সমুদ্রকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

জাহাজিদের মন কতোটা বিশুদ্ধ জানে শুধু মা আর বউ

চীফ কুক মিয়ানমারের, প্রতিবেশী ভেবে গিয়ে বললাম কুকি, আমার তো ডাল ছাড়া চলেনা।
ও বললো আমারও চলেনা, তবে খুজে শুধু বুটের ডাল পেয়েছি, এটা দিয়েই চলে যাবে আমাদের।
আমি বেশ, কিছুতো হলো ভেবে গান গাইতে গাইতে কেবিনে চলে আসলাম।
লাঞ্চে গিয়ে দেখি ডালের একটা পদও রান্না করেছে,
আমি তো আরও খুশী।
বেশ ফুরফুরা মেজাজে ডাল নিতে গিয়ে বিশাল এক ধাক্কা খেলাম।
এ কি ডাল!!!
বাংলাদেশে ঘন ডাল, পাতলা ডাল, ডালের চচ্চড়ি, ডাল ভর্তা, পাট শাকের ডাল মাখানি সবই খেয়েছি,
কিন্তু জীবনে এই প্রথম সেমাই দিয়ে ডাল রান্না পেলাম।
ডাল আর নিমু কি, আমি সেমাই দেখি আর ঘুঁটা দি।
যতোই ঘুটাই ততোই সেমাই, ডালের সারা গায়ে প্যাচানো সেমাই।
প্রথম প্রথম একটু প্যা পু করলেও এখন আমি নিয়মিত সেমাই দিয়েই বুটের ডাল খাই, তাও আবার চায়নিজ স্বচ্ছ সেমাই।
বাংলার ঘরে ঘরে এই সেমাইর ডাইল জনপ্রিয় হোক সেই দোয়া করি।
এই রেসিপি পেলে কেকা ফেরদৌসী অবশ্যই নুডুলস দিয়ে ডাইলের ঝোল বানাতো।

আজকের ভোরটা অন্যরকম ছিলো। দিনের শুরুতে বৃষ্টি হলে মনটা ভালো হয়ে যায়, তবে সেটা অবশ্যই সমুদ্রে।
সুবেহ সাদিকের পর থেকেই বৃষ্টি।
সঙ্গে মেঘে মেঘে ছেয়ে থাকা  দূরের আকাশ।
বজ্রপাতও হচ্ছিলো চারপাশে।
শ্রীলঙ্কার এই উপকূল সবসময়েই বৃষ্টিপ্রবণ। হুটহাট কোথা থেকে মেঘ চলে আসবে, আকাশ ঢেকে যাবে ধূসর কালো মেঘে, তারপর শুরু হবে বাতাসি বৃষ্টি।
এই বৃষ্টিটা বাতাসের সঙ্গে উড়বে, ঘুরতে থাকবে ডেকের ওপর, মানে এর কোন এঙ্গেল টেঙ্গেল নেই।
আকাশ থেকে সমুদ্রে পরতে পারলেই হলো।
শ্রীলঙ্কায় পৃথিবী বিখ্যাত চা হওয়ার কারনও এই অতিরিক্ত বাতাসি বৃষ্টি।

জাহাজের ডেকটা এই বৃষ্টিতে বেশ ভালো পরিস্কার হয়ে গেলো, আসার পর থেকে কয়লার ময়লা দেখতে দেখতে মন খারাপ হতো।
আমি ইঞ্জিনিয়ার বলেই হয়তো ডেকের ময়লা সহ্য হয়না।
কার ক্যারিয়ারে দেখতাম ডেক থাকতো চকচকে পরিস্কার।
যাই হোক সমুদ্র বৃষ্টি আজ আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছে এতেই শান্তি।
ঝুম বৃষ্টি ধুয়ে দিয়ে গেছে ডেক।
সাগরের নোনা ঘ্রাণটাকে মাঝেমধ্যেই মিষ্টি পানির বৃষ্টি ধুয়ে দিয়ে যায় এভাবেই।
বৃষ্টি হলে আমি একাএকা গুণগুণ করে গান গাই, আমার গানের কথা কোনদিনও মনে থাকেনা।
নিজে নিজে গানের কথা মিলিয়ে শুধু সুরটা অক্ষত রেখে গাইতে থাকি।
ক্যাডেট কলেজে আট লাইন কবিতা মুখস্থ না হওয়ার কারনে অনেকবার মাইর খেয়েছি।
তাও আমার কবিতা মুখস্থ হতো না, এখনও হয়না।
আর গান তো আরও কঠিন জিনিস, সাধনার জিনিস।

সকালে আমরা শ্রীলঙ্কার গলের কাছাকাছি এসে গতি কমালাম।
যদিও হাম্বানটোটায় থামার কথা ছিলো, কিন্তু এখন দেখি গলেতে থামার প্রস্তুতি।
জাহাজ খুব অল্প গতিতে চলছে, পাশে আর্মস গার্ডদের বোট চলে আসলো।
ওরা টুপটাপ জ্যাকব ল্যাডার বেয়ে সোজা ডেকে উঠে আসলো।
এরপর দেখি বিশাল বিশাল তিনটা বাক্স।
এই বাক্সগুলি হলো ওদের বন্দুক, কার্তুজ আর বুলেটপ্রুফ  ভেস্ট, হেলমেট এগুলির।
জাহাজের নাবিকেরা সববাক্সগুলি ওঠালো,
আর আমি এই ফাকে ওদের পরিচয় জানতে লেগে গেলাম।
যদিও ভেবেছিলাম ওরা ভারতীয় পরে পরিচয় পেয়ে দেখি আসলে ওরা এমন এক দেশের যে দেশটির কোন সমুদ্রসীমাই নেই।
এই তিনজন নেপালিই এখন আমাদের জাহাজের মেহমান আর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিবে।
কোন এক সবুজ পাহাড়ের মানুষ নীল জলের সাগরে এসেছে হাতে তাদের অব্যর্থ নিশানার বন্দুক।
পৃথিবী কাকে কখন কোথায় টেনে নিয়ে যায় আমরা আসলেই তা বুঝতে পারিনা।

আমার কাছে এদের বেশ ছোটখাটো আর পাহাড়ি ধাঁচেরই মনে হলো।
এরা সবাই এক্স নেপালি সেনাসদস্য, কমান্ডো ট্রেইনিংও করা আছে একজনের।
বিকেলে সিকিউরিটি মিটিং হলো আমাদের।
ওরা নিরাপদ ভাবে গাল্ফ অফ এডেন, আইআরটিসি এবং বেশী ঝুকিপূর্ণ এলাকা কিভাবে সুরক্ষা দিবে তার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলো।
শুনে বেশ ভালোই লাগছিলো।
বহুদিন সোমালিয়ান জলদস্যুরা চুপচাপ নীরবে কাটালেও হঠাৎ নাকি গতসপ্তাহে তিনটি ট্যাঙ্কারে আক্রমণ করেছে।
সোমালিয়ার জলদস্যুরা দৃশ্যপটে থাকলেও শুনেছি কলকাঠী নাকি অন্য কোথাও থেকেই নড়ছে।
অনেকে আবার ইসরায়েলকেই এদের নাটের গুরু মনে করে।
জাহাজ আটকাতে পারলে জলদস্যুদের এবং তাদের মাফিয়া ডনদের ভালোই আয়।
আমার সঙ্গে চাকরি করা এক কাপ্তানের কাছে শুনেছি, উনি নিজে নাকি গুণে ২৮ লাখ ডলার হস্তান্তর করেছিলেন ওনাদের মুক্তিপণ হিসেবে।
প্রায় তিনমাস বন্দী ছিলেন সোমালি উপকূলে।
কষ্টের যে বর্ণনা দিয়েছেন সেটা সাধারণ কোন মানুষ সইতে পারবে না।
নিছক আমরা নাবিক হয়ে গেছি বলেই হয়তো অনেককিছুই সইতে পারি।

যাই হোক, মিটিং শেষে ওদের বন্দুকগুলি যখন ওরা রিলোড এবং ট্রিগার পরীক্ষা করছিলো তখন কেমন একটা যোদ্ধা টাইপের শক্তি এলো মনে।
দু’জন আবার খালি ম্যাগজিনগুলি এতো দ্রুত কার্তুজ ভরছিলো, আমার কাছে অভূতপূর্ব লাগলো।
পাঁচ মিনিটে ত্রিশটার মতো ম্যাগজিন বিশটা করে কার্তুজ লোড করে ফেললো ওরা।
নেপালিদের ওপর আমার বিশ্বাস আছে, ওরা সৈনিক ও যোদ্ধা হিসেবে ভালো।
একটা স্নাইপার রাইফেল আর তিনটা অটোমেটিক।
স্নাইপার হলো সতর্ক করে দেয়ার জন্য, এদিকে আসিস না।
আর যদি তার পরেও এসেই পরে তাহলে অটোমেটিক চলবে।
তবে বিজন শর্মা, মানে দলের যে প্রধান ও বললো, আমরা তো আর মানুষ মারবো না, শুধু ভয় দেখাবো, আর বেশী প্রয়োজন পরলে পায়ে গুলি করি।
আর নৌকার ইঞ্জিনটা গুড়িয়ে দেই।
আমি একজন প্রকৃত শুটারের সঙ্গে কথা বলছি ভাবতেই গায়ের লোমগুলি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

গাল্ফ অফ এডেন, বাবেল মান্ডেব আর এরাবিয়ান সাগরের কিছু অংশে সোমালিয়ার জলদস্যুরা ঘোরাঘুরি করে।
তবে মৌসুমী জলবায়ুর প্রভাবে এই সময়টা ওরা গভীর সমুদ্রে আসতে পারে না।
আজকাল খুব একটা জাহাজমুখো ওরা হয়ওনা।
তবুও আমাদের কোম্পানি সাবধানের মাইর নাই হিসেবে এখনও এদের বহন করে।
আর্মস গার্ড নেয়া জাহাজগুলির দিকে ওরা কখনও চোখ তুলেও তাকায় না,
কেমনে কেমনে খবরগুলি ওদের কাছে চলে যায়।

সেদিন ইউটিউবে সালমান খানের একটা গান দেখলাম বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তুরপাইয়া গানটা দেখে আমার যা মনে হলো মুভিটা জাহাজের নাবিকদের নিয়ে বানানো।
সালমান খান নাবিক হিসেবে ভালোই অভিনয় করেছে  এই মুভিতে, মন বলছে।
ভালোই স্মার্ট লাগছিলো আমাদের পোশাকে ওকে, তাও ইলেকির ড্রেস পরা।
নায়ক তো নায়কই, সেরকম মারামারি করতে পারা জাহাজি এখন সালমান খান, মুভির নাম ভারত।
আবেগে বউরে গানের লিংকটা দিতেই, ছি ছি, এতো নেংটু মেংটু, কোথায় পাইছে এগুলি।
জাহাজি মানেই মানুষ হয়তো ভাবে খোলামেলা দুনিয়া।
আসলে আমরা যে জলেই থাকি জলের মতো মন সেটা বুঝতে পারেনা কেউ।
শুধু মা আর বউ জানে জাহাজিদের মন কতোটা বিশুদ্ধ।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]