সব ধর্মকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখার বিষয়টা তখন থেকেই হয়

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকলী আহমেদ

শহরে বসবাসের একটা বিরাট সুবিধে হলো নাগরিক জীবন,আধুনিকতা,যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি নীবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। শহুরে কেতা কায়দা রপ্ত হয়ে যায় বেশ অল্প বয়সেই। অল্প বিস্তর ফ্যাশানের সঙ্গেও পরিচিতি ও বেশভুষায় পুরোপুরি নাগরিক হওয়া যায়। অন্যদিকে গ্রাম মানুষকে যেনো মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসে। আমাদের  গ্রামের সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছিলো না। বাবা মা-র ছেলেবেলাও কেটেছে মফস্বল শহরে। নানা নানী দাদা দাদী বেঁচে থাকতে বছরে দুইবার খুলনায় যাওয়া হতো। অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার পর আমাদের তিন বোন-কে নিয়ে আম্মা যেতেন।ঢাকার বাইরে খুলনায় বেড়াতে যাওয়া ছিলো আমাদের মনে তখন  বিরাট আনন্দের বিষয়। খুলনায় দোলখেলায় শিতলাবাড়িতে আমরা প্রথম পূজা দেখি। ঢাকায় বসবাসের অসুবিধে হলো বিশাল এ শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সবাই। একটা পাড়ায় অনেক সময় সব ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে ওঠা বসা হয় না। ফলে নানা ধর্মের আচার অনেকটাই থাকে অজানা।

কাকরাইলের আমাদের পাশে এক ঘর হিন্দু প্রতিবেশী ছিলেন। পরিবারটির সঙ্গে আমাদের অল্প স্বল্প পরিচয় ছিলো। খুব ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছিল মাসীমার। তবে ওদের সঙ্গে খুব বেশি ওঠাবসা ছিলো এমনটা বলা যাবে না। আমাদের বাসার সামনের বাসায় একটা ছোট বাসায় থাকতেন ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। তিনি তখন বিটিভি-তে গান করেন। এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়নি। বাড়ির পিছন দিকের খোলা জায়গা-র পরে আধ ভাঙ্গা দেয়ালের ওপাশে ছিলো  বাড়িটি। একটা বিরাট সীমানায় বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বিল্ডিং। বিরাট ছয়তলার সামনেই টিনের ছাউনি ওয়ালা ছোট দু’ কামরার বাসায় উনি থাকতেন। খুব ভোরে তাঁর গলা সাধার আওয়াজ পেতাম। সকালে নিয়মিত বৌদিকে দেখতাম পূজো করতে।তখন সিঁথিতে সিঁদুর আমাদের কাছে বিরাট বিস্ময়। আম্মা কাছ থেকে জেনে সে বিস্ময় কাটে। পূজোর ফুলের দিকে দূর থেকে আমরা হা করে তাকিয়ে থাকতাম। উনি খুব ভোরে উঠে কাঁসার বাটি ঘটি বের করে রুমের সামনেই খুব অল্প জায়গায় তোলা পানিতে ঘষা মাজা করতেন। সেসব দিনে হিন্দু মুসলমান অনেকের বাড়িতেই কাঁসার তৈজসপত্র ব্যবহার হতো। আমাদের বাড়িতেও কাঁসার গ্লাসে আমরা পানি খেতাম আর থালায় খেতাম ভাত। আমাদের বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে এলে তাঁদের জন্যে আম্মা কাঁচের প্লেট বের করে দিতেন। বন্ধুরা খুব আবদার ধরে বলতো,‘আমাকে তোর থালাটা দে। আমি ওটাতে খাবো।’ আমার বন্ধুরা কাঁসার থালার নাম দিয়েছিল সোনার থালা। সেই থেকে আমরা তিন বোন থালাগুলিকে সোনার থালা বলে ডাকতাম। আসলে বিগত জীবনের দিনগুলো ছিল যেন সোনাঝরা দিন। মানুষের বোধ,অনুভূতিগুলিও ছিল খাদ বিহীন। ছোট ছোট আনন্দে বিহবল হয়ে যেতো চারপাশ।

বছরে পুজো এলে কোন কোন বাড়িতে হিন্দু পরিবার থাকে তা কিন্তু খুব অল্পতেই বোঝা যেতো। গলির শেষ মাথায় অদেখা,অজানা হিন্দু পরিবারের মাসী বা কাকীমা এসে আম্মা-কে পুজোর দাওয়াত করে যেতো। অনেক পাড়াতেই পুজোর সরগরম ভাব বুঝতে পারা যেতো। সব ধর্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার এক অদম্য চেষ্টা ছিলো আমার মায়ের। ছোট বেলায় আম্মা আমাদের ‘ছোটদের রামায়ণ ও মহাভারত’ কিনে দিয়েছিলেন। কাকরাইলের বাসার খুব কাছাকাছি ছিল তিনটি উপাসনালয়। খৃষ্টানদের চার্চ ছিল কাকরাইলে। মুসলমানদের জন্যে ছিল কাকরাইল মসজিদ। রমনা পার্কে যাবার সুবাদে আম্মা মাঝে মাঝে চার্চেও নিয়ে যেতেন। স্কুলের পাঠক্রমের পাশাপাশি ঢাকার প্রসিদ্ধ স্থানগুলো দেখিয়ে আনা আমাদের পড়াশুনার অনেক বেশি বিস্তৃতি ঘটাবে এমনটাই ছিল তাঁর ধারণা। পূজার সময় আম্মা এক সকালে ঘোষণা দিলেন, কাকরাইলের কাছাকাছি রামকৃষ্ণ মিশনে আমাদের পূজা দেখতে নিয়ে যাবে। বিজয়ার দিন আমদের তিন বোন-কে আম্মা সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে গেলেন। আমার এখনও মনে আছে আম্মা নিজে গরদের শাড়ি পরেছিলেন। আমরা তিন বোন, আমাদের ঈদের জামা পরে রেডি হয়ে দুই রিক্সা নিয়ে পুজা দেখতে গেলাম। শাপলা চত্ত্বর পার হয়ে মধুমিতা সিনেমা হল ছাড়িয়ে কোথায় যে গিয়েছিলাম, আজ আর তা মনে নেই। বিধি বাম। এত বৃষ্টি ছিলো সেদিন। ভীষণ ভীড় ঠেলে কাদা ভরা খুব পিছলা রাস্তা, হাঁটাই ছিলো দুষ্কর। এ কারণে পূজা মন্ডপের খুব কাছে যেতে না পারলেও বুঝতে পেরেছিলাম ধূপ,ধূনোর গন্ধে কতটা উৎসবমুখর সে পরিবেশ। আমরা তিন বোন মেয়েদের সাজের দিকে পলকহীন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। পুরোহিত হিন্দু,মুসলমান সবাইকে নাড়ু দিচ্ছেন। ফুল ছিটাচ্ছেন। আমরাও মুড়ি, মুরকি কিনে পুরোহিতের হাতের নাড়ু নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরে এলাম। অত বৃষ্টি না হলে হয়ত,অনেক্ষণ পুজা মন্ডপের কাছে বসে থাকতাম। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পাড়ায় পাড়ায় মানুষের আনন্দের যে মাতামাতি সে ছিল দেখার মত। অনেক বাড়ির নাড়ু এসে হাজির হতো আমাদের বাসায়। অন্য ধর্ম-কে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখরি বিষয়টা তখন থেকেই হয়। মানুষ, মনুষত্ব, মানবিক গুণাবলী কেবল ঈশ্বর প্রদত্ত নয় বোধ করি। জীবনপথে নানা শিক্ষা ও শিক্ষার আলোকছটায় নিজের মন দুয়ার  খোলা থাক। তবেই এ মনেই হবে মন্দির, মসজিদের, চার্চের সত্যি সত্যি বসবাস। (চলবে)

ছবি: টুটুল নেছার