সব পুরাতনের সঙ্গে মিশে থাকে সুখ দুঃখের গল্প

স্মৃতি সাহা

প্রাণচাঞ্চল্য আর গতিশীল এই নিউইয়র্ক নগরী খুব স্পষ্টভাবে চোখে ছবি এঁকে দেয় পরিবর্তনের। সময়ের গতির সঙ্গে প্রায় তাল মিলিয়ে চলে এই পরিবর্তন। প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত এই নগরী তাই চিরনতুন। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু স্থাপত্য,রেস্টুরেন্ট, পিজ্জারিয়া বা পার্ক সময়কে মুঠোবন্দি করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নগরীর আনাচে কানাচে স্বমহিমায়, অবিচল আর অপরিবর্তনীয় ভাবে। এসব স্থাপত্য বা রেস্টুরেন্টে বা পিজ্জারিয়া’র গায়ে সময়ের পরত পড়লেও স্বকীয়তা কমে নি একটুও। সময়কে পরাস্ত করে এখনো নিউইয়র্কের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে এরা প্রতিনিয়ত। আজ বরং গল্প করা যাক এদের নিয়ে। নিউইয়র্কের সবচেয়ে পুরাতন পিজ্জারিয়া লোম্বারডি’স, স্থাপিত হয়েছে ১৯০৫ সালে। ম্যানহাটনের “লিটল ইটালি” নামক স্থানে অবস্থিত এই শতাব্দি প্রাচীন পিজ্জারিয়াটি। শোনা যায় এই পিজ্জারিয়া শুধু নিউইয়র্কে নয় বরং সমস্ত আমেরিকার প্রথম পিজ্জারিয়া যেখানে প্রথম পিৎজা বানানো হয়। শতবছর পূর্বের এই পিজ্জারিয়াটিই কিন্তু বুঝিয়ে দেয় কতটা ” ডাইভার্স” এই নগরী, হোক সে শত বছর পূর্বে। নিউইয়র্কের সবচেয়ে পুরাতন রেস্তোরা ফ্রাউন্সেস টাভেরন্। ৫৪ পার্ল স্ট্রিট, ফিন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক, ম্যানহাটন-এ অবস্থিত এই রেস্তোরাটি স্থাপিত হয়েছে ১৭৬২ সালে। শোনা যায় প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর অফিসারদের বিদায় সম্বার্ধনা জানাতে এই রেস্টুরেন্ট-এ এসেছিলেন ১৭৮৩ সালে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এই রেস্তোরাঁর ঐতিহাসিক মূল্যও কিন্তু আছে।

বোলিং পার্ক

বোলিং গ্রীণ পার্ক; নিউইয়র্কের সবচেয়ে পুরাতন পার্ক এটি। ম্যানহাটনের ব্রডওয়ে আর হোয়াইট হলের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত এই কয়েক শতক পুরোনো পার্কটি। ১৭৩৩ সালে স্থাপিত হয় সবুজে ঘেরা এই পার্ক নাগরিকদের রিক্রিয়েশনের জন্য। তবে খুব সম্প্রতি পার্কটি ব্যবহৃত হচ্ছে প্যারেড গ্রাউন্ড হিসেবে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি; নিউইয়র্কের সবেচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। ১৭৫৪ সালে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৯৬০ ব্রডওয়ে, মর্নিংসাইড হাইটস্, ম্যানহাটনে অবস্থিত। মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি আদতে তখন ছিলো কলেজ। তখনকার নাম ছিল “কিংস কলেজ”। ইটালিয়ান রেনেসাঁ’র সময়কার স্থাপত্যকলার আদলে গড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো। আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, টেডি রুজভেল্ট, বারাক ওবামা, ওয়ারেন বাফেট, ইশাক এসিমোভ সহ আরো অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ” দ্যা নিউইয়র্ক পোস্ট”; নিউইয়র্কের সর্বাধিক প্রাচীন সংবাদপত্র। ১৮০১ সালে সর্বপ্রথম মুদ্রিত হয় এই সংবাদপত্র। আলেকজান্ডার হ্যামিলটন এই সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা।

লোম্বারডিস পিজ্জারিয়া

এখানে একটি তথ্য দিয়ে রাখছি, “নিউইয়র্ক গ্যাজেট” ১৭২৫ সালে প্রথম মুদ্রিত এই সংবাদপত্র টি যদিও কালের হিসেব অনুযায়ী সবচেয়ে প্রাচীন, তবে ” দ্যা নিউইয়র্ক পোস্ট” এখনো নিয়মিত ভাবে মুদ্রণ অব্যাহত রেখেছে। আর ঠিক সেদিক বিবেচনা করেই ‘দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট’ সর্বপ্রাচীনে তকমাটি নির্দ্বিধায় পেয়ে যায়। ব্রুকস্ ব্রাদার্স; ৩৪৬ ম্যাডিসন এভিনিউ, মিডটাউন ঈস্ট, ম্যানহাটনে অবস্থিত এই “ক্লথিং স্টোর”টি নিউইয়র্কের সর্বপ্রাচীন স্টোর। ১৮১৮ সালে স্থাপিত এই স্টোরের শাখা ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবী ব্যাপি।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের দিন “ব্রুকস্ ব্রাদার্স” এর কোট পরিধান করেছিলেন, আর দুঃখজনক ভাবে সেদিন রাতেও তিনি এই স্টোরের কোট পরিহিত করে ছিলেন যেদিন তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। আসলে সব পুরাতনের সঙ্গে মিশে থাকে কিছু সুখ দুঃখের গল্প। ঘটনা প্রবাহিত হয়ে যায়, সময় এগিয়ে যায় কিন্তু অতিবাহিত হওয়া গল্পগুলোকে বুকের পাজরে বন্দি করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সেই রঙ্গমঞ্চ যা কখনো ভবন, কখনো পিজ্জারিয়া আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় নামে অভিহিত হয়।

ছবিঃ গুগল