার দ্বিতীয় খসড়ার শুরুতে একটি পৃষ্ঠার ডানদিকে সত্যজিৎ রায় লিখেছেন  ‘গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত’ আর সেই একই পৃষ্ঠার বাঁদিকে লিখেছেন, ‘বাড়ি – নীড়’। ‘বাড়ি’ শব্দে একটি তির চিহ্নিত করে ‘বাড়ি’-র সঙ্গে যুক্ত করেন একটি শব্দ ‘ছাত’, তার পাশে আবার একটি বন্ধনীতে লেখা, ‘রান্নার ধোঁয়া কোথা দিয়ে বেরোয়? আশেপাশে অন্যান্য বাড়ি – normal’।

চারুলতা ছবিতে প্রথমে শর্মিলা ঠাকুরের অভিনয় করার কথা ছিলো। সে ভাবেই ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু পরে পাল্টে যায় কাস্টিং। মাধবী মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মহানগরের শুটিং চলার সময় সত্যজিৎ রায় তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন কবে তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন?

এর কিছুদিন পর সত্যজিৎ রায় মাধবী মুখোপাধ্যায়কে ফোন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নষ্টনীড় (১৯০১) গল্পটা পড়তে বলেন। তারও কিছুদিন পর তিনি মাধবীকে স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনান, ছবির নাম চারুলতা (১৯৬৪)। মাধবী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘স্ক্রিপ্টে সবকিছুই ছিলো, শেষ দৃশ্যটা বাদে। আমি জিজ্ঞেস করতে আমায় বললেন, পরে জানাবেন। এত রাশভারী ব্যক্তিত্ব, যে আমার সাহস হলো না আর কিছু জিজ্ঞেস করার। চারুলতার শেষ দৃশ্যে আমরা (শৈলেন মুখোপাধ্যায় এবং মাধবী) বিনা প্রশ্নে ওঁর নির্দেশ মেনে কাজ করেছিলাম।’

এই সিনেমাতেই সত্যজিৎ রায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে তার হাতের লেখা পাল্টাতে বলেছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতের লেখা ছিলো রাবিন্দ্রীক ধাঁচের। কিন্তু গল্পটা যেহেতু রবীন্দ্রপূর্ব যুগের তাই অমল চরিত্রের হাতের লেখাও বদলাতে হবে। সত্যজিৎ রায় একটি হাতের লেখা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ধরিয়ে দিয়ে সেটা নকল করতে বলেছিলেন। সেই লেখা নকল করতে করতে সৌমিত্রও পাল্টে ফেলেছিলেন নিজের হাতের লেখা।

এখন ‘চারুলতা’ আলোচনা-সমালোচনায় উজ্জ্বল হয়ে থাকলেও ছবিটা চলবে কি না, তা নিয়ে কিন্তু স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের-ই বেশ সন্দেহ ছিল। কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি এনটিওয়ান স্টুডিওতে ইউনিটের সবাইকে ছবিটি দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।  শো শেষে সত্যজিৎ রায়ের মন্তব্য ছিলো এরকম.‘ছবিটা তো বেশ ভাল হয়েছে ভাই, তবে মানুষের ভাল লাগবে কি না জানি না’!

চারুলতা মুক্তি পাওয়ার বেশ সমালোচনাও হয়েছিলো। বহু মানুষ আঙুল তুলেছিলেন ছবির নাম নিয়ে। গল্পের নাম তো ‘নষ্টনীড়’, সেটাকে ‘চারুলতা’ কেন করা হলো?

সত্যজিৎ রায় প্রথমে স্থির করেছিলেন ‘নষ্টনীড়’-ই রাখবেন। এমনকী, ‘নষ্টনীড়’ নাম দিয়ে ছবির একটা পোস্টারও তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে নিয়ম নিয়ম অনুযায়ী সিনেমার নাম রেজিস্ট্রেশন করাতে গিয়ে দেখা গেলো ওই নাম বরাদ্দ হয়ে আছে। ওটা পাওয়া যাবে না। তখন পাল্টে নাম রাখা হল ‘চারুলতা’।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ প্রহর, দ্য ওয়াল, দিবালোক
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box