সন্ন্যাসী ও একটি শিউলি গাছ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সায়ন্তন ঠাকুর (লেখক)

(কলকাতা থেকে): কার্ত্তিক মাস পড়তে আর ক’দিন বাকি ছিল, ওইসময় কিছুতেই ঘরে মন থাকে না আমার। বেরিয়ে পড়ার সাধ হয়, দূরে কোথাও নয়, এই আশেপাশে। ভিড় ঠাসা বাসে চেপে অচেনা কোনও পাড়াগাঁয়ে হয়তো নেমে পড়লাম, পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়ানো, চা-দোকানে বসে একটু গলা ভেজালাম, পাঁচজন হরেক কিসিমের মানুষ, খানিক গল্পগুজব, এইসব আর কী, সামান্য বাসনা!

সেবার এইরকম বেরিয়েছি, একটি ছোট্ট জনপদের সঙ্গে আলাপ হল, নাম বইপুর। বেলা বয়ে গেছে তখন, পীতবসনা আলোয় ভরে উঠেছে কেমন চারধার। তেমাথার মোড়ে আমাকে নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেল দূর শহরের দিকে। দোকানপাট তেমন নাই, যাও বা আছে দু-চারখান,তাদের ঝাঁপি বন্ধ। বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে কাঁচা ধুলার পথ নেমে গেছে, আনমনা, ভারী পছন্দ হল! ওই পথেই পা বাড়ালাম।

দুপাশে ধূ ধূ জমি, আষাঢ়ের নতুন জলে চাষারা ধান রুইয়েছিল, এখন লকলক করছে সেই ধানের শিষ। কুচি কুচি পঙ্গপালের মত কী এক পাখির দল পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে আকাশে। অনেকদূরে বট না পাকুড় গাছের মাথায় ঝলমল করছে দিনান্তের আলো। ছোট ছোট ঝোপের গায়ে বেগনে রঙা ফুল ধরেছে, একদিকে ফণীমনসার জঙ্গল, সোনার জলে কে যেন ধুয়ে দিয়েছে ভুবনডাঙা। এই রূপবাসনায় মজে যায় মন। জংলা গন্ধে বুঁদ হয়ে আছে বাতাস। হাঁ করে বালকের মতো চেয়ে থাকি আমি।

পথের ওপর ঝাঁকড়া শিউলি গাছ চোখে পড়ে, কতদিনের পুরোনো কে জানে, সচরাচর দেখা যায় না এমন। বাসি শিউলি ফুলে ছেয়ে আছে গাছতলা, ধুলায় মলিন, সাদা রঙ আর তাদের নাই। আবার রাত ভোর হলে নূতন কুসুম সুবাসে ভরে উঠবে চরাচর। দুদণ্ড শিউলিতলায় বসতে ইচ্ছা করল। ধুলার ওপরেই বসলাম।শুঁয়োপোকার দল যাতায়াত করছে গাছ বেয়ে, ওরা একদিন রঙিন পাখাওয়ালা প্রজাপতি হবে!

মাঠের মাঝে একটা শীর্ণ খাল, জল নাই বললেই চলে, একজন বুড়ো মতো লোক হাত মুখ ধুচ্ছে সেখানে, পরনে সাদা মালকোচা মারা ধুতি, কাঁধে একখান গামছা। গলা তুলে শুধোলাম
—এদিকে কোন গাঁ ?
লোকটি ভেজা গায়ে হাত মুছতে মুছতে পথের ওপর উঠে এল। আমার দিকে খানিক চেয়ে বলল
—ইদিককার মনিস্যি তো লয়! তা যাবা কোনঠি ?
একটু হেসে বললাম
—এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম, কোন গাঁ পড়বে সামনে ?
—বঅইপুর!
—তা তোমার কি এখানেই ঘর ?
একটু থেমে ফের বললাম
—বিড়ি খাবা একটা ?
—তা দ্যাও বিড়ি একখান!

বিড়ি নিয়ে আমার পাশে এসে বলল। আরাম করে ধোঁয়া ছেড়ে দূরপানে আঙুল তুলে বলে উঠল
—ঘর, ওই যি হাওর, দ্যাখছো ? ওইঠে ঘর।
—এ তোমার জমি ? কাজ করছিলে ?
—জমিন কোথা পাবক, মুনিস খাটি, ভাগীদার।
—পয়সাকড়ি পাও?
—হাঁ গ! যাদের জমিন তারা ভালো মনিস্যি, দেয় থোয়!

একথা সেকথা হয়, সব গাঁ ঘরের অতিসাধারণ গল্প। বুড়োর নাম কেষ্ট, সামনে পাটির দুটো দাঁত নাই, হাসলে শিশুর মতো দেখায়। আমাকে বলে, ঘর চলো, লালী গাইয়ের গরম দুদ খাওয়াবক! আমি কিছুই বলি না, একটু হাসি শুধু। ওদিকে বেলা পড়ে গেছে, মধু মধু বাতাস বইছে। বুড়োর মুখে শুনি, শিউলি গাছটা নাকি অনেকদিনের পুরোনো, তার যৌবনকালের! অতবছর বাঁচে শিউলি ? কী জানি। তখন বইপুর গাঁয়ের চণ্ডীতলায় কোথা থেকে এক সন্ন্যাসী এসে আস্তানা পেতেছিল, ক’টা দিন ছিল, সে-ই নাকি লাগিয়েছিল এই গাছ।

দূর আকাশে ভেসে ভেসে কতগুলো বক কোথায় যেন চলেছে, সাদা শরীরে তাদের লেগেছে আশ্চর্য রঙ। আমার মন পড়ে আছে ওই সন্ন্যাসীর দিকে। ক’দিনের অতিথি গাঁয়ের পথের ধারে একটি গাছ লাগিয়ে কোথায় আবার হারিয়ে গেছেন। সেই গাছ এখন কুসুম কুসুমে আলো হয়ে থাকে। একজন পরিচিত সন্ন্যাসী, তিনি আমার প্রিয় সখা, আমাকে বলেছিলেন একবার, মৃত্যুর পর তাঁর দেহাবশেষ এইরকম নির্জন অখ্যাত কোনও গেঁয়ো পথের পাশে শিউলিগাছের তলায় যেন সমাধিস্থ করা হয়। কোনও ফলক না, বেদি না, শুধু ধুলামলিন পথ, তার নিচে মানুষটির অচঞ্চল মন শুয়ে থাকবে, শারদপ্রাতে খসে পড়বে কিছু অস্ফূট কুসুম। কেউ জানবে না, চিনবে না, আমারই মতো কোনও পথিক হয়তো এসে বসবে দুদণ্ড। এই গাছ যিনি লাগিয়েছিলেন তাঁরও কি তেমন কোনও বাসনা ছিল ? কী জানি!

কেমন ছিলেন ওই সন্ন্যাসী ? হয়তো অল্প বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, বাপ মা সংসার পরিজন সব ছেড়ে রমতা সাধুর জীবন, মাধুকরী করে দিন কাটে, কোনওদিন খাওয়া জোটে কোনওদিন জোটে না। শুনেছি এক সম্প্রদায়ের সাধুদের মুখ ফুটে ভিক্ষা চাওয়ার আস্য নাই, গৃহস্থের দুয়ারে দাঁড়াতে হয়, যদি কিছু দেয় তাহলে গ্রহণ করবেন, নচেৎ অন্য কোনও গৃহ আবার। হয়তো ওঁর গ্রামে কোনও এক কিশোরী ভালবাসতো সেই গৃহত্যাগী বৈরাগ্যবান কিশোরকে! বলতে পারেনি কোনওদিন, কিশোর কি টের পেয়েছিল লাজুক কিশোরীর গোপন অশ্রু ? কিছুই জানি না আমি, মনে মনে ভাবি নিত্য ঈশ্বরপ্রেম নিশ্চয় তাঁর হাত ধরেছিল আজীবন। কবেকার কথা, এখন পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেছে নশ্বর দেহপট।

কেষ্ট ঘরের পানে চলেছে, পথের ওপর বৃদ্ধ শরীরটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। জগত সংসারে কে যেন বিছিয়ে দিচ্ছে কুয়াশার আঁচল। দিগন্তরেখার কাছে তুলোর মতো মিহি ধোঁয়া জমছে। নির্মেঘ আকাশে একটি দুটি করে ফুটে উঠছে নক্ষত্র, বেদনাবিধুর সন্ধে নামছে অনিত্য পৃথিবীর দুয়ারে।

উঠে দাঁড়াই, ফিরতে হবে আমাকে। যদিও কোথাও ফেরার নাই তবুও ফিরে আসার অভিনয়টি বজায় রাখতে হয় ষোলোআনা। শিউলিতলায় থইথই আঁধার, ভোর রাতে নতুন কুসুম আসবে গাছে, সন্ন্যাসীর হাতে লাগানো শিউলিগাছ থেকে অপরূপ সুবাস বয়ে আসবে ক্লিন্ন প্রবঞ্চক সংসারের দিকে।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]