সবুরে আসলেই মেওয়া ফলে

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

 জীবনে কিছু বন্ধুত্ব থাকে যার আসল ব্যাখ্যা দেয়া যায়না।সেই বন্ধুত্বের মাঝে কিছু হিংসা রয়ে যায় অনুভবের আড়ালে। ঠিক তেমনই একজন বন্ধু আমার এই ছবির গানের ব্যাপারে একটা কমেন্ট করলো।‘তুমি আমার’ ছবিতে আমি দুইটি গান গেয়েছিলাম।আগুনের ‘সঙ্গে দেখা না হলে একদিন’ এবং ইশতিয়াক আহমেদ এর সঙ্গে ‘তুমি আমার ভালোভাসার গান’। গানদু’টো প্রায়ই রেডিওতে বাজা শুরু করলো খুব ঘনঘন। এরপর আমার ওই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে সে আমাকে ভর্ৎসনা করে বলতে লাগলো ছি ছি কি বাজে গান তুমি গাইলা,কি কথার ছিরি! বুকের ভেতর করে চিনচিনচিন! বললাম কোথায় শুনলে! ইতস্তত করে সে থেমে থেমে বললো শুনি নি, ওই যে রেডিওতে বাজে।মানে সে যে কান পেতে শুনেছে এবং ঘনঘন বাজছে তা সে স্বীকার করবেই না অথচ গানটি তার পছন্দই হয়েছে কিন্তু হিংসাবশতঃ সে তা বলবেই না।আমি বুঝলাম গানটা হিট হয়েছে। আমার অবশ্য তাতে উচ্ছসিত হওয়ার কিছু নেই কিন্তু বন্ধুর এই হিংসাত্মক মনোভাবে আমার খুবই হাসি পেলো।মানুষের মনের কত গোপন কুঠুরি থাকে, সেই কুঠুরিতে কত রঙ কত বিষাদ কত উপেক্ষা কত রাগ জমা থাকে কেউ কি তা জানে! কতজনই তা গভীরে খতিয়ে দেখে।কিন্তু আমার চোখ! কিছুই এড়ায় না।

বিটিভির গান যেমন চলছিলো তেমনই চলছিলো ধুঁকে। বড় বড় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান এগুলোতে কখনোই তেমন সুযোগ আমি পাইনি।আমার তাতেও তেমন কোন হাহাকার ছিলনা।ডন কোম্পানির রেগুলার চাকরীর মত গানই আমার আসল ব্যস্ততা। শিল্পকলা একাডেমি থেকে সারা বাংলাদেশ এবং বিদেশে অনেক অনুষ্ঠান এর সুযোগ তৈরি হয়।সেখানেও আমার অবস্থা তথৈবচ। সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে শাকিলা আপা তপনদা, শুভ্রদেব, বেবী নাজনীন তাদেরই জয়জয়কার। এমন ও হয়েছে ঢাকার বাইরে অনুষ্ঠান। আমাকে ডাকলো।রাতে সুটকেস গুছিয়েছি।সকালে খবর আসলো, সেখানে অন্য শিল্পী যাচ্ছে,আমি বাদ।আমি একদমই উচ্চবাচ্য করিনি।সুটকেস থেকে কাপড় জামা নামিয়ে নিজেকেও সেখান থেকে নামিয়ে নিজের জায়গায় স্থাপন করেছি।মনেমনে মন বেজার করেছি কিন্তু এর বেশী কিছু না।এসব ব্যাপারে আমার স্বামী সুরকার সংগীত পরিচালক জনাব মইনুল ইসলাম খান সাহেব আমাকে সাহস দিয়েছেন। বলেছেন শোন এক সময় এমন সময় আসবে সারা দেশের শিল্পী যত কাজ করে তুমি একলাই তা করতে করতে অস্থির হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমি আশায় বুক বেঁধেছি এমন বলবো না বলবো আমি নিস্পৃহ হওয়া শিখেছি। নির্লিপ্ত থাকা শিখেছি কিন্তু হতাশ হইনি।খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে আমার ছত্রিশ বছরের পেশাদার জীবনে একবারও আমি রাস্ট্রীয় আমন্ত্রনে কখনই বিদেশে যাইনি।শিল্পকলা আমাকে কখনই ডাকেনি এবং যত পরিত্যক্ত অনুষ্ঠানে আমি ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলা হয়ে কাজ করেছি।আর দিনের পর দিন আমি এভাবেই ধৈর্য ধরে কাজ করে গেছি।বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে আজও পর্যন্ত একটা সলো গান গাওয়ার যোগ্যতা আমি অর্জন করতে পারিনি।না হয় চারজন না হয় তিনজন এমন গান গেয়েছি ভাগাভাগি করে কোরাস শিল্পীদের মত।কিন্তু কখনই সলো গান নয়।এর কারণ আমি এখনো জানিনা। তারপর ও বিশাল ধৈর্য নিয়ে বসে থেকেছি। এবং সারা বাংলাদেশ অথবা সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী জানে এই ধৈর্যের ফল আমি পেয়েছি। ওই হিংসুক বন্ধুর হিংসাত্মকঅভিব্যক্তি, এবং শিল্পকলার এই রকম বিমাতা সুলভ কাজে আমি বরং এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহই পেয়েছি। আমার অভ্যাসই এভাবে তৈরি হয়েছে যে, যেখানে সব পথ থেমে যায় সেখানেই আমার চেষ্টা শুরু হয়।এ শিক্ষা আমি আমার বাবা এবং আমার স্বামীর কাছে পেয়েছি।আমার অভ্যাসই এভাবে তৈরি হয়েছে যে “যেখানে সব পথ থেমে যায় সেখানেই চেষ্টা শুরু করতে হয়”।এ শিক্ষা আমি আমার বাবা এবং আমার স্বামীর কাছে পেয়েছি।

সব সময়ই ধৈর্যের ফল মধুর হয়।আমিও তার ব্যাতিক্রম নই আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে